আগের কিস্তিগুলোর পরিচয় সংক্ষেপে একটু দিয়ে নিই। প্রথম কিস্তিতে প্রফেসর রাজ্জাকের সাথে আহমদ ছফার মনীষার কান্তি বোঝাতে বিস্তর বইয়ের লিস্টি দিয়েছি। সেই কালে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক আরো অনেকের মতোই মুসলিম লীগকে সমর্থন করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে অনেকেই বেমালুম অস্বীকার করে গেলেন তাঁদের মুসলিম লীগকে সমর্থন করার বিষয়কে। প্রফেসর রাজ্জাক সেটা করেননি। পশ্চিম পাকিস্তানের ফ্যাসিস্ট আচরণ দেখে রাজ্জাক সাহেব তাঁর বিশ্বাস থেকে সরে এসেছিলেন এটা প্রমাণ করার জন্য কোন প্রামাণ্যচিত্রের প্রয়োজন পড়ে না। প্রফেসর রাজ্জাকের মতোন ব্যক্তিত্ব তাঁর ঋজুতা দিয়ে এই ব্যাখ্যা সারেন। সাথে যোগ হয় আপাদমস্তক সেক্যুলার আহমদ ছফার রাজ্জাকগিরি। তাই ছফার রায়ে আবদুর রাজ্জাককে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা বলাকে তথ্য হিসেবে যোগ করেছি আমাদের ভাবাগোনাকে একটু ভালো করে তাকানোর খায়েশে। দ্বিতীয় কিস্তিতে ছফার দুটো প্রবন্ধ নিয়ে ব্যাখ্যা এসেছে বিশদে। একটি বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে। অন্যটি ‘বাঙালী মুসলমানের মন’। আহমদ ছফার দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রবেত্তা হিসেবে বঙ্কিমের সাম্প্রদায়িক আচরণের ব্যাখ্যা করেছি। আর কেনই বা ছফা মুসলমান সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে খাড়া করেছেন নিজেকে তার ব্যাখ্যা করেছি ছফার ভাষ্যেই। এরপর কিস্তি তিন। আগের প্রবন্ধ দুটি আবারো আলোচনায় এসে গেছে এই কিস্তিতে। ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ নিয়ে মূল আলোচনা এগিয়েছে। সাথে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বঙ্কিম বিষয়ে ব্যাখ্যা কিছুটা তুলে ধরা হয়েছে। এই কিস্তিতে আবারো থাকছে ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ নিয়ে এনালাইসিস। সাথে একটি অন্য প্রবন্ধ। কথা হলো কারা এই বাঙালি মুসলমান? ছফা তাঁর ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে এই প্রশ্নের উত্তর করেছেন - যাঁরা বাঙালী এবং একই সঙ্গে মুসলমান- তাঁরাই বাঙালী মুসলমান। এঁদের ছাড়াও সুদূর অতীত থেকেই এই বাংলাদেশের অধিবাসী অনেক মুসলমান ছিলেন- যাঁরা ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যানুসারে ঠিক বাঙালী ছিলেন না। আর্থিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধাগুলো তাঁদের হাতে ছিলো বলেই বাঙালী মুসলমানের সঙ্গে সংস্কৃতিগত ভেদরেখা সমূহ অনেক দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই প্রভুত্বশীল অংশের রুচি,জীবনদৃষ্টি, মনন এবং চিন্তন পদ্ধতি অনেকদিন পর্যন্ত বাঙালী মুসলমানদের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। বাঙালী মুসলমানদের যে ক্ষুদ্রতম অংশ কোনো ফাঁক-ফোকর গলে যখন সামাজিক প্রভুত্ব এবং প্রতাপের অধিকারী হতেন, তখনই বাঙালী মুসলমানের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক চুকে যেতো এবং উঁচু শ্রেণীর অভ্যাস, রুচি, জীবনদৃষ্টির এমনকি ভ্রমাত্মক প্রবণতা সমূহও কর্ষণে ঘর্ষণে নিজেদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অঙ্গীভূত করে নিতেন।১
এই প্রবন্ধ নিয়ে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের মতামত জানতে চেয়েছিলেন আহমদ ছফা। রাজ্জাক সাহেব উত্তরে বলেছেন, ‘আপনের লেখাটাও পড়েছি। উনিশ’শ তিরিশ সালের দিকে প্রকাশিত শরৎচন্দ্রের বর্তমান ‘হিন্দু মুসলমান সমস্যা’র পর এতো প্রভোক্যাটিভ রচনা আমি বাংলা ভাষায় আর পড়ি নাই।’ ২ … প্রবন্ধটি আর প্রকাশ পাবার পর সৃষ্ট হুজ্জত নিয়ে কিছু কথা জানা যায় ‘যদ্যপি আমার গুরু’ তে … খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার পর রোমের পেট্রিসিয়ানদের নতুন এক বিভাজন-রেখার সৃষ্টি করেছিল। এই ধরণের একতা প্রায় অলঙ্ঘনীয় বিভাজন-রেখা বেঙ্গলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ক্রিয়াশীল রয়েছে। স্যারের এই কথার মধ্যে আমি একটা গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পেয়ে যাই। আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করি। সেই সময়ে জিয়াউর রহমান দেশের প্রেসিডেন্ট। আবুল ফজল ছিলেন জিয়া সাহেবের শিক্ষা এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি আমাদের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন এবং আমরা তাঁকে মান্য করতাম। একদিন সকালবেলা দেখতে পেলাম আবুল ফজল সাহেব মাথায় টুপি দিয়ে অপর এক উপদেষ্টা এম এ জি তাওয়াবের সঙ্গে রমনা ময়দানের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আমি সালাম দিয়ে ফজল সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছেন? তিনি জানালেন, তাওয়াব সাহেবের সঙ্গে সিরাতের মজলিসে যাবেন। আমি ভীষণ একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। আবুল ফজল সাহেব নাস্তিকতা প্রচার করতেন। ক্ষমতার কাছাকাছি এসে দেখছি তিনিও নবীভক্ত হয়ে পড়েছেন। এই ঘটনাটি আমাকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করে। রাজ্জাক সাহেব রোমের প্লিবিয়ান খ্রিস্টানদের মনন মানসিকতার বিষয়ে যে ইঙ্গিত করেছিলেন, আমার মনে হল, সেই দোলাচল মনোবৃত্তিটা বাঙালি মুসলমানের মনেও কাজ করে যাচ্ছে। মুসলিম রচিত পুঁথিসমূহের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বাঙালি মুসলমানের চৈতন্যের একটি দিক আমি উদ্ঘাটন করতে চেষ্টা করেছিলাম। আমার রচনাটির শিরোনাম ছিল ‘বাঙালি মুসলমানের মন’। লেখাটি মাসিক সমকালে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই একটা তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। আমি বাঙালি মুসলমানদের বেশিরভাগকেই নিম্নবর্ণের হিন্দুদের বংশধর বলে মস্ত অপরাধ করেছি, এ অভিযোগ করে নানা পত্রপত্রিকায় প্রতিবাদ ছাপা হতে থাকে। আমাদের দেশে এক শীর্ষস্থানীয় কবি ছদ্মনামে তিনটি প্রবন্ধ আমাকে গালাগাল করে লেখেন। প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় আমার বিরুদ্ধে পুরো ছয় মাস ধরে গালমন্দ করে নিবন্ধ লিখতে থাকেন। ওই নিবন্ধগুলো পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে সর্বত্র বিলি করতে আরম্ভ করেন। শুক্রবারে জুম্মার নামাজের পর সমবেত মুসল্লিদের মধ্যে তাঁর পুস্তিকাটি বিনামূল্যে বিতরণ করে জনমতকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকেন। আজাদ সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও তাঁর পুস্তিকাটি বিতরণ করেছিলেন।৩ …
লেখাটার ছাপানোর পর অনেক লোক ছফাকে সমর্থন করেছেন। আবার বিরোধী শিবিরের লোকজনও কম ছিল না। ছফাগিরিতে প্রবন্ধটি নিয়ে বিস্তারিত লেখা উদ্দেশ্য হচ্ছে আহমদ ছফা ঠিক কি কারণে পুঁথি সাহিত্যের বিষয়ের কথা বলে মুসলমান সমাজের পালস্ ঠিক করে বুঝে নিতে চেয়েছেন তার আন্দাজ করা। প্রবন্ধটিতে ফিরে যাই।… মূলতঃ বাঙালী মুসলমানেরা ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত একটি জনগোষ্ঠী।এই অঞ্চলে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার পরে সেই যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবর্তিত হলো, এঁদের হতে হয়েছিল তার অসহায় শিকার। যদিও তাঁরা ছিলেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তথাপি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রণয়নের প্রশ্নে তাঁদের কোনো মতামত বা বক্তব্য ছিলো না। একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলার মৃত্তিকার সাক্ষাৎ সন্তানদের এই সামাজিক অনুশাসন মেনে নিতে হয়েছিল। যেমন কল্পনা করা হয়, অতো সহজে এই বাংলাদেশে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হতে পারেনি। বাংলার আদিম কৌম সমাজের মানুষেরা সর্বপ্রকারে যে ওই বিদেশী উন্নততরো শক্তিকে বাধা দিয়েছিলেন- ছড়াতে, খেলার বোলে অজস্র প্রমাণ ছড়ানো রয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষদের বাগে আনতে অহংপুষ্ঠ আর্য শক্তিকেও যে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার তাঁর বিশ্ব বিশ্রুত ‘ভারতের ধর্মসমূহ’ গ্রন্থে একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন। আর্য বা ব্রাহ্মণ্য শক্তি যে সকল জনগোষ্ঠীকে পদদলিত করে এদেশে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁদেরকে একেবারে চিরতরে জন্ম-জন্মান্তরের দাস বলে চিহ্নিত করেছেন। আর যে সকল শক্তি ওই আর্য শক্তিকে পরাস্ত করে ভারতে শাসন ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন, তাঁদের সকলকেই মর্যাদার আসন দিতে কোনো প্রকারের দ্বিধা বা কুণ্ঠা বোধ করেননি। শক, হুন, মোগল, পাঠান, ইংরেজ যাঁরাই এসেছেন এদেশে তাঁদের সহায়তা করতে পেছপা হননি। কিন্তু নিজেরা বাহুবলে যাঁদের পরাজিত করেছিলেন, তাঁরাও যে মানুষ একথা স্বীকার করার প্রয়োজনীয়তা খুব অল্পই অনুভব করেছেন। তবু ভারতবর্ষে এমনকি বাংলাদেশেও যে, কোনো কোনো নীচু শ্রেণীর লোক নানা বৃত্তি এবং পেশাকে অবলম্বন করে ধীরে ধীরে ওপরের শ্রেণীতে উঠে আসতে পেরেছেন তা অন্যত্র আলোচনার বিষয়।৪ …
যাঁদেরকে এভাবে পদদলিত করা হয়েছিল, পরাজয়ের শোধ নিতে তাঁরা বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেয়। কিন্তু আর্যদের জ্বালায় সুখ আদৌ আসলো না। মুসলমান রাজ্যের প্রতিষ্ঠা লাভের সাথে সাথে ধর্মান্তরিত এসব বৌদ্ধরা দলে দলে ইসলাম ধর্মের আশ্রয় লাভ করেন। এতে তাঁদের সামাজিক প্রভুত্ব লাভের কিছুটা দিশা হলেও জাগতিক সব কষ্টের সুরাহা মিলেনি। হিন্দুদের বর্ণাশ্রম এই উপমাহাদেশের সাম্প্রদায়িকতার আদিমতম উৎস বলে রায় দিয়েছেন আহমদ ছফা। … বাঙালী মুসলমানদের অধিকাংশই বাংলার আদিম কৃষিভিত্তিক কৌম সমাজের লোক। তাঁদের মানসিকতার মধ্যে আদিম সমাজের চিন্তন পদ্ধতির লক্ষণ সমূহ সুপ্রকট। বার বার ধর্ম পরিবর্তন করার পরেও বাইরের দিক ছাড়া তাঁদের বিশ্বাস এবং মানসিকতার মৌলবস্তুর মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দিনের পর দিন গিয়েছে , নতুন ভাবাদর্শে এদেশে তরঙ্গ তুলেছে, নতুন রাজশক্তি এদেশে নতুন শাসনপদ্ধতি চালু করেছে, কিন্তু তাঁরা মনের দিক দিয়ে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মতোই বারবার বিচ্ছিন্ন থেকে গিয়েছেন। মুসলমান সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই ছিলেন বাঙালী মুসলমান এবং মুসলমান রাজত্বের সময়ে তাঁদেরই মানসে যে একটি বলবন্ত সামাজিক আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছিলো তাঁদেরই রচিত পুঁথিসাহিত্য সমূহের মধ্যে তার প্রমাণ মেলে। কাব্য সাহিত্যের নন্দনতাত্ত্বিক বিচার অনুসারে হয়তো এসকল পুঁথির বিশেষ মূল্য নাই। কিন্তু বাঙালী মুসলমান সমাজের নৃতাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় এসবের মূল্য যে অপরিসীম সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।৫ … প্রতিটা জাতির মধ্যের সুপ্ত সামাজিক আবেগ প্রকাশ পায় যখন কোন সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক মুক্তির সুযোগ ঘটে। আর সাহিত্য সেক্ষেত্রে মূল মানদণ্ড হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়ে। তবে ঠিকমতো জাতীয় আকাঙ্ক্ষার সাথে যুক্ত হতে না পারলে ভালো কিছু সেখান থেকে আশা করা যায় না। মুসলমানদের পুঁথি সাহিত্য মহৎ পরিণতির দিকে যেতে পারেনি। … প্রতিবন্ধকতা সমূহ সামাজিক সংগঠনের মধ্যেই বিরাজমান ছিলো। সমাজ সংগঠন ভেঙ্গে ফেলে নব রূপায়ন তাঁরা ঘটাতে পারেননি। কারণ মুসলিম শাসকেরাও স্থানীয় জনগণের মধ্যে থেকে এ নেতৃশ্রেণী সংগ্রহ করেছিলেন, তাদের মধ্যে বাঙালী মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব একেবারে ছিলো বা বললেই চলে। অন্যদিকে ভাষাগত, সংস্কৃতিগত, রুচি এবং আচারগত দূরত্বের দরুণ শাসকশ্রেণীর অভ্যাস, মনন রপ্ত করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বাঙালী মুসলমান।৬ …
আহমদ ছফার প্রবন্ধটিতে কিছু কথার পুনরুক্তি হয়ে গেছে অনেক জায়গায়। প্রথমবার পাঠে মনে হতে পারে ঠিকমতো সম্পাদনার অভাবে এটা হয়েছে। কিন্তু কয়েক বার পড়লে বুঝতে পারা যায় ব্যাপারটা তিনি ইচ্ছে করে করেছেন। সত্যভাষ্যকে দশ জায়গায় বলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছেন ছফা। সত্যের খাতিরেই। জাতীয় সমাজের চেহারা বুঝে নিতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মানসগঠন বুঝে নেয়া তাঁর জন্য জরুরী হয়ে পড়েছিল। এখানে ছফার অন্য একটি প্রবন্ধ নিয়ে কথা বলবো। ‘বঙ্গভূমি আন্দোলন, রাষ্ট্রধর্ম, মুক্তিযুদ্ধঃ বাংলাদেশের হিন্দু ইত্যাকার প্রসঙ্গ’। ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ নিয়ে লেখা আরো কিছুটা এগোবে। পরের কিস্তিতে।পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ন্যাশনালিস্ট থট এন্ড দা কলোনিয়াল ওয়ার্ল্ডঃ আ ডেরিভেটিভ ডিসকোর্স’ বইয়ের বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে আলোচনা পরের কোন কিস্তিতে বিশদে আনার চেষ্টা করবো। সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত ‘বেহাত বিপ্লব ১৯৭১’, ছফার প্রবন্ধ ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ নিয়ে কথাবার্তা আসবে সামনের কিস্তিগুলোতে।
একটি রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের মনোবেদনা বুঝে নিতে ছফা প্রবন্ধটি লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুর সংখ্যা কত ছিল? প্রায় এক কোটির উপরে। জেনারেল ইয়াহিয়া ধারণা করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে এই হিন্দুগুলোকে মেরে কেটে ভাগিয়ে ভারত পাঠিয়ে দিতে পারলে শান্তি নেমে আসবে। এসব হিন্দুর সম্পত্তি মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করে দিতে পারলে গরীব পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানেরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে। যুদ্ধ করার বাসনা তাদের তখন মিটে যাবে। এ কারণেই একাত্তরের যুদ্ধের প্রথম টার্গেট ঠিক করা ছিল হিন্দুরা। ইয়াহিয়ার থিয়োরি যুদ্ধে কাজ করেনি। ফলে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হলো। এদিকে স্বাধীনতার পরে দেশের হিন্দুরা একটা ডিমোরালাইজেশোনের মধ্যে গিয়ে পড়লো। তারা বাংলাদেশে বাস করা নিরাপদ মনে করতে অক্ষম হলো। ছফার প্রবন্ধের শুরু এই জায়গা থেকে। … দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে উনিশশো সাতচল্লিশে একবার ভারত উপমাহাদেশকে ভাগ করা হয়েছিল। মোটামুটি ব্যবস্থাটা ছিলো এরকম। হিন্দুরা ভারত চলে যাবে এবং মুসলমানেরা পাকিস্তান চলে আসবে। বাস্তবে তা কার্যকরও হয়েছিলো। ভারত-পাকিস্তান ভাগাভাগির পর যে পরিমাণ মানুষ এক দেশ থেকে থেকে আরেক দেশে চলে গিয়েছিলো তার পরিমাণ এতো বিপুল ছিলো যে ইতিহাসে তার কোনো তুলনা মেলে না। অনেক হিন্দু ভারতে এলো, অনেক মুসলমান পাকিস্তানে এলো। তারপরেও যাওয়া-আসার পালা সাঙ্গ হলো না। কোটি কোটি মুসলমান ভারতে এবং প্রায় কোটি খানেক হিন্দু পাকিস্তানে থেকে যেতে বাধ্য হলেন। ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করে মুসলমানদের সেখানে থাকার আইনগত স্বীকৃতি দিলো।৭ … ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হলো, হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত হলেন। পাকিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহ একরকম বাধ্য হয়েই এই অবস্থাটা মেনে নিলেন।৮ … পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনের মূল কারণ ছিল ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতি অস্বীকৃতি। হিন্দুরা এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে। … এই যুদ্ধের কাছ থেকে তাঁদের প্রত্যাশার পরিমাণ ছিলো অনেক বেশি। তাঁদের জানমালের ওপর যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে একক সম্প্রদায় হিসেবে অন্য কারো সঙ্গে তার তুলনা চলতে পারেনা। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ক্র্যাক ডাউনের প্রাথমিক পর্যায়ে বেছে বেছে হিন্দুদের বাড়িঘর মহল্লা এবং গ্রামে আগুন লাগিয়ে হিন্দু নর-নারীদের অবলীলায় খুন করে যাচ্ছিলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রাথমিক যে রোষ তা হিন্দু সম্প্রদায়কেই সর্বাপেক্ষা অধিক সহ্য করতে হয়েছে।৯ … ছফা আবেগতাড়িত না হয়ে নির্লিপ্ত চোখে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর ‘একাত্তরঃ মহাসিন্ধুর কল্লোল’ প্রবন্ধটি উল্লেখ করার মতো। তাঁর ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ বইটির কথাও বলতে হবে যেটির প্রথম প্রকাশকাল ছিল ২৮ জুলাই ১৯৭১; প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা থেকে। সাথে নিতে হবে উপন্যাস ‘অলাতচক্র’। একাত্তরের যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশ কোন ভবিষ্যতের দিকে দৌড়াবে- এই উপন্যাসের চরিত্র দানিয়েল ভেবে নেয় … বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উনিশশো আটচল্লিশ থেকেই সংগ্রাম করে এসেছে। আসন্ন ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধটিই কি বাঙালি জাতির বিগত বাইশ বছরের রক্তাক্ত সংগ্রামের একমাত্র ফলাফল। এই যুদ্ধে হয়তো ভারত জয়লাভ করবে এবং ভারতের সহায়তায় আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হবো। আমাদের জাতীয় সংগ্রামের এই পরিণতি। এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম? কি জানি, ইতিহাস কোন দিকে মোড় নিচ্ছে? আমাদের বাবারা পাকিস্তান তৈরি করতে চেয়েছিলেন, আর আমরা পাকিস্তান ভাঙ্গছি। এই যুদ্ধ সংঘাত রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আমদের জাতীয় ইতিহাস কোন ভবিষ্যতের পানে পাড়ি দিচ্ছে? কে জানে!১০ …
যাই হোক জাতীয় ইতিহাস কোন দিকে মোড় নিয়েছে তা আমরা দেখেছি। যুদ্ধের পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতার ভেক ধরলেও পরে ধর্মের আবরণে গা ঢাকে। একাত্তরের পর যেসব হিন্দু ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁদের কিছু অংশ দেশে ফিরে দেখে তাঁদের সবকিছু বেহাত হয়ে গেছে। তাও কোন মতে তাঁরা থেকে যেতে শুরু করলেন। ধরে নিলেন কাঠামো যখন পরিবর্তিত হয়েছে অধিকার তাঁরা আস্তে আস্তে ফিরে পাবেন। সেটা আর হয় নি। ইতিহাসের পাতা একটু তাড়াতাড়ি উল্টে যাই। … মওদুদ আহমদ সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আজ এই দিনে পবিত্র ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে এমন একটি জাতীয় দায়িত্ব পালন করলাম, ভবিষ্যৎ বংশধরেরা এই মহৎ কর্মের জন্য আমাদের কথা কৃতার্থ অন্তরে স্মরণ করবে।’১১ … এই ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবে কিছু আন্দোলন হয়েছে। মিটিং-মিছিল চলেছে। এইটুকুই। বাংলাদেশের মৌলবাদ মাথাচাড়া দেবার পেছনে এই ধর্মীয় মোড়ক বিশাল প্রভাব ফেলেছে বলে আমি মনে করি। ঠিক কোন কারণে বাংলাদেশের সেক্যুলারিজমকে (ধরি সেক্যুলারিজমের বাংলা ‘ধর্ম-স্বাধীনতা’) বাদ দিয়ে ধর্মের লেবাসে নিজেকে ঢেকে ফেলার দরকার হলো- এই ইতিহাস জানা খুব জরুরি।
সূত্র
১। আহমদ ছফার প্রবন্ধ – (ষ্টুডেণ্ট ওয়েজ , জানুয়ারী ২০০০) [পৃষ্ঠা ৬৩]
২। যদ্যপি আমার গুরু – আহমদ ছফা (মাওলা ব্রাদার্স , মে ২০০০) [পৃষ্ঠা ৫৬]
৩। [পৃষ্ঠা ৫৫-৫৬]
৪। আহমদ ছফার প্রবন্ধ – (ষ্টুডেণ্ট ওয়েজ , জানুয়ারী ২০০০) [পৃষ্ঠা ৬৩-৬৪]
৫। [পৃষ্ঠা ৬৪] ৬। [পৃষ্ঠা ৬৫]
৭। রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক প্রবন্ধ- আহমদ ছফা ( জাগৃতি প্রকাশনী, জুন ২০০০)
[পৃষ্ঠা ৯৯]
৮। [পৃষ্ঠা ৯৯] ৯। [পৃষ্ঠা ১০০]
১০। অলাতচক্র- আহমদ ছফা ( শ্রীপ্রকাশ, জুন ২০০০) [পৃষ্ঠা ১৩৩]
১১। রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক প্রবন্ধ- আহমদ ছফা (জাগৃতি প্রকাশনী, জুন ২০০০)
[পৃষ্ঠা ১০৪]
প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, সচলায়তন কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনভাবেই দায়ী নন।
লেখকের এবং মন্তব্যকারীর লেখায় অথবা প্রোফাইলে পরিষ্কারভাবে লাইসেন্স প্রসঙ্গে কোন উল্লেখ না থাকলে স্ব-স্ব লেখার এবং মন্তব্যের সর্বস্বত্ব সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের বা মন্তব্যকারী কর্তৃক সংরক্ষিত থাকবে। লেখকের বা মন্তব্যকারীর অনুমতি ব্যতিরেকে লেখার বা মন্তব্যের আংশিক বা পূর্ণ অংশ কোন ধরনের মিডিয়ায় পুনঃপ্রকাশ করা যাবে না।