Showing posts with label সাদ কামালী. Show all posts
Showing posts with label সাদ কামালী. Show all posts

Thursday, September 16, 2010

রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে ও গদ্যে মুসলমানের কথা ও প্রাসঙ্গিক ভাবনা


সাদ কামালী

শুধু মেঘমল্লারে মেঘের ডাকের জবাব দিয়ে চলবে না, মানব-ইতিহাসের মেঘমন্ত্র প্রশ্নাবলির জবাব দেয়ার কথাও রবীন্দ্রনাথ সবসময় অনুভব করেন। সমুদ্রপারের শ্রীযুক্ত কালিদাস নাগের প্রশ্নে হিন্দুমুসলমান সমস্যার ধরন ও প্রকৃতি বিষয়ে ১৩২৯ সালে লেখা পত্রনিবন্ধে বলেন, ‘পৃথিবীর দু’টি সমপ্রদায় আছে অন্য সমস- ধর্মমতের সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধতা অতুগ্রজ্জসে হচ্ছে খৃস্টান আর মুসলমান ধর্ম। তারা নিজের ধর্মকে পালন করেই সন'ষ্ট নয়, অন্য ধর্মকে সংহার করতে উদ্যত। এইজন্যে তাদের ধর্ম গ্রহণ করা ছাড়া তাদের সঙ্গে মেলবার অন্য কোনো উপায় নেই।’১ তবে ‘আধুনিক যুগের বাহন’১ খৃস্টান ধর্মাবলম্বীদের মন মুসলমানদের মতো ‘মধ্যযুগীয় গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ নয়।’১ হিন্দুমুসলমান সমস্যায় বিব্রত রবীন্দ্রনাথ রচিত সাহিত্যেও ঐক্যের ও সমাধানের পথ খোঁজেন।
“মুসলমানীর গল্প” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনের শেষ গল্প। মৃত্যুর ছয় সপ্তাহ আগে ২৪-২৫ জুন ১৯৪১, বাংলা আষাঢ় ১৩৬২-তে রচিত এই গল্পের প্রধান চরিত্র হবির খাঁ, আর গল্পের ভরকেন্দ্রে রয়েছে বর্ণ হিন্দুদের জাতপাতের সমালোচনার সঙ্গে মুসলমানদের উদারতার কথা। হবির খাঁকে এলাকার মানুষ ‘পয়গম্বরের মতোই ভক্তি করত’। এমনকি ভয়ানক ডাকাত সর্দার মধুমোল্লাও হবির খাঁকে সম্মান করে। হাতের শিকার ফেলে চলে যেতে বাধ্য হয়। গল্পের অন্য প্রধান পাত্র সুন্দরী কমলা জন্মের পরপর বাবা মা হারিয়ে তিন মহলার তালুকদার কাকা বংশীবদনের ঘরে বিবাহযোগ্য হয়ে ওঠে। কিন' তখন খুব একটা সুসময় ছিল না। গল্পের শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘তখন অরাজকতার চরগুলো কণ্টকিত করে রেখেছিল রাষ্ট্রশাসন, অপ্রত্যাশিত অত্যচারের অভিঘাতে দোলায়িত হত দিনরাত্রি। দুঃস্বপ্নের জাল জড়িয়ে ছিল জীবনযাত্রার সমস- ক্রিয়াকর্মে। গৃহস' কেবলই দেবতার মুখে তাকিয়ে থাকত, অপদেবতার কাল্পনিক আশঙ্কায় মানুষের মন থাকত আতঙ্কিত। মানুষ হোক আর দেবতাই হোক কাউকে বিশ্বাস করা কঠিন ছিল।’ আজ প্রায় পঁয়ষট্টি বছর পরেও রাষ্ট্রের অবস'া মুসলমানীর গল্পের এই সূচনা অংশের মতো অবিকলই শুধু নয় বরং রাষ্ট্রশাসন, দেবতা, অপদেবতা আর মানুষের অমানবিক আচরণ আরও ফুলে ফেঁপে উঠেছে। তবে মুসলমানীর গল্পে রবীন্দ্রনাথের ইঙ্গিত মতো কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনাই ঘটেনি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও বিশেষ নতুন হয়ে এই গল্পে উপসি'ত নন। কাকা-কাকীর সংসারে কমলা কাকীর গালমন্দ নিত্যই খেত, এ নতুন কিছু নয়। কমলার বিয়ে হলো, বরযাত্রী যাবে বিখ্যাত তালতড়ির মাঠ দিয়ে। সেই মাঠ দিয়ে যাওয়ার সময় আরেক বিখ্যাত ডাকাত সর্দার মধুমোল্লা আক্রমণ করতে পারে সেই আশঙ্কার কথা গল্পে আছে। এবং মধুমোল্লা আক্রমণ করে। মধুমোল্লার হাত থেকে কমলাকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসেন মুসলমান হবির খাঁ। মুসলমানীর গল্পে হবির খাঁও অপ্রত্যাশিত নয়, উপরন' শুরুতেই যখন দেবতা-অপদেবতার সমালোচনা করা হয়েছে। হবির খাঁ চরিত্রের মধ্যে একাশি বছরের প্রাজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ নিজের চিন-া বোধ বিশ্বাস আরোপ করার চেষ্টা করেন। বৃদ্ধ হবির খাঁ কমলাকে কন্যা ডেকে নিজের ঘরে নিয়ে যেতে চান। কমলা মুসলমানের ঘরে যেতে সঙ্কুচিত, রবীন্দ্রনাথ তখন হবিরের কণ্ঠে সংলাপ দেন, ‘বুঝেছি, তুমি হিন্দু ব্রাহ্মণের মেয়ে, মুসলমানের ঘরে যেতে সঙ্কোচ হচ্ছে। কিন' একটা কথা মনে রেখো - যারা যথার্থ মুসলমান তারা ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণকেও সম্মান করে।’ তবুও কমলা তার কাকার ঘরেই ফিরে যেতে চাইলে হবির খাঁ কমলাকে সতর্ক করে দেন, ‘আজ তোমার বাড়িতে কেউ তোমাকে ফিরে নেবে না, তোমাকে পথের মধ্যে ফেলে দিয়ে যাবে।’ প্রথা ও প্রত্যাশা মতো কাকী তাইই বলে, ‘দূর করে দাও, দূর করে দাও অলক্ষ্মীকে। সর্বনাশিনী, বেজাতের ঘর থেকে ফিরে এসেছিস, আবার তোর লজ্জা নেই।’ কাকা বলে, ‘উপায় নেই মা ! আমাদের যে হিন্দুর ঘর।’ কমলা চিরদিনের মতো হবির খাঁ’র আশ্রয়ে জায়গা করে নেয়। রবীন্দ্রনাথ হবির খাঁ’র বাড়ির প্রশংসাসূচক বর্ণনা করে বলেন, ‘আশ্চর্য, এই মুসলমান বাড়ির আটমহলা বাড়ির এক মহলে আছে শিবের মন্দির আর হিন্দুয়ানির সমস- ব্যবস'া।’ আট মহলা মুসলমান বাড়ির একজন বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ কমলাকে এসে বলে, ‘মা, হিন্দুর ঘরের মতো এ জায়গা তুমি জেনো, এখানে তোমার জাত রক্ষা হবে।’ যে জাতের গুমরে কমলা এখন আত্মীয় পরিজন পরিত্যক্ত, সেই জাত রক্ষা হবে হবির খাঁ’র আট মহলায় ! হবির খাঁ কোনো বিপ্লবী বা সমাজ সংস্কারক নন, তাঁর আশ্রয়ে হিন্দু মুসলমান জাত রক্ষা করে, হিন্দু মুসলমানের ছোঁয়া বাঁচিয়ে সম্মানের সঙ্গেই থাকতে পারে। মুসলমানদের উদারতার কথা বলতে যেয়ে গল্পের কথক রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘তখনকার বংশীয় মুসলমানেরা ধর্মনিষ্ঠ হিন্দুকে শ্রদ্ধা করত।’ ছোট বংশীয় বা অবংশীয় মুসলমানরা কি করত ? তখনকার দিনে কম ধর্মনিষ্ঠ হিন্দুদের সঙ্গে বংশীয় বা অবংশীয় মুসলামনেরা কেমন আচরণ করত !
গভীর প্রাজ্ঞ অভিজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ এই ছোট আয়তনের রচনাটিতে বহুবার ‘বংশীয়’ ‘ব্রাহ্মণ’ বা ‘উঁচু বর্ণ জাত রক্ষা’ প্রভৃতি সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের প্রতি দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন। বংশীয় হবির খাঁ বেশি নম্বর পেয়ে যাচ্ছেন কারণ তাঁর আস-ানায় শিব পূজা এবং হিন্দুয়ানির সমস- ব্যবস'াসহ ‘জাত রক্ষা’ ব্যবস'া আছে। বংশীয় গৌরব বা জাত সংস্কার মুক্ত আটমহলার খোলা উদার পরিবেশের কথা নয়। বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার সঙ্গে সব ধর্মের মানুষের সহ-অবস'ান রবীন্দ্রনাথের সুদীর্ঘকালের একান- কামনা। অনেক প্রবন্ধ, চিঠিতে তাঁর এই আর্তি ঝরে পড়েছে। এই সহ-অবস'ানের পথে অন্যতম প্রধান বাধা যে হিন্দুদের জাত সমস্যা সে-কথাও তাঁর মতো করে এত অকপটে, প্রচুর পরিমাণে অন্য কোনো মনীষী বলেছেন কিনা তা গবেষণার বিষয়। কালিদাস নাগকে লিখিত ওই পত্রেই রবীন্দ্রনাথ হিন্দুর বাঁচার সমস্যার কথা লেখেন, ‘... হিন্দুজাতিও এক হিসেবে মুসলমানেরই মতো। অর্থাৎ, তারা ধর্মের প্রাকারে সম্পূর্ণ পরিবেষ্টিত, বাহ্য প্রভেদ হচ্ছে এই যে, অন্য ধর্মের বিরুদ্ধতা তাদের পক্ষে সকর্মক নয়জ্জঅহিন্দু সমস- ধর্মের সঙ্গে তাদের (হিন্দুজাতির) হড়হ-ারড়ষবহঃ হড়হ-পড়ড়ঢ়বৎধঃরড়হ। হিন্দুর ধর্ম মুখ্যভাবে জন্মগত ও আচারমূলক হওয়াতে তার বেড়া আরো কঠিন। ...আচার হচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধের সেতু, সেইখানেই পদে পদে হিন্দু নিজের বেড়া নিজে তুলে রেখেছে। ...অন্য আচার অবলম্বীদের অশুচি বলে গণ্য করার মতো মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের এমন ভীষণ বাধা আর কিছু নেই।’১ মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলনের ঐক্যে এবং সহ অবস'ানের কথা তাঁর মতো তিনি বার বার বলেন। ‘আসল কথা, ঐক্যের ধর্ম প্রাণধর্মের ন্যায়। সে জড়ধর্মের ন্যায় কেবল একাংশে বদ্ধ থাকে না। ... আমরাও বর্ণ এবং কুল-মর্যাদা একটি সূক্ষ্ম সূত্রের মতো অনেকদিন হইতে টানিয়া লইয়া চলিয়াছি। তাহার শ্রেণী-গোত্র-গাঁই-মেল সম্বন্ধীয় সংক্ষিপ্ত সাহিত্য ভাটেদের মুখে উত্তরোত্তরে বাড়িয়া চলিয়াছে। ইহা আমরা ভুলিতে দিতে পারি না। কারণ আমাদের সমাজে যে ঐক্য আছে তাহা প্রধানত বর্ণগত। ... কিন' আমাদের মধ্যে যদি জনগত ঐক্য থাকিত, যদি পরস্পর সংলগ্ন হইয়া জয়ের গৌরব, পরাজয়ের লজ্জা, উন্নতির চেষ্টা আমরা এক বৃহৎ হৃদয়ের মধ্যে অনুভব করিতে পারিতাম, তবে সেই জনমণ্ডলী স্বভাবতই ঊর্ণনাভের মতো আপনার ইতিহাসতত্ত্ব প্রসারিত করিয়া দূর-দূরান-রে আপনাকে সংযুক্ত করিত।’২ আবার মুসলমানের ভিতরে ঐতিহাসিক সমস্যার কথাও বলেছেন বিস-র। এই প্রবন্ধ রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পে মুসলমানের জীবন যাপন এবং প্রাসঙ্গিকভাবে মুসলমানদের সম্পর্কে তাঁর চিন-া-ভাবনা খুঁজে দেখার প্রয়াসে নিবন্ধ থাকবে।
আটমহলা বাড়ির আন-রিক পরিবেশ এবং হবির খাঁ’র স্নেহমাখা প্রশ্রয়ে মুগ্ধ কমলার জীবনে নতুন দোলা লাগে। হবির খাঁ’র ছোট ছেলে আড়ালে আবডালে কমলার মনে রঙ ও প্রেমের জোয়ার বয়ে নিয়ে আসে। ব্রাহ্মণের মেয়ে কমলা এক সময় হবির খাঁ’র কাছে আত্মসমর্পণ করে, ‘বাবা, আমার ধর্ম নেই, আমি যাকে ভালোবাসি সেই ভাগ্যবানই আমার ধর্ম। ... তোমার মেজো ছেলে করিম, তাকে আমি মনের মধ্যে গ্রহণ করেছিজ্জআমার ধর্মকর্ম ওরই সঙ্গে বাঁধা পড়েছে। তুমি মুসলমান করে নাও আমাকে, তাতে আমার আপত্তি হবে নাজ্জআমার নাহয় দুই ধর্মই থাকল।’ হবির খাঁ’র জীবনে ‘দুই ধর্মের’ ইতিহাস থাকলেও কমলাকে ‘কমলা’ না রেখে ‘মেহেরজান’ বানিয়ে নেন। হবির খাঁ’র আদর্শে দীক্ষিত মেহেরজান হয়ে উঠল হবির খাঁ’র সৈনিক। ওই তালতড়ির মাঠে আবার একটি বরযাত্রী মধুমোল্লার ডাকাতের হাতে ধরা পড়লে পিছন পিছন হুঙ্কার ছুটে আসে ‘খবরদার’। ডাকাতের দল হবির খাঁ’র চেলাদের হুঙ্কারে পিছিয়ে যায়। অন্যদিকে পালকির মধ্যে কন্যাকে ফেলে কন্যাপক্ষের পালিয়ে যাওয়ার পথে উদিত হয় হবির খাঁ’র অর্ধচন্দ্র আঁকা পতাকা বাঁধা বর্শার ফলক। সেই বর্শা নিয়ে নির্ভয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি রমণী। সে আর কেউ নয়জ্জমেহেরজান। কন্যাও কমলার কাকার দ্বিতীয় মেয়ে সরলা। মেহেরজান ওরফে কমলা কাকাকে প্রণাম করে সুরক্ষিত সরলাকে তাঁর হাতে এই নিশ্চয়তায় তুলে দেয় যে, ‘একে তোমার ঘরে নিয়ে যাও, একে কিছুতে অস্পৃশ্য করেনি।’ আর যদি গ্রহণ না করে তাহলে সরলার জন্য তো রইল তার মুসলমান দিদি মেহেরজান। ‘মুসলমানীর গল্প’র এই প্রধান দুটি মানুষ আদর্শ, তেজ ও উদারতার স্বাক্ষর। মজার কথা, রবীন্দ্রনাথের এই দুই আদর্শের জন্মই উঁচু জাতের হিন্দু গর্ভজাত। ব্রাহ্মণের মেয়ে কমলার মতো হবির খাঁ’র মাতা ছিলেন রাজপুতানী। কোনো এক মুসলমান নবাব রাজপুতানীকে নিয়ে এই আটমহলায় সংসার পেতেছিলেন। নবাবের উদারতায় রাজপুতানী তাঁর হিন্দু ধর্ম রক্ষা করে পূজা-আর্চা সবই ঠিকঠাক পালন করতে পেরেছিলেন। মহলার শিব মন্দির তাঁর জন্যই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তো হবির খাঁ’র পিতা একজন বংশীয় মুসলমান, মাতা উচ্চবংশীয় হিন্দু কিন' হবির খাঁ গ্রহণ করেছিলেন পিতার ধর্ম ইসলাম। পিতার আদর্শে তিনি সব ধর্মের সহ-অবস'ানের রেওয়াজ রক্ষা করে চলেন।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ‘ঋতুপত্র’ পত্রিকায় আষাঢ় সংখ্যায় (১৩৬২) ‘মুসলমানীর গল্প’টি প্রথম প্রকাশিত হয়।৩ শেষ দিকের অনেক কবিতা গল্পের মতো এই গল্পটিও ছিল শ্রুতি লিখন। ‘বদনাম’ ‘প্রগতিসংহার’ প্রভৃতি শ্রুতি লিখন গল্পে রবীন্দ্রনাথ নিজ হাতে সংশোধন সংযোজন করেছিলেন, ‘শেষ পুরস্কার’ (রচনা ৫-৬ মে ১৯৪১), এবং ‘মুসলমানীর গল্প’র ভাগ্যে রবীন্দ্রনাথের হাতের সংশোধনী জোটেনি। তাই ঋতুপত্রে গল্পটি ‘খসড়া’ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ‘মুসলমানী গল্প’র প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে প্রথম দিকের সুনির্মিত গল্প ‘দালিয়া’ রচনাকাল মাঘ ১২৯৮, প্রথম প্রকাশ হয় ‘সাধনা’ সাময়িক পত্রের ওই মাঘ ১২৯৮ সংখ্যায়। গল্পের শুরুতে মুসলমান শাসকদের ক্রানি-কালের একটি ঘটনা ভূমিকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে ‘দালিয়া’ একটি ছোট গল্পই, ইতিহাস নয়। ইতিহাস প্রেক্ষাপটে গল্পের আবহ বুঝতে হয়তো সাহায্য করে। এই ভূমিকার ইতিহাস সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘দালিয়া গল্পটায় ইতিহাস যেটুকু আছে সে আছে গল্পের বহিঃপ্রাঙ্গণে - অর্থাৎ গাছে চড়িয়ে দিয়ে মই নিয়েছে ছুটি। আসল গল্পটা ষোল আনাই গল্প।৪ মই ছুটি নিলেও তার ভূমিকা অগৌণ নয়, বিশেষ করে এই প্রবন্ধের জন্য ; গল্পটির রস গ্রহণেও মই-এর কথা জানার দরকার। ঔরঙ্গজেবের ভয়ে পরাজিত শা সুজা তিন কন্যা নিয়ে আরাকান-রাজের আতিথ্য গ্রহণ করেছেন। আরাকান রাজের ইচ্ছা শা সুজার সুন্দরী কন্যাদের সঙ্গে তার রাজপুত্রদের বিয়ে হোক। শা সুজা এই প্রস-াবে সম্মত হতে পারেন না। আরাকান রাজের আদেশে শা সুজাকে প্রতারণা করে নৌকায় নিয়ে নদীমধ্যে ডুবিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়। শা সুজা ছোট মেয়ে আমিনাকে নিজেই নদীর মধ্যে ছুড়ে ফেলেন, বড় মেয়ে আত্মহত্যা করে, শা সুজার একজন বিশ্বস- কর্মচারী রহমত আলী জুলিখাকে নিয়ে নদী সাঁতার দিয়ে পালায়। নদীতে নিক্ষিপ্ত আমিনা একজন জেলের জালে জড়িয়ে কোনোরকমে বেঁচে যায় এবং জেলের ঘরেই বড় হতে থাকে। এর মধ্যে রাজার মৃত্যুর পর যুবরাজ রাজ্যে অভিষিক্ত হয়েছেন। এই পটভূমিতে গল্পের শুরু। জেলের বাড়িতে আমিনার খোঁজ পেয়ে মেজো জুলিখা তার কাছে চলে আসে। জুলিখার মনে প্রতিহিংসার আগুন, রাজ ঐতিহ্যের অহং। পিতার হত্যার বদলা নিয়ে দিল্লীর সিংহাসনও করায়ত্ত করার বাসনা মনে মনে পোষে, চোখে আগুন, ‘ঈশ্বর যে আমাদের দুই ভগ্নীকে মৃত্যুর হাত হইতে রক্ষা করিয়াছেন সে কেবল পিতার হত্যার প্রতিশোধ লইবার জন্য।’ আমিনা নদীর পরপারে দূরে ছায়াময় বনশ্রেণীর দিকে উদাস চোখ রেখে বলে, ‘আমার এই পৃথিবীটা একরকম বেশ লাগিতেছে। মরিতে চায় তো পুরুষগুলো কাটাকাটি করিয়া মরুক গে, আমার এখানে কোনো দুঃখ নাই।’ জুলিখা ছি ছি করে ওঠে, ‘তুই কি শাহজাদার ঘরের মেয়ে। কোথায় দিল্লির সিংহাসন, আর কোথায় আরাকানের ধীবরের কুটির।’ আমিনা বৃদ্ধ ধীবরের কুটিরের প্রাকৃতিক পরিবেশে সুখে আছে। বিশেষ করে স্বতঃস্ফূর্ত প্রকৃতির মতো দালিয়া নামের এক তরুণ তখন এই কুটির ও পরিবেশে আনন্দ বয়ে এনেছে। যে আনন্দের রঙে কিশোরী আমিনা বিভোর ও উদাস - জুলিখা আমিনার এই মনের খোঁজ পেয়েও প্রলুব্ধ করতে চায়, আরাকান-রাজকে হত্যা করে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ না নিতে পারলে তার শানি- নেই। জুলিখার এই প্রতিশোধ স্পৃহা চরিত্রের মধ্যে মুসলমান রাজরাজাদের বা শাসকদের মন-মানসিকতার বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ নিজের চিন-া অবচেতনেই হয়তো রোপণ করে দিয়েছেন। ক্ষমতা ও রাজ্যজয়ের জন্য স্নেহমায়া ছিন্ন করে খুন হত্যার কথা দালিয়া লিখবার ছয় সাত বছরের মধ্যেই উল্লেখ করেন ‘ভারতবর্ষে মুসলমান রাজত্বের ইতিবৃত্ত’ প্রথম খণ্ড শ্রী আব্দুল করিম বি.এ. প্রণীত, গ্রন' আলোচনার সময়। এই গ্রন' আলোচনা কালে সম্রাট শাহজাহানের পরিবারের চিত্র তাঁর মনে হওয়াই স্বাভাবিক। ‘দালিয়া’ গল্পের জুলিখা সম্রাটের নাতনি। রবীন্দ্রনাথ হিন্দুদের নিষ্কাম, উদ্দামহীনতা, শাস্ত্র নিয়ে অধিক ব্যস- থাকায় অনুশোচনা করে মুসলমান ও ইউরোপীয়দের জেহাদী-প্রবণতার কথা বলেন, ‘মুসলমানেরা যুদ্ধ করিয়াছে, আর হিন্দুরা দলে দলে আত্মহত্যা করিয়াছে। মুসলমানদের যুদ্ধের মধ্যে একদিকে ধর্মোৎসাহ, অপর দিকে রাজ্য অথবা অর্থলোভ ছিল ; কিন' হিন্দুরা চিতা জ্বালাইয়া স্ত্রীকন্যা ধ্বংস করিয়া আবালবৃদ্ধ মরিয়াছেজ্জমরা উচিত বিবেচনা করিয়া ; ...। মুসলমানদের ইতিহাসে দেখি উদ্দাম প্রবৃত্তির উত্তেজনার সম্মুখে ক্ষমতা লাভ স্বার্থসাধন সিংহাসন প্রাপ্তির নিকটে স্বাভাবিক স্নেহ দয়া ধর্ম সমস-ই তুচ্ছ হইয়া যায় ; ভাই-ভাই, পিতা-পুত্র, স্বামী-স্ত্রী, প্রভু-ভৃত্যের মধ্যে বিদ্রোহ বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, রক্তপাত এবং অকথ্য অনৈসর্গিক নির্মমতার প্রাদুর্ভাব হয়...।’৫ ছোট পরিসরের রচনা দালিয়া, আরও ছোট চরিত্রের জুলিখা এখানে ‘অকথ্য অনৈসর্গিক নির্মম’ মুসলমানেদের প্রতিনিধি তুল্য। আমিনা (ধীবরের ঘরে এসে নাম হয়েছে তিন্নি) আর দালিয়া মিলে প্রেম-ভালোবাসায় চতুর্দিকের প্রাকৃতিক জগতের সঙ্গে একাকার, ধীবরের বর্বর কুটিরের মধ্যে নির্জন দারিদ্র্যের ছায়ায় এত রহস্য এত সুখ এত অতল স্পর্শ কৌতূহলে আন্দোলিত। জুলিখা কুলগর্ব আর লোকমর্যাদার ভাবের ভিতরে দালিয়া-আমিনার ক্রীড়া দর্শন ও অনুভব করলেও মেনে নিতে পারে না। যে ভাবেই হোক আমিনাকে সৌন্দর্য থেকে ছুটিয়ে এনে পিতৃহত্যার প্রতিশোধ সম্পন্ন করতে হবে। তিন্নি বা আমিনা কবি রবীন্দ্রনাথের কল্পনায় সৃষ্টি, জুলিখার জন্ম তাঁর ইতিহাস পাঠের নিজস্ব মূল্যায়ন থেকে।
‘মুসলমানীর গল্প’-এর হবির খাঁ’র মতো জুলিখার অবস'ান সংলাপ স্বতঃস্ফূর্ত নয়, জুলিখা তিন্নির মতো দৃষ্টি ও বোধগ্রাহ্য নয়। চিন-ার পরোক্ষ আরোপে কমলা বা তিন্নির থেকে হবির খাঁ, জুলিখা অনেক আলাদা। কারণ রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, প্রাচীন প্রাচ্য অনাধুনিক মুসলমানের প্রভাব রাষ্ট্রপ্রণালীতে থাকলেও চিত্তে কোনো প্রভাব পড়েনি। ভারতে আরব-পারস্য থেকে মুসলমান আসবার আগেও ভিন্ন দেশ থেকে শাসক বণিক এসেছে। কিন' রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘বাইরে থেকে প্রথম বিরুদ্ধ আঘাত লাগল (ভারতে) মুসলমানের। কিন' সে-মুসলমানও প্রাচীন প্রাচ্য, সেও আধুনিক নয়। সেও আপন অতীত শতাব্দীর মধ্যে বদ্ধ। বাহুবলে যে রাজ্য সংঘটন করেছে কিন' তার চিত্তের সৃষ্টিবৈচিত্র্য ছিল না। ... রাষ্ট্র প্রণালীতে মুসলমানের প্রভাব প্রবেশ করেছে, চিত্তের মধ্যে তার ক্রিয়া সর্বতোভাবে প্রবল হয়নি।’৬ জুলিখার মধ্যে তাই রাজনৈতিক চিন-ার প্রভাব, চিত্তের নয়। ধীবরের ঘরে আমিনার খেলার সঙ্গী, কাজকর্মের সাহায্যকারী দালিয়াকে ধীরে ধীরে জুলিখাও পছন্দ করতে শুরু করে তার নিজের অবস'ান থেকে, আমিনার মতো সম্পূর্ণ সমর্পণ করে না। দালিয়া গল্পে আরও একটি চরিত্র আছে, তাকে দেখা যায় না, শুধু তিনবার তার কাজের খবর পাওয়া যায়। তিনি রহমত আলি অথবা শেখ রহমত। রবীন্দ্রনাথই দুইরকম নাম লিখেছেন। অসচেতনতা না অন্য কোনো অর্থ আছে ! মুসলমান পরিবারে জুলেখা বা জোলেখা প্রচলিত থাকলেও ‘জুলিখা’ কখনো নয়। তবে গল্পের চরিত্র জুলিখা হতেই পারে। তো এই জুলিখাকে নিয়ে নদী সাঁতার দিয়ে পালিয়ে রক্ষা করে রহমত আলি। পরে আরাকান রাজসভায় নাম বদলিয়ে চাকরি করে, এবং শেষে রহমত জুলিখাকে গোপনে খবর পাঠায় - আরাকানের রাজা শা সুজার কন্যাদের খোঁজ পেয়েছে, ধীবরের বাড়িতে আমিনাকে দেখে রাজা মুগ্ধ। তাকে ‘বিবাহার্থে অবিলম্বে প্রাসাদে আনিবার আয়োজন করিতেছেন।’ জুলিখা শিহরিত, প্রতিশোধ নেবার এইতো সুযোগ। বধু সাজে সজ্জিত আমিনার হাতে অতি যত্নে রক্ষিত ‘হসি-দন- নির্মিত কারুকার্য’ করা একখানা ছুরি তুলে দেয়। এর আগে জুলিখা একদিন দালিয়ার হাত চেপে ধরে বলেছিল, ‘দালিয়া, এখানকার রাজাকে দেখাইয়া দিতে পার ?’ কেন ? ‘আমার একটা ছোরা আছে, তাহার বুকের মধ্যে বসাইতে চাহি।’ ‘প্রথমে দালিয়া কিছু আশ্চর্য হইয়া গেল। তাহার পর জুলিখার হিংসাপ্রখর মুখের দিকে চাহিয়া সমস- মুখ হাসিতে ভরিয়া গেল।’ জুলিখা এখন সেই ছোরাটাই আমিনার হাতে তুলে দেয়। গল্পের শেষে আমিনা সসঙ্কোচে রাজার ঘরে প্রবেশ করে। ঘরের মাঝখানে ‘মছলন্দ-শয্যার’ উপর রাজা বসে আছে। তখন জুলিখা নিজে এগিয়ে এসে দেখে রাজা তো আর কেউ নয়, স্বয়ং দালিয়া, আরাকান রাজ। আরাকান রাজের ইচ্ছা ও প্রেমের জয়, জুলিখা ও শা সুজার মনোবাসনা পরাস- হলো।
রাজা-রাজকন্যাদের নিয়ে গল্প ‘দালিয়া’ অত্যন- সুপরিকল্পিত। গল্পের শুরু থেকে শেষে আসবার সব আয়োজন ধীরে ধীরে পাঠকের অগোচরে ঘটেছে। ইঙ্গিত ব্যঞ্জনার অভাব নাই। শুধু একটি সমস্যা সচেতন পাঠক খুঁজে পেতে পারেন, ছদ্মবেশী দালিয়া পাঠকের চোখ ও মনের গোচরে মূর্ত হয়ে ওঠে, তিন্নিও কখনো সখনো। আর জুলিখার চরিত্রের হিংসা প্রবণতা, প্রচ্ছন্ন প্রেমাবেগের খবর পাওয়া যায় মাত্র, তবে তার পোশাক পরিচ্ছেদ, চেহারার বর্ণনা, সংলাপ এবং ওঠাবসার প্রয়োজনীয় ডিটেলের অভাবে জুলিখা সম্পূর্ণ হয়ে ওঠে না। শাহজাদা সুজার কন্যাকে কি কল্পনাতেও দেখা যেতে পারে না ! হবির খাঁ’ও পাঠকের চক্ষু গোচর হয় না, যদিও এই দুটি চরিত্রই গল্প লেখকের চিন-ার প্রধান বাহক।
‘সমস্যাপূরণ’ (১৩০০) গল্পে ঝিকড়াকোটার বর্তমান জমিদার ‘সুশিক্ষিত বি.এ.’ ‘অতিশয় সচ্চরিত্র’ বিপিনবিহারী সরকার প্রজাগণের সঙ্গে শুধু ‘দেনাপাওনার সম্পর্ক’ ছাড়া আইন-বহির্ভূত অন্য পাঁচরকমের আদায় বা দানখয়রাতের সম্পর্কে পক্ষপাতি নয়। জমিদার কৃষ্ণগোপাল সরকার বয়সকালে ছেলে বিপিনবিহারীর কাছে জমিদারী অর্পণ করে গেছেন কাশি। নতুন জমিদার খাজনা আদায়ে কোনো দান দক্ষিণায় নারাজ। প্রজাগণ ধীরে ধীরে বিপিনবিহারীর খাজনা আদায় শাসন পদ্ধতি ভয়ে, বাধ্য হয়ে মেনে নিলেও কেবল বিধবা ‘মির্জাবিবির পুত্র অছিমদ্দি কিছুতেই বাগ মানিল না।’ বিপিনবিহারীর বিস্ময় ‘একটা সামান্য যবন বিধবার ছেলে গ্রামের ছাত্রবৃত্তি স্কুলে দুইছত্র লিখিতে পড়িতে শিখিয়াছে’ তার এতদূর অগ্রাহ্য করার সাহস হয় কেমনে ! এই বিস্ময় পাঠকেরও হতে পারে। ‘যবনীর গর্ভে’র সন-ান অছিমদ্দির এই সাহসের ‘কারণ’ রবীন্দ্রনাথের সমস্যাপূরণ গল্পে ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়। চার পরিচ্ছদে সমাপ্ত গল্পের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে অছিমদ্দির আবির্ভাব। গল্পে সাহসী অছিমদ্দি পূর্বে পাওয়া দান, রেয়াত বা ‘নিষ্কর ও স্বল্প-কর’ সুবিধা কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। দাবী আদায়ে নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত করতে করতে নিঃস্ব হয়ে যায়, দেনায় ডোবে। নিলামে ওঠে সব। একদিন হাটের মধ্যে ‘অছিমদ্দি কাটারি তুলিয়া বাঘের মতো গর্জন করিয়া বিপিনবাবুর প্রতি ছুটিয়া আসিল।’ একের পর এক আদালতে আইনি লড়াইয়ে হেরে যেয়েও উচ্চ আদালতে আপিল করা, জমিদারকে কাটারি হাতে আঘাত করতে যাওয়া ‘সাহসী’ অছিমদ্দিকে নায়ক করে তোলে না। উপর্যপরি গল্পে বিপিনের অন্যায় বা আইন বহির্ভূত খাজনা আদায়ের কথা নেই, আছে বিপিনের নিয়মনিষ্ঠতার কথা, সচ্চরিত্রের কথা। ‘চিরস'ায়ী বন্দোবস-’র যুগে আইন জমিদারের ন্যায্য খাজনা আদায়ের সহায়কজ্জঅছিমদ্দি বার বার হেরেও তা বুঝতে পারে না। তার সাহস তেজ বিস্ময় সৃষ্টি করে বৈকি। ‘সমস্যাপূরণ’ গল্পে জমিদার কৃষ্ণগোপাল সরকার অত্যন- প্রজাপ্রিয়, দান খয়রাতে তিনি উদার, ছেলে বিপিন দান খয়রাত না করলেও মন্দলোক হিসেবে গল্পে উপসি'ত নয়। বরং অনেক শ্রেয় বিশেষণে ভূষিত। কিন' অছিমদ্দি ‘উদ্ধত’। শেষ পর্যন- অছিমদ্দি জেল, আদালত এবং নিঃস্ব হওয়ার করুণ অবস'া থেকে উদ্ধার পায় বিপিনবিহারীর মাধ্যমে। পিতার আদেশ মান্য করে বিপিন অছিমদ্দির পূর্বের অবস'া ফিরিয়ে দেয়। ‘সাহসী’ ‘বাঘের মতো’ অছিমদ্দিও হবির খাঁ’র মতো মুসলমান। হবির খাঁ পিতার ধর্মানুযায়ী মুসলমান, অছিমদ্দি মাতার ধর্মানুযায়ী মুসলমান। কারণ তার পিতৃ পরিচয় অত্যন- গোপনীয়, বিবাহ বহির্ভূত এই জন্ম ইতিহাস। মির্জাবিবির গর্ভে স্বয়ং জমিদার কৃষ্ণগোপালের ঔরসে অছিমদ্দির জন্ম। অবৈধ্য হলেও জমিদারের পুত্র অছিমদ্দি ! এই তথ্য কৃষ্ণগোপালের মুখ থেকে জেনে বিপিন বিস্ময়ে উচ্চারণ করে, ‘যবনীর গর্ভে ?’ কৃষ্ণগোপাল বলে, ‘হ্যাঁ বাপু।’ গল্পের পাঠক যবনী বিধবার যবন সন-ানের সাহসী হওয়ার কারণ বুঝে নেয় ! সমস্যাপূরণ গল্পটি প্রথম প্রকাশ হয় সাধনা পত্রে, ১৩০০ সালের অগ্রহায়ণ সংখ্যায়। পরে, রবীন্দ্রনাথের প্রথম গল্পগ্রন' ‘ছোটগল্প’-এ অন-র্ভূত হয়ে প্রকাশিত হয় ২৬ ফেব্রুয়ারি ১৮৯৪ সনে। এই প্রবন্ধে অনালোচিত গল্প ‘দুরাশা’র (১৩০৫) নায়িকাও নবাব গোলামকাদেরের কন্যা, এবং এই নবাবপুত্রীর শরীরেও ‘ব্রাহ্মণ পিতামহীর রক্ত নিষ্কলুষতেজে সর্বাঙ্গে প্রবাহিত।’ দেখা যাচ্ছে, মুসলমান চরিত্রগুলো শুধু উচ্চবর্গেরই নয়, তাদের প্রায় প্রত্যেকের আছে উচ্চবর্ণ ও উচ্চবর্গ হিন্দুর রক্তের সঙ্গে গভীর আত্মীয়তা !
সতেরো বছর বয়সে প্রথম ‘বিলেত’ যাওয়ার আগে রবীন্দ্রনাথকে বিলেতি চালচলন সহবতের গোড়াপত্তন করে নিতে আসতে হয় আহমেদাবাদে মেজদাদা ভারতের প্রথম আই সি এস সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। মেজদাদা তখন আহমেদাবাদে ‘জজিয়তি’ করছিলেন। জজের বাসা ছিল শাহিবাগ প্রাসাদ, বাদশাহি আমলের রাজবাড়ি। দিনের বেলা সত্যেন্দ্রনাথ কাজে চলে যাওয়ার পর সবরমতী নদীর পারে সম্রাট শাজাহানের তৈরি শাহীবাগ প্রাসাদ সদ্য তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথের চৈতন্যের ওপর এসে ভর করত। ‘বড়ো বড়ো ফাঁকা ঘর হাঁ হাঁ করছে, সমস- দিন ভূতে-পাওয়ার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছি। সামনে প্রকাণ্ড চাতাল, সেখান থেকে দেখা যেত সবরমতী নদী হাঁটুজল লুটিয়ে নিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছে বালির মধ্যে। ...আমেদাবাদে এসে এই প্রথম দেখলুম চলতি ইতিহাস থেমে গিয়েছে, দেখা যাচ্ছে তার পিছন-ফেরা বড়ো ঘরোআনা। তার সাবেক দিনগুলো যেন যক্ষের ধনের মতো মাটির নীচে পোঁতা।’৭ মুসলমান সম্রাটের তৈরি এই প্রাসাদ ঘিরে রবীন্দ্রনাথের মনে স্বপ্ন কল্পনা চিন-া বুদ্বুদ তোলে, যেন তিনি দেখতে পাচ্ছেন, ‘নহবতখানায় বাজছে রোশনচৌকি দিনরাত্রে অষ্ট্রপ্রহরের রাগিনীতে, রাস-ায় তালে তালে ঘোড়ার খুরের শব্দ উঠছে, ঘোড়াসওয়ার তুর্কি ফৌজের চলছে কুচকাওয়াজ, তাদের বর্শার ফলায় রোদ উঠছে ঝকঝকিয়ে। বাদশাহি দরবারের চারদিকে চলেছে সর্বনেশে কানাকানি ফুসফাস। অন্দরমহলে খোলা তলোয়ার হাতে হাবসি খোজারা পাহারা দিচ্ছে। বেগমদের হামামে ছুটছে গোলাপজলের ফোয়ারা, উঠছে বাজুবন্ধ-কাঁকনের ঝনঝনি।’৬ শাহীবাগ প্রাসাদ নিয়ে এই কল্পনা দীর্ঘকাল তিনি যক্ষের ধনের মতো মনের কোথাও লালন করে রাখেন উপযুক্ত সময়ে কাজে লাগাবার জন্য। একসময় লেখেন, ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ নামের গল্পটি। ছেলেবেলার স্মৃতি রচনায় যেমন উল্লেখ করেছেন গল্পেও সেইভাবে এই ঐতিহাসিক প্রাসাদ ‘পাষাণ পুড়ি,’ ‘পিশাচ পুড়ি,’ ‘পাষাণ রাক্ষস’ হয়ে চিত্রিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ একদা ব্যস- এই রাজপ্রাসাদের যে কল্পনা ‘ছেলেবেলা’ এবং ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পে উল্লেখ করেছেন, তাতে আছে সম্রাট ও অমাত্যবর্গের নিষ্ঠুর ভোগ, নিপীড়ন। কান পাতলেই তিনি যেমন শুনতে পান অতৃপ্ত আত্মা অথবা পিশাচের আহাজারি, তেমনি শোনেন ‘দরবারের চারদিকে চলছে সর্বনেশে কানাকানি ফুসফাস।’ ভোগ সম্ভোগ আর ষড়যন্ত্রের বাইরে কিছু কল্পনা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। সম্রাটের তৈরি শাহিবাগ প্রাসাদ (এখন গুজরাটের রাজভবন) রবীন্দ্রনাথের কল্পনায় ক্ষুধিত পাষাণ একটি প্রতীকী পাষাণ মাত্র। মুসলমানের ইতিহাসে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন ‘উদ্দাম প্রবৃত্তির উত্তেজনা,’ ‘বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতারণা, রক্তপাত এবং অকথ্য অনৈসর্গিক নির্মমতার প্রাদুর্ভাব।’ ক্ষুধিত পাষাণে ‘এক সময় ওই প্রাসাদে অনেক অতৃপ্ত বাসনা, অনেক উন্মত্ত সম্ভোগের শিখা আলোড়িত হইত - সেই-সকল চিত্তদাহ, সেই-সকল নিষ্ফল কামনার অভিশাপে এই প্রাসাদের প্রত্যেক প্রস-রখণ্ড ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত হইয়া আছে, সজীব মানুষ পাইলে তাকে লালায়িত পিশাচীর মতো খাইয়া ফেলিতে চায়।’
সতেরো বছরের রবীন্দ্রনাথ শাহিবাগ প্রাসাদে মেজদাদার কাছে আসবার আগে বড়দাদা, সেজদাদা, পিতা মহর্ষি এবং ঠাকুর পরিবারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় পরিচালিত হিন্দুমেলায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। হিন্দুমেলার আদর্শ লক্ষ্য ধারণ করে তিনি কবিতা গান লিখেছেন। জ্যোতিদাদার নাটকে গান লিখে দিয়েছেন। হিন্দুমেলা প্রকাশ্যই ছিল হিন্দুত্ব এবং হিন্দুজাতীয়তাবাদী জাগরণের মেলা। হিন্দুমেলায় স্বদেশ মুক্তি ও স্বদেশের স-ব থাকলেও সে স্বদেশ শুধু হিন্দুদের। ‘হিন্দুমেলার ইতিবৃত্ত’ গ্রনে'র লেখক যোগেশচন্দ্র বাগল জানিয়েছেন, মেলার সম্পাদক গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর মেলার দ্বিতীয় অধিবেশনে বলেন, ‘এই মেলার প্রথম উদ্দেশ্য, বৎসরের শেষে হিন্দু জাতিকে একত্রিত করা। যত লোকের জনতা হয় ততই ইহা হিন্দু মেলা ও ইহা হিন্দুদিগের জনতা এই মনে হইয়া হৃদয় আনন্দিত ও স্বদেশানুরাগ বর্ধিত হইয়া থাকে।’৮ হিন্দুমেলার অন্যতম সংগঠক মনোমেহন বসু বলেন, ‘ধর্ম সংক্রান- মতভেদ তিরোহিত হইয়া সকলেই সৌভ্রাত্র ও সৌহৃদ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ হইবেন - যেখানে বৈষ্ণব, শাক্ত, শৈব, গাণপত্য, বৌদ্ধ, জৈন, নাসি-ক, আসি-ক সকলেই আপনাপন মেলা ভাবিয়া নিঃসন্দিগ্ধচিত্তে উৎসবের সমভাগী হইতে পারেন।’৯ সকলেই সমভাগী হতে পারলেও মুসলমান খ্রিস্টান নয়। কেননা এ মেলার উদ্ধেশ্য মনোমেহন বসুর মতে ‘অসম্বন্ধ হিন্দু-সমাজের মধ্যে ঐক্য স'াপন’৯ ‘সম্বৎসরের মধ্যে হিন্দুসমাজের যে কিছু উন্নতি বা দুর্গতি হইয়াছে’ তার সমীক্ষা এবং ‘যে সমস- দেশস' মহাশয়েরা স্বজাতীয় ও স্বাবলম্বিত শিক্ষাদানে ব্রতী হইয়াছেন বা হইবেন, তাঁহাদিগকে সমুচিত উৎসাহ প্রদান।’৯
হিন্দুমেলার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজনারায়াণ বসু ১৮৬৯ সালে মেদিনীপুরে ‘জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা’ করেন। এই সভার অন্যতম সদস্য মনোমোহন বসু। নামে জাতীয় হলেও এই সভা একান-ভাবে ছিল হিন্দুদের। এই প্রসঙ্গে নবগোপাল মিত্র সম্পাদিত ঘধঃরড়হধষ চধঢ়বৎ-এ ঝ. ই. ছদ্ম নামে একজন লেখেন, ‘খ্রিস্টান ও মুসলমানদের অন-র্ভুক্ত না করলে কেবলমাত্র হিন্দুদের নিয়ে গঠিত সভাকে জাতীয় সভা বলা যায় না।’ মনোমোহন বসু এই যুক্তি উড়িয়ে দেন, ‘খ্রিস্টান ও মুসলমানের অন-র্ভুক্তির প্রশ্ন একেবারে অবান-র এবং তাদের বাদ দিলেও জাতীয় সভার মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয় না।’৯
মুসলমান ও খ্রিস্টানদের উপেক্ষা করে ‘হিন্দুমেলা এবং জাতীয় সভা যে ধরণের স্বাদেশিকতা ও স্ব্বজাত্যভিমানের লালন করেছিল, তা পরিণতিতে একটি অসামপ্রদায়িক জাতীয়তাবোধ উদ্বোধনে সহায়তা করেনি। বরং পরবর্তীকালের হিন্দু-মুসলিম বিভেদের বীজ অনেকাংশে এই মেলা ও জাতীয় সভায়ই বপিত হয়েছিল, এমন কথা বলা যায়। এ মন-ব্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই যে ১৮৬০ দশকের শেষে এবং ১৮৭০ দশকে বহু খ্যাত-অখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক হিন্দুমেলার কিংবা জাতীয় সভার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে বিপুল সাহিত্য রচনা করেন, তা হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কে কেবল অবনত নয়, রীতিমতো স'ায়ীভাবে বিনষ্ট করেছিল। ... (ঠাকুর) পরিবারেও হিন্দুমেলার বিষফল ধরেছিল।’১০ বিশিষ্ট গবেষক অধ্যাপক গোলাম মুরশিদের এই মন-ব্যের পক্ষে বড়ো উদাহরণ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন, ‘হিন্দুমেলার পর হইতে কেবলই আমার মনে হইত কি উপায়ে দেশের প্রতি লোকের অনুরাগ ও স্বদেশপ্রীতি উদ্‌বোধিত হইতে পারে। শেষে সি'র করিলাম নাটকে ঐতিহাসিক বীরগাথা ও ভারতের গৌরব কাহিনী কীর্তন করিলে, হয়ত কতকটা উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইলেও হইতে পারে। এইভাবে অনুপ্রাণিত হইয়া কটকে থাকিতে থাকিতেই আমি ‘পুরু-বিক্রম’ নাটকখানি রচনা করিয়া ফেলিলাম।’১১ রচনাকাল ফেব্রুয়ারি ১৮৭৪। কলকাতায় ফিরে স্বদেশী সাহিত্য সম্মিলনী ‘বিদ্বজ্জন সমাগম’এ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ‘পুরু-বিক্রম’ নাটকের তৃতীয় অঙ্কের প্রথম গর্ভাঙ্ক পড়ে শোনান। ‘ভারত সংস্কারক’এর এক প্রতিবেদনে (২৪ এপ্রিল ১৮৭৪) এই গর্ভাঙ্ক সম্পর্কে মন-ব্য করে, ‘... জ্যোতিরিন্দ্রবাবু এক অঙ্ক নাটক পাঠ করিলেন, তাহাতে পুরু রাজা যবন শত্রু নিপাত করিবার জন্য সৈন্যদলকে উত্তেজিত করিতেছেন এবং সৈন্যদল তাঁহার বাক্যের প্রতিধ্বনি করিয়া বীরমদে মাতিতেছে।’১১
হিন্দুমেলার প্রেরণায় স্বদেশবোধে অনুপ্রাণিত নাটক ‘পুরু-বিক্রম’-এ হিন্দু বীরের বিক্রম হলো যবন নিধনে। অতি বীরত্বে বঙ্কিম বাবুও ভ্রূ বঙ্কিম করে বঙ্গদর্শনে (ভাদ্র ১২৮১) লেখেন, ‘গ্রন'খানি বীররসপ্রধান এবং বীরোচিত বাক্যবিন্যাস বিস-র আছে বটে, কিন' সকল স'ানেই যেন বীররসের খতিয়ান বলিয়া বোধ হয়।’১২ এবার কিছু বীররসের নমুনা পাঠ করা যাক। তৃতীয় অঙ্ক, প্রথম গর্ভাঙ্কে পুরু সৈন্যদের উদ্দেশ্যে বলছে,
‘ওঠ ! জাগ ! বীরগণ ! দুর্দান- যবনগণ / গৃহে দেখ করেছে প্রবেশ। / হও সবে একপ্রাণ, মাতৃভূমি কর ত্রাণ, শত্রুদলে করহ নিঃশেষ ॥ / ... যবনের রক্তে ধরা হোক প্লাবমান / যবনের রক্তে নদী হোক বহমান / যবন-শোণিতবৃষ্টি করুক বিমান / ভারতের ক্ষেত্র তাহে হোক ফলবান।’১৩
সৈন্যগণ উৎসাহের সহিত প্রতিধ্বনি করে, ‘যবনের রক্তে ধরা হোক প্লাবমান ...।’১৩
সৈন্যগণ পুরুর প্রতিধ্বনি করে যায়,
‘ক্ষত্রিয়-বিক্রমে আজ কাঁপুক মেদিনী / জ্বলুক ক্ষত্রিয় তেজদীপ্ত দিনমণি / ক্ষত্রিয়ের অসি হোক জ্বলন- অশনি।১৩
সৈন্যগণ আবারও পুরুর প্রতিধ্বনি করে,
‘মরণশরণ কিম্বা যবননিধন
যবননিধন কিম্বা মরণশরণ
শরীরপতন কিম্বা বিজয়সাধন।’১৪

হিন্দুমেলার প্রেরণায় যবন বা মুসলমান বিদ্বেষী ‘পুরু বিক্রম’ নাটকের পর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ লেখেন ‘সরোজিনী’ বা ‘চিতোর আক্রমণ’ নাটক। মুসলিম বিদ্বেষের সঙ্গে হিন্দু সংস্কার ও ঐতিহ্যের জয়ঢাক পিটানো ‘সরোজিনী’ নাটকে শেষ পর্যন- রবীন্দ্রনাথও জড়িয়ে পড়েছিলেন। সরোজিনী ওরফে পদ্মিনী সূর্যবংশীয় রাজা লক্ষণ সিংহের দুহিতা বিজয়ী মুসলমান বীরকে প্রত্যাখ্যান করে বলে, ‘অস্পৃশ্য যবন ! আমাকে স্পর্শ করিসনে।’১৫ কিন' যবনবীর আল্লাউদ্দিন পদ্মিনীকে জয় করতেই এতদূর জয় করে এসেছে। সরোজিনী বলে, ‘জানিস নরাধম, অসহায়া রাজপুত মহিলার ধর্মই একমাত্র সহায়।’১৬ এবং রাজপুতানী অস্পৃশ্যের স্পর্শ বাঁচাতে ধর্ম রক্ষা করতে অবশেষে জ্বলন- চিতায় ঝাঁপ দেয়, নেপথ্যে গান মঞ্জরিত হয় জ্বল্‌, জ্বল্‌ চিতা ! দ্বিগুণ, দ্বিগুণ-জ্বলন- চিতায় জীবন অবসানের মহিমা কীর্তন ! রাজপুত মহিলারা পরে সমস্বরে গেয়ে ওঠে, জ্বল্‌, জ্বল্‌ চিতা ! দ্বিগুণ, দ্বিগুণ
‘পরাণ সঁপিবে বিধবা-বালা।
জ্বলুক জ্বলুক চিতার আগুন,
জুড়াবে এখনি প্রাণের জ্বালা ॥
শোন্‌ রে যবন ! শোন্‌ রে তোরা
যে জ্বালা হৃদয়ে জ্বালালি সবে,
সাক্ষী রলেন দেবতা তার
এর প্রতিফল ভুগিতে হবে।’১৬

সরোজিনী নাটকে এই গানটি লিখে দেন ১৪ বছরের বালক রবীন্দ্রনাথ। রাজপুতানী আগুনে ঝাঁপিয়ে পড়ার সময় নাট্যকার জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর গদ্যে একটা ভাষণের মতো লিখেছিলেন। কিন' রবীন্দ্রনাথ নাটকের প্রুফ পড়ে বললেন, ‘এখানে পদ্য রচনা ছাড়া কিছুতেই জোর বাঁধিতে পারে না।’১৭ রবীন্দ্রনাথ বক্তৃতার বদলে অল্প সময়ের মধ্যে ‘জ্বল্‌, জ্বল্‌ চিতা ! দ্বিগুণ, দ্বিগুণ’ গানটি লিখে দেন। সরোজিনী নাটকের কাহিনী মানানসই চিতার কীর্তন এবং মুসলমানের নিন্দাসূচক গানটি লিখে ‘প্রধান সহায় জ্যোতিদা’র অনেক নিকটে চলে আসেন রবীন্দ্রনাথ। জীবনস্মৃতিতে লিখেছেন, ‘সাহিত্যের শিক্ষায়, ভাবের চর্চায়, বাল্যকাল হইতে জ্যোতিদাদা আমার প্রধান সহায় ছিলেন। যিনি নিজে উৎসাহী এবং অন্যকে উৎসাহ দিতে তাঁহার আনন্দ। আমি অবাধে তাঁহার সঙ্গে ভাবের ও জ্ঞানের আলোচনায় প্রবৃত্ত হইতাম।’১৮ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজের জীবনস্মৃতিতে বলেছেন, ‘সরোজিনী প্রকাশের পর হইতেই আমরা রবিকে প্রমোশন দিয়া আমাদের সম-শ্রেণীতে উঠাইয়া লইলাম।’(১৬)
একদিকে হিন্দুমেলা অন্যদিকে বিখ্যাত জ্যোতিদাদার হিন্দু বীর বিক্রমের স-ব, যবন নিধনের পালা বালক রবীন্দ্রনাথের মনে প্রভাব ফেলতে পারে। জীবনস্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ হিন্দুমেলায় সক্রিয় অংশগ্রহণের কথা লিখেছেন। যোগেশচন্দ্র বাগল জানিয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ ‘হিন্দুমেলার উপহার’ নামক কবিতা এই মেলায় পড়েছেন। হিন্দুমেলার প্রত্যক্ষ প্রভাবে যবনবিদ্বেষী ‘পৃথ্বীরাজ পরাজয়’ গ্রন'টি লেখেন। এই গ্রন'টি পরে হারিয়ে গেলে একই বিষয় নিয়ে লেখেন ‘রুদ্রচণ্ড’। ‘রুদ্রচণ্ড’ প্রথম প্রকাশ হয় জুন ১৮৮১-এ। এই গ্রন'টি উৎসর্গ করেন ‘ভাই জ্যোতিদাদা’কে, যথার্থ উৎসর্গই। পৃথ্বীরাজ কর্তৃক অরণ্যে বিতাড়িত জাতহীন রুদ্রচণ্ড দূতের মুখে মহম্মদ ঘোরীর আক্রমণের সংবাদ শুনে বলে,
‘কি বলিলি দূত ! তোর ম্লেচ্ছ মহম্মদ ঘোরী
পৃথ্বীরাজে আক্রমিতে আসিতেছে হেথা !’১৯
অন্যত্র, দ্বিতীয় সেনাপতি যুদ্ধের সংবাদ দেয় এভাবে,
‘শুনিনু যবনগণ যুঝে প্রাণপণে
অতিশয় ক্লান- নাকি হিন্দু সৈন্য যত।’২০
বিজয়ী মহম্মদ ঘোরীকে নিয়ে নয়, পরাজিত পৃথ্বীরাজ, রুদ্র ও চাঁদ কবিকে নিয়ে কাব্য নাটক রুদ্রচণ্ড। ‘জ্যোতিদাদা’ যেমন লিখেছিলেন পরাজিত পুরুবিক্রমকে নিয়ে।
‘রূদ্রচণ্ড’ প্রকাশের দুইবছর আগে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৭৯তে প্রকাশিত ‘অশ্রুমতী’ নাটক উৎসর্গ করেন অনুজ রবীন্দ্রনাথকে। রবীন্দ্রনাথ তখন প্রথমবারের মতো বিলাতপ্রবাসী। ‘অশ্রুমতী’ নাটকের বিষয় প্রেম হলেও চরিত্র এসেছে ‘রুদ্রচণ্ড’ গীতিনাটকের পটভূমির ইতিহাস থেকেজ্জপৃথ্বীরাজ, প্রতাপসিংহ, আকবর, মানসিংহ, সেলিম, অশ্রুমতী প্রমুখ। এবং যবনবিদ্বেষ যথারীতি বর্তমান। রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করা এই নাটকের সৈন্যগণ বলছে ‘আজ আমরা যুদ্ধে প্রাণ দেবজ্জচিতোরের গৌরব রক্ষা করবজ্জমুসলমান রক্তে আমাদের অসির জ্বলন- পিপাসা শান- করব...।’২১
রবীন্দ্রনাথের শৈশবে পরিবার ও সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব নিয়ে বলার আগে ‘পুরুবিক্রম’ এবং ‘সরোজিনী’ সম্পর্কে আরও কিছু বলা এই প্রবন্ধের জন্য দরকার, বিশেষ করে এই নাটকদ্বয়ের লেখক যখন বালক রবীন্দ্রনাথের ‘প্রধান সহায়’ ছিলেন। দুটি নাটকই ফরাসি নাট্যকার জাঁ রাসিন (ঔবধহ জধপরহব ১৬৩৯-১৬৯৯)-এর নাটকের রূপান-র। পুরুবিক্রম নাটকটি অষবীধহফবৎ খব এৎধহফ (১৬৬৫), সরোজিনী হলো ওঢ়যরমবহরব (১৬৭৪) থেকে বঙ্গীয়করণ। দুটি নাটকই প্রথম প্রকাশের সময় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কোথাও নাট্যকার হিসেবে নিজের নাম দেননি। জাঁ রাসিন-এর নামও নয়।২২ পরবর্তী সংস্করণে নাট্যকার হিসেবে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম থাকলেও কোথাও মূল নাট্যকার জাঁ রাসিন-এর নাম উল্লেখ করেন না। জ্যোতিরিন্দ্র নাটকটির গল্প নিজের চিন-াভাবনার অনুকূলে অনেক পরিবর্তন করে নিয়েছিলেন। যেমন, অষবীধহফবৎ খব এৎধহফ-এ অষবীধহফবৎ ছিলেন গ্রেট, অবশ্যই মুসলমান নন। জ্যোতিরিন্দ্র তাকে বানান সেকেন্দার শাহ তবে বিজয়ী হয়েও তিনি মহান বা গ্রেট নন। পরাজিত পুরুষ বিক্রমই বরং গ্রেট ! আবার ইউরিপেদিসের ওঢ়যরমবহরধ রহ অঁষরং-এর বিষয় নিয়ে লেখা ওঢ়যরমবহরব-র গ্রিক ও ট্রয়ের যুদ্ধকে জ্যোতিরিন্দ্র রাজপুত ও আলাউদ্দিন খিলজির যুদ্ধে রূপান-রিত করেছেন। মজার ব্যাপার হলো যবনবিদ্বেষে তিনি ঐতিহাসিক আলাউদ্দিন খিলজিকে সরোজিনী নাটকে আল্লাউদ্দিন নামে অবিহিত করে সংলাপে সংলাপে আল্লাউদ্দিন এর প্রথমাংশ শুধু ‘আল্লা’ করে ফেলেছেন। নাটক পড়তে হবে, সরোজিনী ‘আল্লা’কে বলছে, ‘নরাধম ! ঐখানে দাঁড়া, আর এক পা’ও অগ্রসর হোস নে।’২৩ এই নাটকে সরোজিনী, রণধীর, রোশেনারা বা অন্য নাটকের অম্বালিকা, আর্টিমিডোরাস, পপিলিয়াস প্রমুখ নামের তো সংক্ষেপ করার প্রয়োজন হয় না ! শুধু আলাউদ্দিন থেকে আল্লাউদ্দিন এবং সংক্ষেপে ‘আল্লা’ করার প্রয়োজন হয় !
স্বাদেশিকতার নামে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ সেই সময় ‘সঞ্জীবনী সভা’ নামে আর একটি সভা করেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘আমাদের বাড়ির সাহায্যে হিন্দুমেলা বলিয়া একটি মেলা সৃষ্টি হইয়াছিল। ... ভারতবর্ষকে স্বদেশ বলিয়া ভক্তির সহিত উপলব্ধির চেষ্টা সেই প্রথম হয়।’২৪ হিন্দুমেলার উদ্দেশ্য লক্ষ্য ও স্বদেশের স্বরূপ তো উল্লেখ হয়েছে আগেই। এখন দেখা যাক ‘সঞ্জীবনী সভা’র স্বদেশ কেমন ছিল ! ‘জ্যোতিদাদার উদ্‌যোগে আমাদের একটি সভা (সঞ্জীবনী) হইয়াছিল, বৃদ্ধ রাজনারায়ণ বাবু ছিলেন তাহার সভাপতি। ইহা স্বাদেশিকতার সভা। ... দ্বার আমাদের রুদ্ধ, ঘর আমাদের অন্ধকার, দীক্ষা আমাদের ঋকমন্ত্রে, কথা আমাদের চুপিচুপিজ্জইহাতেই সকলের রোমহর্ষণ হইত, আর বেশি কিছু প্রয়োজন ছিল না। আমার মতো অর্বাচীনও এই সভার সভ্য ছিল।’২৫ তবে এই সভার ‘সকলের রোমহর্ষণ হইতো’ শুধু ঋকমন্ত্রে নয়, বসন-কুমার চট্টপাধ্যায়-এর জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি গ্রনে' আছে, ঋগ্বেদের পুঁথি, মড়ার মাথার খুলি ইত্যাদি নিয়ে এখানে সভা হতো। এ সভার স্বদেশ ভাবনা চর্চা একান-ই ছিল হিন্দুদের। ‘আদি ব্রাহ্মসমাজের পুস-কাগার হইতে লাল রেশমে জড়ানো বেদমন্ত্রের একখানা পুঁথি এই সভায় আনিয়া রাখা হইয়াছিল। টেবিলের দুই পাশে দুইটি মড়ার মাথা থাকিত, তাহার দুইটি চক্ষুকোটরে দুইটি মোমবাতি বসানো ছিল, মড়ার মাথাটি মৃত ভারতের সাংকেতিক চিহ্ন। সভার আরম্ভে বেদমন্ত্র গীত হইত।’২৬
‘ভারতবর্ষের একটা সর্বজনীন পরিচ্ছদ কি হইতে পারে এই সভায় জ্যোতিদাদা তাহার নানাপ্রকারের নমুনা উপসি'ত করিতে আরম্ভ করিলেন। ধূতিটা কর্মক্ষেত্রের উপযোগী নহে অথচ পায়জামাটা বিজাতীয়’২৫ রবীন্দ্র-উত্তর পণ্ডিত শ্রী নীরদচন্দ্র চৌধুরী মুসলমানদের ‘পরিচ্ছদ’ বা পোশাক নিয়ে মন-ব্য প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যায়। ‘হিন্দুর মুসলমানী পরিচ্ছদ কেন’ প্রবন্ধে তিনি জানিয়েছেন মুসলমানদের শেরওয়ানি ও পায়জামা পঞ্চাশ বৎসর পূর্বেকার পশ্চিম প্রবাসী বাঙালিরা লৌকিক ভাষায় বলত ভেরুয়ার পোশাক। মুসলমানের সালওয়ার-কামিজ হিন্দু পুরুষ বা মেয়েদের শরীরে খুবই অশোভন। শ্রী নীরদচন্দ্র বলছেন, ‘আমার মেয়ে নাই, কিন' যদি থাকিত তাহা হইলে এই পোশাক পরিতে চাহিলে তাহাকে নিশ্চয়ই তৎক্ষণাৎ বাড়ি হইতে বাহির করিয়া দিতাম।’২৭ শুধু তাই নয়, তিনি বলেন, ‘যদি আর্যকন্যার আর্যোচিত দ্বিবস্ত্র হইয়া ব্যায়াম করা সম্ভব না-ই হয়, তাহা হইলে মুসলমানী পোশাক কেন ? অন্য নজীর কি ছিল না ?’২৮ মানে নগ্ন হয়ে ব্যায়াম করা। মুসলমানী পোশাকের তুলনায় নগ্ন হয়ে ব্যায়াম করা শোভন। কারণ পণ্ডিত শ্রী স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, ‘জিমনাস্টিক কথাটারও অর্থ জানেন না ? ... গ্রিক ভাষায় ‘জিমনস’ অর্থ ‘নগ্ন’ এবং নগ্ন হইয়া এই কাজ করা হয় সেজন্যই ব্যায়ামের নাম জিমনাস্টিক’।’২৮ শেরওয়ানি-পাজামার ওপর তিনি এতই বিরক্ত ছিলেন, ‘আমাকে যদি ভারতবর্ষের দূত হিসাবে নিযুক্ত করিবার প্রস-াব উঠিত, তাহা হইলে শুধু শেরওয়ানি পাজামা পরিতে হইবে এই কারণেই আমি এই পদ গ্রহণ করিতাম না।’২৭ খ্রিস্টিয় পোশাকে অবশ্য অরুচি নাই, গলায় বো-টাই বাঁধা খর্বকায় শ্যামলা ‘সাহেবের’ ছবি পত্রিকা পুস-কে অহরহ দেখা যায় বৈকি। পায়জামার জাতীয়তার বিচার আর ঋকমন্ত্রে দীক্ষা ও চর্চার সঞ্জীবনী সভার (১৮৭৬) ‘এই সময়টাতেই বড়দাদাকে সম্পাদক করিয়া জ্যোতিদাদা ‘ভারতী’ (১৮৭৭) পত্রিকা বাহির করিবার সংকল্প করিলেন।’২৫ রবীন্দ্রনাথের বয়স তখন ষোলো। ওই সময়ে, রবীন্দ্রনাথের কথায় ‘মোটের ওপর এই সময়টা আমার পক্ষে একটা উন্মত্ততার সময়’২৫জ্জতিনি মেঘনাদ বধের একটি তীব্র সমালোচনা লিখেছিলেন। ওই তীব্র সমালোচনার ঝোঁককে রবীন্দ্রনাথ কাঁচা বয়সের উত্তেজনার কথা বলেছেন, আবার এও সত্য, এত সব ধর্মীয় অনুভূতি উজ্জ্বল সামাজিক তৎপরতার মধ্যে রামের নিন্দা ও অবমাননা আর রাক্ষস রাবণকে নায়কের আসন দেবার মধু কবির অমিত্রাক্ষর প্রয়াস দেখে সপ্রতিভ মেধাবী কিশোর রবীব্দ্রনাথ তীব্র সমালোচনা লিখতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ‘ভারতী’তে তখন ধারাবাহিকভাবে ভানুসিংহের পদাবলীও বের হয়।
‘ভারতী যখন দ্বিতীয় বৎসরে পড়িল মেজদাদা প্রস-াব করিলেন, আমাকে তিনি বিলাতে লইয়া যাবেন। ... ভাগ্যবিধাতার এই আর একটি অযাচিত বদান্যতায় আমি বিস্মিত হইয়া উঠিলাম।’২৯ ভাগ্যবিধাতার এই দ্বিতীয় ‘অযাচিত বদান্যতায়’ বিলাত যাওয়ার পথে সতেরো বছরের রবীন্দ্রনাথের সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চাকরির জায়গা আমেদাবাদ ও শাহীবাগ প্রাসাদে আগমন। শাহীবাগ প্রাসাদে আগমনের পূর্বে রবীন্দ্রনাথ উল্লিখিত বহুরকম কর্মকাণ্ডের ও সাহিত্য রচনার ভিতর দিয়ে যে মানস অবস'ায় ছিলেন, তাতে হয়তো প্রাসাদকে ঘিরে যে স্বপ্ন কল্পনা ও গল্পের প্লট, অনুভূতি তৈরি হয় তাতে ক্ষুধিত পাষাণের নির্মম শোকগাথা তৈরিই হতে পারে। যদিও তিনি ক্ষুধিত পাষাণ লেখেন অনেক পরে, ১৩০২ সালে দালিয়া লিখবার চার বছর পর। ক্ষুধিত পাষাণের প্রধান চরিত্র কথক। এই গল্পের অন্য চরিত্রগুলো এমন, ‘পাগলা মেহের আলি,’ অফিসের ‘বৃদ্ধ করিম খাঁ,’ ‘মুসলমান চাকর’ নাম নাই, পাগলের নাম আছে, বৃদ্ধ দারোয়ানের নাম আছে, চাকরের নাম নাই, চাকর হলো ‘মুসলমান চাকর’।
বিশেষ করে কালান-র প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ‘ইংরেজ’ ‘য়ুরোপ’এর সমান-রাল বারবার ব্যবহার করেন মুসলমান শব্দটি, যেমন, ‘মুসলমান সাহিত্য,’ ‘ইংরেজ সাহিত্য’ মুসলমানের প্রভাব। ইংরেজের বা ‘য়ুরোপের প্রভাব,’ ‘ইংরেজের শাসন,’ ‘মুসলমানের শাসন,’ ‘মুসলমানের আগমন,‘ ‘ইংরেজের আগমন’ বা ইংরেজ কেবল মানুষরূপে নয় ‘নব্য য়ুরোপের চিত্র্রপ্রতীকরূপে’৩০ হিন্দুস'ানে আসে, মানুষ জোড়ে স'ান, চিত্ত জোড়ে মনকে। মুসলমানকে আমরা দেখি সংখ্যারূপে - তারা সমপ্রতি আমাদের রাষ্ট্রিক ব্যাপারে ঘটিয়েছে যোগ-বিয়োগের সমস্যা।’৩০ আরব-পারস্য প্রাচ্য থেকে আসা শাসকগোষ্ঠী হলো ‘বাহির থেকে মুসলমান হিন্দুস'ানে এসে স'ায়ী বাসা বাঁধছে কিন' আমাদের দৃষ্টিকে বাহিরের দিকে প্রসারিত করেনি। তারা ঘরে এসে ঘর দখল করে বসল, বন্ধ করে দিল বাহিরের দিকে দরজা।’৩১ রবীন্দ্রনাথ মনে করেন ‘মুসলমানজাতি’ ধর্মের নামেই পরিচিত ‘ধর্মের নামে যে-জাতির নামকরণ ধর্ম মতেই তাদের মুখ্য পরিচয়।’১ খৃস্টানধর্মাবলম্বীদের সম্বন্ধে একটি সুবিধার কথা এই যে, তারা আধনিক যুগের বাহন ; তাদের মন (মুসলমানের মতো) মধ্যযুগের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ নয়। ...য়ুরোপীয় আর খৃস্টান এই দুটো শব্দ একার্থক নয়।’১ ‘য়ুরোপীয় বৌদ্ধ’ বা ‘য়ুরোপীয় মুসলমান’ শব্দের মধ্যে স্বতোবিরুদ্ধতা নেই।’১ মুসলমান বলতে তো বাঙালি বুঝায় না, আবার ‘মুসলমান বাঙালি’ ‘আরব মুসলমান’ ‘ইন্দোনেশিয়ান মুসলিম’-এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথ কোথায় স্বতোবিরুদ্ধতা দেখতে পান ? আরব জাতি ধর্মে মুসলমান, জাতি ও ধর্ম একার্থক তো নয় ! ইন্দোনেশিয়ার মুসলমান বাংলাদেশের মুসলমান সৌদি আরবের একজন মুসলমান কি একই জাতি পরিচয় বহন করে ! জার্মান খৃস্টান আর ব্রাজিলের খৃস্টান তেমনি একটি জাতি পরিচয় বহন করে না। জাতি ও ধর্মের সুস্পষ্ট পার্থক্য সবখানেই বর্তমান। রবীন্দ্রনাথও জাতি পরিচয় খুব ভালো বোঝেন। শুধু ‘মুসলমান’ বিষয়টি যুক্তি ও জ্ঞানের পরম্পরায় গোল পাকিয়ে যায়।
‘মুসলমান’ শব্দটির প্রতি রবীন্দ্রনাথের বিশেষ দুর্বলতাও থাকতে পারে। ‘ক্ষুধিত পাষাণ’ গল্পের শুরুতে গল্পের কথকের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের যখন প্রথম দেখা হয় তখন তিনি ভেবেছিলেন, ‘তাঁহার বেশভূষা দেখিয়া প্রথমটা তাঁহাকে পশ্চিমদেশীয় মুসলমান বলিয়া ভ্রম হইয়াছিল।’ পশ্চিমদেশীয় বলতে কি পশ্চিমের কোনো ভারতীয় রাজ্য না আরব-পারস্যর কোনো দেশ ! সেই রাজ্য বা দেশের পরিচয় মনে না হয়ে মুসলমান মনে হয়েছে প্রথমেই। এই মুসলমান মনে হওয়ার কথাটা গল্পেরই একটি ইঙ্গিত। অচিরেই এক মুসলমান শাসকের রাজ প্রাসাদের ভুতুড়ে গল্প উপসি'ত করবেন। ক্ষুধিত পাষাণ গল্পে তিনি স্মৃতির শাহিবাগ প্রাসাদকে প্রতিস'াপিত করেন ‘দ্বিতীয় শা-মামুদ ভোগবিলাসের জন্য প্রাসাদটি এই নির্জন স'ানে নির্মাণ করিয়াছিলেন’ বলে। আর সবরমতী নদীটি হয় সংস্কৃত শুস-া নদী।
আমেদাবাদ প্রাসাদে থাকার সময় রবীন্দ্রনাথের আরও দুটি ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা হয়। যার একটি মজার, অন্যটির ফল যতদিন বাঙালি বেঁচে থাকবে ততদিন সেটিও বেঁচে থাকবে। এই অভিমত রবীন্দ্রনাথেরও। প্রাসাদের চূড়ার উপরকার একটা ঘরে রবীন্দ্রনাথ থাকতেন, সেখানে তাঁর সঙ্গী ছিল বোলতার চাক, ‘রাত্রে আমি সেই নির্জন ঘরে শুইতামজ্জএক একদিন অন্ধকারে দুই-একটা বোলতা চাক হইতে আমার বিছানার উপর আসিয়া পড়িতজ্জযখন পাশ ফিরিতাম তখন তাহারাও প্রীত হইত না এবং আমার পক্ষেও তাহা তীব্রভাবে অপ্রীতিকর হইত।’২৯ অন্ধকার বিছানার এই অভিজ্ঞতা এর আগে পরে কখনো কবির জীবনে ঘটেনি। এই প্রাসাদ-বাস তাঁকে আর একটি অপার অসীম গভীর অনুভূতির ভিতর নিয়ে আসে। শুক্লপক্ষের গভীর রাতে সবরমতী নদীর দিকে প্রাসাদের ছাদে হাঁটতে হাঁটতে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের সুর দেওয়া সর্বপ্রথম গানগুলি রচনা করেছিলেন। তাঁর নিজের দেওয়া সুরে সর্বপ্রথম গান ‘নীরব রজনী দেখো মগ্ন জোছনায়’।২৯ ‘ভগ্নহৃদয়’ গ্রনে' গানটি সঙ্কলিত হয়েছিল। ভগ্নহৃদয় একটি বিচিত্র নাট্য-কাব্য, প্রকাশিত হয় ১৮৮১ সালে। শাহীবাগ প্রাসাদে জোছনাময় রাত্রী যাপনের সময় মাত্র সতরো বছর বয়সে লেখা এই প্রথম গানটির কিছু চরণ শোনা যেতে পারে,
‘নীরব রজনী দেখ মগ্ন জোছনায়।
ধীরে ধীরে অতি ধীরে - অতি ধীরে গাও গো !
ঘুমঘোরময় গান বিভাবরী গায়,
রজনীর কণ্ঠ-সাথে সুকণ্ঠ মিলাও গো।
নিশীথের সুনীরব শিশিরের সম,
নিশীথের সুনীরব সমীরের সম,
নিশীথের সুনীরব জোছনা সমান
অতি - অতি - অতি ধীরে কর সখি গান।’(৩১)

স্বতঃস্ফূর্ত রোমাণ্টিক আবেগের শিল্পী রবীন্দ্রনাথ শাহীবাগ প্রাসাদে রাত্রীযাপনকালে সুনীরব জোছনায় বাঙ্ময়, সমাজ রাজনীতির সচেতন ভাবনায় কণ্টকিত নন। তবুও কবি অতৃপ্ত আত্মার বিলাপ, আহাজারী, ইরাণী ক্রীতদাসীর প্রেত আচরণের কল্পনা ক্ষুধিত পাষাণ গল্পের অনুপ্রেরণা হলো ! যা তিনি বুদ্ধি ও হৃদয় দিয়ে অনুভূত হয়েছেন তা নয়, শুধুই অভিজ্ঞতার অতীত কল্পনা দিয়ে গল্প সাজালেন !
গল্পগুচ্ছের পঁচানব্বইটি গল্প এবং ‘গপ্পস্বল্প’, ‘লিপিকা’র ছোট ছোট উপদেশমূলক আখ্যান মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিশাল গল্পের ভাণ্ডারে বাঙালি মুসলমানের জীবন চরিত্র নিয়ে গল্প আর কোথায় ! রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলা সাহিত্যের একমাত্র হয়ে উঠলেনজ্জতখন বাংলাভাষাভাষি জনগোষ্ঠির মধ্যে বাঙালি মুসলমানের সংখ্যাই বেশি। অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ একাশি বছর আয়ু প্রাপ্ত রবীন্দ্রনাথ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বাঙালি মুসলমানদের সঙ্গে গভীরভাবে মিশেছিলেন। কাজী নজরুল ইসলাম, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রধান কাজী আব্দুল ওদুদ প্রমুখের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ছিল গভীর স্নেহ ও শ্রদ্ধার সম্পর্ক। বাঙালি মুসলমান হিসেবেই নয় বেগম রোকেয়া একজন মুক্ত ও প্রগতিশীল চিন-ার লেখক হিসেবে শিক্ষিত সমাজকে সেকালে চমকে দিয়েছিলেন। বেগম রোকেয়ার ‘মতিচূর’ (প্রথম খণ্ড) কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের নোবেল প্রাপ্তির অনেক আগে ১৩১৪ সালে। রবীন্দ্রনাথের সুপরিচিত দক্ষিণারঞ্জন মিত্র-মজুমদার তখন পর্যন- কোনো একক বই নিয়ে দীর্ঘ আলোচনাটি লিখেছিলেন ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় তিন সংখ্যা ধরে। বিষয় ও আঙ্গিকের দিক থেকে অভিনব রোকেয়ার ঝঁষঃধহধ'ং উৎবধস (১৯২২), পদ্মরাগ (১৩৩১), অবরোধ-বাসিনী (১৯৩১), আরও গল্প ও প্রবন্ধের বই কলকাতা থেকেই প্রকাশিত হয়। সর্বাধিক শব্দ লেখায় চ্যাম্পিয়ন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের সহস্র রচনারাশির ভিড়ে, এমনকি চিঠিপত্রেও মুসলমান সমাজেরই শুধু নয় নারীজাতির বিস্ময় মনীষী বেগম রোকেয়ার নামটিও খুঁজে পাওয়া যায় না !
‘ভারতী’ পত্রিকায় বাইশ বছরের রবীন্দ্রনাথ ‘বাউল গান’ নামে নিবন্ধ লেখেন, ‘বাউলের গাথা’ নামে একটি গ্রনে'র আলোচনাও লিখেছিলেন। বাউল ফকিরদের সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ অনেক কালের। ‘প্রবাসী’র ‘হারামণি’ বিভাগে ১৩২২ সালে তিনি লালনের একটি খাতার ২৯৮টি গানের মধ্যে বেছে ২০টি গান প্রকাশ করেন। লালনের বিখ্যাত গানের দ’ুটি পঙ্‌ক্তি তিনি ১৩১৪ সালে লিখিত ‘গোরা’ উপন্যাসে ব্যবহার করেন। পঙক্তি দু’টি হলো ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখী কেমনে আসে যায়!/ ধরতে পারলে মন-বেড়ী দিতাম তাহার পায়।’ ‘অক্সফোর্ডে দেওয়া বক্তৃতায় কবিগুরু আবার সেই খাঁচার ভিতর... ইংরেজী তর্জমা যোজন করেছেন।’৩২ দেশী বিদেশী গবেষকগণ দেখিয়েছেন রবীন্দ্রসাহিত্যে বাউলভাবের প্রভাব। লালনের গানগুলি ‘বেছে নিয়ে প্রবাসীতে প্রকাশ করতে দেবার সময় কবিগুরু ‘ফাল্গুনি’র অন্ধ বাউলের গান রচনার প্রেরণা পান। হয়তো সেই অন্ধ বাউলও লালন ফকিরের কাল্পনিক প্রতিরূপ। লালনেরও একটি চক্ষু ছিল দৃষ্টিহীন।’৩৩ তবুও তাঁর সারা জীবনের প্রকাশিত রচনাবলীতে লালন ফকিরের নাম একবারও উল্লেখ করা হয়নি।’৩৪ অবশ্য তাঁর বিশাল রচনারাশির খনিতে পাওয়া যাবে অতুলপ্রসাদ সেন, গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র বসু, রাজেন্দ্রনাথ মিত্র, রামমোহন রায়, বঙ্কিম, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, যোগীনদা, মায় ‘কোরীয় যুবকের রাষ্ট্রিক মত’ সম্পর্কেও পদ্য-গদ্যে অভিমত। আরও খবর হলো তিনি ‘নৈবেদ্য’ পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করলেও জননী সারদা দেবীর ‘করকমলে’ শত শত গ্রনে'র একটিও উৎসর্গ করেননি। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথই এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ! এই প্রসঙ্গটি দূরাগতভাবে প্রাসঙ্গিক হলেও শুধু তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা হলো।
জমিদারি দেখার জন্য এবং জমিদার হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় পূর্ববঙ্গের প্রজা কৃষকের অধিকাংশ ছিল মুসলমান। আর তিনি পদ্মার বুকে ঘুরতে ঘুরতে লিখেছেন শ্রেষ্ঠ রচনাগুলোর বড় একটা অংশ। তাঁর নৌকার মাঝিও ছিল মুসলমান। জমিদারি চালাবার প্রথম থেকেই তিনি নিজে যেমন তেমনি মুসলমান প্রজারাও একে অপরের প্রতি বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। ‘সাহাদের হাত থেকে শেখদের বাঁচাবার’ কথা বলেছেন। জাত-বর্ণ-ধর্মভেদে আসনের ব্যবস'া তুলে হিন্দু মুসলমান প্রজাদের একসঙ্গে বসিয়েছেন। আর ওই যে ছিন্নপত্রের সেই গফুর ! রবীন্দ্রনাথ সস্ত্রীক সবান্ধব অন্ধকার নদীর বুকে হারিয়ে গেছেন। ছিন্নপত্রের এক পত্রে রোমাণ্টিক রবীন্দ্রনাথের কলমে হারিয়ে যাওয়ার অনুভূতি, ‘নিঃশব্দ রাত্রি, ক্ষীণচন্দ্রালোক, নির্জন নিস-ব্ধ শূন্য চর, দূরে গফুরের চলনশীল একটি লণ্ঠনের আলোজ্জমাঝে মাঝে এক একদিক থেকে কাতর কণ্ঠের আহ্বান এবং চতুর্দিকে তার উদাস প্রতিধ্বনিজ্জমাঝে মাঝে আমার উন্মেষ এবং পরমুহূর্তেই সুগভীর নৈরাশ্য ...।’ গফুরের হাতে চলনশীল একটা লণ্ঠনই শুধু নয়, স্ত্রী মৃণালিনীকে অন্য চিঠিতে লিখছেন, ‘ভিজে বাদলার বাতাস দিয়েছে, সূর্য প্রায় অস-মিত। ... গফুর মিঞা নৌকোর পিছন দিকে একটি ছোট্ট উনুন জ্বালিয়ে কী একটা রন্ধনকার্যে নিযুক্ত আছে। মাঝে মাঝে ঘিয়ে ভাজার চিড়বিড় শব্দ হচ্ছে এবং নাসারন্ধ্রে একটা সুস্বাদু গন্ধও আসছে...।’ তবুও সাধারণ গফুর মিঞা থেকে অসাধারণ বাঙালি মুসলমান কেউই বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ লেখকটির সহস্র রচনার ভিতর কোথাও জায়গা পেল না !
ভারতীয় পুরাণ বা হিন্দু পুরাণের বহু ঘটনা, চরিত্র, বৌদ্ধ, রাজপুত, মারাঠা, শিখ সমপ্রদায়ের কত উপকথা, চরিত্র তাঁর সাহিত্যে এসেছে অনর্গল। দেব-দেবী উপনিষদ ব্রহ্মও নিয়ে চিন-ামূলক গদ্য লিখেছেন। শুধু একটি সমপ্রদায় যারা আবার সংখ্যাগুরু, সেই বাঙালি মুসলমানের জীবন-ধর্ম-কিংবদন-ী সম্মানের সঙ্গে রবীন্দ্র সৃষ্টিশীলতায় ঠাঁই পেল না ! ‘খৃষ্ট’ নামে তাঁর একটা বই আছে। বড়দিনের ওপর খৃষ্টকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথকৃত অনুবাদ কবিতা বা গান আছে, ‘গির্জাঘরের ভিতরটি স্নিগ্ধ, / সেখানে বিরাজ করে স-ব্ধতা / রঙিন কাচের ভিতর দিয়ে সেখানে প্রবাহিত রমণীয় আলো / এইখানে আমাদের প্রভুকে দেখি তাঁর ন্যায়াসনে।’ (চার্লস এ্যাণ্ড্রুজের রচিত কবিতার অনুবাদ ; আংশিক, ২২ এপ্রিল ১৯৪০)।৩৫ লিখেছেন ‘খৃষ্ট’ ‘মানবসম্বন্ধের দেবতা’ ‘খৃষ্টোৎসব’ ‘যিশুচরিত’ ‘খৃষ্টধর্ম’ শিরোনামে প্রবন্ধ। বাঙালি মুসলমানের বিশ্বাস, শাস্ত্র ও পয়গম্বর থেকে সাধারণ বাঙালি মুসলমান, প্রজা, কৃষক, সমাজসেবক যারা তাঁর সান্নিধ্যে এসেছিল তারাও এই বিস্ময়কর সৃষ্টিশীল মানুষটির কলমের নিবের আগায় মূর্ত হয়ে উঠতে পারেনি।
শুধু যিশু খৃষ্ট নয়, ‘কালান-র’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজ শাসকদের, তাদের অনুসৃত নীতি, রচিত সাহিত্যের উদার প্রশসি- গেয়েছেন, আর মুসলিম শাসক ও তাদের সাহিত্যের নিন্দা করেছেন খোলা হাতে। ভারতে বাইরে থেকে প্রথম ‘বিরুদ্ধ আঘাত’ লাগে মুসলমানদের আগমনের মাধ্যমে। মুসলমানেরা ‘বাহুবলে সে রাজ্যসংঘটন করেছে কিন' তার চিত্তের সৃষ্টিবৈচিত্র্য ছিল না। এইজন্যে সে যখন আমাদের দিগনে-র মধ্যে স'ায়ী বাসস'ান বাঁধলে, তখন তার সঙ্গে আমাদের সংঘর্ষ ঘটতে লাগল।’৩০ ‘মুসলমানদের প্রভাব চিত্তের মধ্যে সর্বতোভাবে প্রবল হয়নি। তারই প্রমাণ দেখি সাহিত্যে।’৩০ মুসলমানদের সৃষ্টি বৈচিত্র্য রবীন্দ্রনাথের দেখতে না পাওয়ার কারণ ঐতিহাসিক। ভারতীয় উচ্চাঙ্গ বা মার্গ সঙ্গীত, বাদ্যযন্ত্র, স'াপত্যে মুসলমানদের অবদান রবীন্দ্রনাথ ভালো জানেন। দিল্লী কলকাতা সহ বড় শহরগুলোর দিকে তাকালেই ভারতভূমিতে মুসলমানদের স্বাতন্ত্র্য স'াপত্যের বৈচিত্র চোখ এড়ায় না, বৈচিত্রপূর্ণ পোশাক আর খাদ্যের বিচিত্রতার সুবিধা তো ঠাকুর পরিবারই অধিক ভোগ করেছেন। আরবী, ফার্সি, উর্দু শব্দের মিশ্রণ বাংলাভাষায় নতুন শক্তি ও বৈচিত্র্য এনেছিল। ‘বাহির থেকে মুসলমান হিন্দুস'ানে এসে স'ায়ী বাসা বেঁধেছে, কিন' আমাদের দৃষ্টিকে বাহিরের দিকে প্রসারিত করেনি। তারা ঘরে এসে ঘর দখল করে বসল, বন্ধ করে দিল বাহিরের দিকের দরজা।’৩০ অন্যদিকে ‘ইংরেজের আগমন ভারতবর্ষের ইতিহাসে এক বিচিত্র ব্যাপার ... য়ুরোপের চিত্তদূত রূপে ইংরেজ এত ব্যাপক ও গভীর ভাবে আমাদের কাছে এসেছে যে আর কোনো বিদেশী জাত কোনোদিন এমন করে আসতে পারেনি। য়ুরোপীয় চিত্তের জঙ্গমশক্তি আমাদের স'াবর মনের ওপর আঘাত করল, যেমন দূর আকাশ থেকে আঘাত করে বৃষ্টিধারা মাটির পরে ; ভূমিতলের নিশ্চেষ্ট অন-রের মধ্যে প্রবেশ করে প্রাণের চেষ্টা সঞ্চার করে দেয়, সেই চেষ্টা বিচিত্ররূপে অঙ্কুরিত বিকশিত হতে থাকে।’৩০
‘মুসলমান আমলের বাংলা সাহিত্যের প্রতি দৃষ্টি করলে দেখা যায় যে অবাধে অন্যায় করবার অধিকারই যে ঐশ্বর্যের লক্ষণ এই বিশ্বাসটা কলুষিত করেছে তখনকার দেবচরিত্র-কল্পনাকে।’৩০ আর ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের পরে রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর শ্রেণী কি অর্জন করেছিল তার উচ্ছ্বাসপূর্ণ বিবৃতি দেন তিনি, ‘ইংরেজি সাহিত্যে ... আমরা পেয়েছিলাম মানুষের প্রতি মানুষের অন্যায় দূর করবার আগ্রহ, শুনতে পেয়েছিলাম রাষ্ট্রনীতিতে মানুষের শৃঙ্খল মোচনের ঘোষণা, দেখেছিলাম বাণিজ্যে মানুষকে পণ্যে পরিণত করার বিরুদ্ধে প্রয়াস।’৩০ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানী, নীল চাষ, কৃষকের ওপর অত্যাচার, নারী লুণ্ঠন, পীড়ন, দমন, ফাঁসি, দেশান-র, জেলান-র, রবীন্দ্রনাথ নিজেই তার সাক্ষীজ্জনির্বিচারে হত্যার প্রতিবাদে ইংরেজের দেওয়া নাইটহুড ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। অবশ্য জালিয়ান-ওয়ালাবাগের ওই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ‘নাইটহুড’ ত্যাগে ছেচল্লিশ দিন সময় লেগেছিল। ‘ঞধমড়ৎব ডরঃযড়ঁঃ ওষষঁংরড়হং’ গ্রনে' হীতেন্দ্রনাথ মিত্র দেখিয়েছেন, ভিতরের চাপেই তাঁকে এই সিদ্ধান- নিতে হয়েছিল। জীবনের শেষে ‘কালান-র’ প্রবন্ধে ইংরেজের বিস-র প্রশসি- বয়ানের সময় তাই হয়তো তিনি নাইটহুডের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান। ইংরেজ বা য়ুরোপের কথা বলার সময় তিনি বলছেন না খৃস্টান শাসক, কিন' বহিরাগত আরব পারস্য শাসকদের বা পশ্চিম এশীয় শাসক না বলে শতকরা শতভাগ সময়ই বলছেন মুসলমান শাসক, মুসলমানের সাহিত্য, মুসলমানের রাষ্ট্রনীতি। মুসলমান ধর্মের মতো খৃস্টানদের অন্য ধর্মকে হরণ করার কথা বলেও তিনি বলেন, ‘খৃস্টান ধর্মাবলম্বীদের সম্বন্ধে একটি সুবিধার কথা এই যে তারা আধুনিক যুগের বাহন ; তাদের মন মধ্যযুগের গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ নয়।’১ এ কথা আগেও উল্লেখ হয়েছে।
হিন্দু মেলা, জাতীয় সভা, সঞ্জিবনী সভা এবং জ্যোতিদাদাদের হিন্দু স্বাদেশিকতা ও মুসলমান সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাবের সঙ্গে ঠাকুর বাড়ির নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন, ‘চাকরদের’ নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং বেদ উপনিষদ গীতা পাঠ, সংস্কৃত চর্চা এসবই শিশু মনের ওপর ধীরে ধীরে প্রভাব ফেলে। আর সবার ওপরে আছে কর্তৃত্বপরায়ণ বিশাল ব্যক্তিত্ব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব। দেবেন্দ্রনাথ এবং উপনিষদের প্রভাব ক্রমে পরিবর্তিত রবীন্দ্রনাথে শেষ পর্যন- অপরিবর্তিত থেকে যায়। এই সূত্রে বলা যায় সৃষ্টিশীল রবীন্দ্রনাথের কল্পনাতে মুসলমানও কোনো পরিসর পায় না। এই সময়ের অন্যতম কবি ফরহাদ মজহার ‘ঠাকুরের বেটা’ রবীন্দ্রনাথকে মাফ করতে পারছেন না, তার দিল বহুত নাখোশ, কারণ, ‘... তেনার কলমে / বহু পয়গম্বর সাধক ও মনীষীর নাম / হয়েছে স্মরণ কিন' ঘুণাক্ষরে নবী মুহম্মদ / আকারে ইঙ্গিতে ভাবে দিলে কিম্বা নিবের ডগায় / একবারও আসে নাই, তাঁকে তাই মাফ করি নাই’ (এবাদতনামা, ফরহাদ মজহার, কবিতা ঃ ২১)। নিরেট তথ্যগত ভাবে সত্য না হলেও বক্তব্য সঠিক। রবীন্দ্রনাথ বেদ উপনিষদ ত্রিপিটক বাইবেল বুদ্ধ খৃস্ট ব্রহ্ম ব্রহ্মা ব্রাহ্ম্য কৃষ্ণচরিত ইত্যাদি সকল বিষয়ে লিখেছেন গদ্য, কবিতায় উল্লেখ করেছেন, গান, নাটক লিখেছেন, গল্পে এসেছে চরিত্র, কখনো বিষয় হয়ে ‘কিন' সাড়ে সাতশ বছরের পুরনো দেশজ কিম্বা বিদেশাগত দরবেশ বা শাসক মুসলিমের কোনো ব্যক্তিগত কৃতি কিম্বা গুণ-মান-মাহাত্ম্য তাঁর কাব্য প্রেরণার উৎস হয়নি। এমনকি আকবর বাদশাহ কিম্বা মঈনউদ্দীন চিশতি, রাজিয়াজ্জআনারকলিজ্জনূরজাহানও নন। ছয়শ বছর ধরে প্রবল প্রতাপ এমন এক বিদ্যা ও বিত্তবান জ্ঞান-কৃতি-কীর্তি বহুল জাতির বা সমপ্রদায়ের কিছুই তাঁর (তাজমহলই ব্যতিক্রম) আবেগ উদ্রিক্ত করতে পারেনি। এতে মনে হয় বিদেশাগত এ শাসকগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর অন-রের গভীরে প্রচণ্ড ঘৃণা-বিদ্বেষ বা স'ায়ী অশ্রদ্ধা ছিল।’৩৬ অধ্যাপক, পণ্ডিত আহমদ শরীফের এই আপসোস প্রসঙ্গ আলোচনা করার আগে কবি মজহারের তথ্যগত ফয়সালা আগে করে নেয়া যাক। আগেই বলা হয়েছে বক্তব্যের দিক থেকে তিনি ঠিকই বলেছেন, আহমদ শরীফের বক্তব্যও তাই, কিন' রবীন্দ্রনাথের কলমের নিবে একাধিকবারই মুহম্মদ-এর নাম লিখিত হয়েছে, আকারে ইঙ্গিতেও হয়েছে। আব্দুল করিম বি.এ. প্রণীত ভারতবর্র্ষে মুসলমান রাজত্বের ইতিবৃত্ত, প্রথম খণ্ড গ্রনে'র আলোচনা-প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ মহাপুরুষ মহাম্মদের কথা লিখেছেন এভাবে, ‘... ভারতবর্ষের প্রতিবেশে বহুতর খণ্ড-বিচ্ছিন্ন জাতি মহাপুরুষ মহম্মদের প্রচণ্ড আকর্ষণবলে একীভূত হইয়া মুসলমান নামক এক বিরাট কলেবর ধারণ করিয়া উত্থিত হইয়াছিল।’৫
আরও তিন ক্ষেত্রে বাণী হিসেবে রবীন্দ্রনাথ মুহম্মদ সম্পর্কে লিখেছেন। বিশিষ্ট রবীন্দ্র গবেষক এবং তথ্য সংগ্রাহক অমিতাভ চৌধুরী সন্ধান দিয়েছেন মুহম্মদ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের তিনটি বাণী বক্তব্যের। কিন' গবেষক চৌধুরীর দাবী মতো রবীন্দ্রনাথ প্রথম দুটি বাণীতে মুহম্মদ-এর বিষয়ে কিছু বলেননি, তাঁর নামও উল্লেখ করেননি। ‘পয়গম্বর দিবস’ উপলক্ষে ১৬ নভেম্বর ১৯৩৩-এ এক জনসভার আয়োজন হয়। সভার সভাপতি বিচারপতি মির্জা আলী আকবর খাঁ। এই সভায় রবীন্দ্রনাথ একটি বাণী পাঠান। বাণীটি সভায় পাঠ করেন বিখ্যাত কংগ্রেস নেতা শ্রীমতী সরোজিনী নাইডু, ‘জগতে যে সামান্য কয়েকটি ধর্ম আছে, ইসলাম ধর্ম তাদেরই অন্যতম। মহান এই ধর্মমতের অনুগামীদের দায়িত্ব তাই বিপুল। ইসলামপন'ীদের মনে রাখা দরকার, ধর্মবিশ্বাসের মহত্ত্ব আর গভীরতা যেন তাদের প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ওপরও ছাপ রেখে যায়। আসলে এই দুর্ভাগা দেশের অধিবাসী দুটি সমপ্রদায়ের বোঝাপড়া শুধু তো জাতীয় স্বার্থের সপ্রতিভ উপলব্ধির ওপর নির্ভর করে না ; সত্যদ্রষ্টাদের বাণীনিঃসৃত শাশ্বত প্রেরণার ওপরও তার নির্ভরতা, সত্য ও শাশ্বতকে যাঁরা জেনেছেন ও জানিয়েছেন, তাঁরা ঈশ্বরের ভালবাসার পাত্র। এবং মানুষকেও তাঁরা ভালবেসে এসেছেন।’৩৭ লক্ষণীয় রবীন্দ্রনাথ ‘সত্যদ্রষ্টা’ ‘ঈশ্বরের ভালবাসার পাত্র’র কথা বললেও মুহম্মদ-এর নামটি কোথাও উল্লেখ করলেন না, এমনকি এই বাণী পয়গম্বর দিবসের জন্য অনুরুদ্ধ হয়ে লিখলেও না।
পরের বাণী তখনকার বিখ্যাত ‘ব্যারিস্টার স্যার আব্দুল্লাহ্‌ সুহরওয়ার্দির’ অনুরোধে ১৯৩৪ সালের ফতেহা দোয়াজদহম উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ লিখে পাঠান, ‘ইসলাম পৃথিবীর মহত্তম ধর্মের মধ্যে একটি। এই কারণে তার অনুবর্তিগণের দায়িত্ব অসীম, যেহেতু আপন জীবনে এই ধর্মের মহত্ত্ব ...’ ইত্যাদি লিখে শেষ বাক্যে লেখেন, ‘আজকের এই পুণ্য অনুষ্ঠান উপলক্ষে মুসলিম ভাইদের সঙ্গে একযোগে ইসলামের মহাঋষির উদ্দেশ্যে আমার ভক্তি উপহার অর্পণ করে উৎপীড়িত ভারতবর্ষের জন্য তাঁর আশীর্বাদ ও সান-্বনা কামনা করি।’৩৭ ইসলামের ‘মহাঋষি’র নামটি তবুও তিনি কলমের নিবে সৃষ্টি করলেন না !
তৃতীয় বাণী নয়াদিল্লীর জামা মসজিদ প্রকাশিত পয়গম্বর সংখ্যার জন্য শুভেচ্ছাবার্তা। রবীন্দ্রনাথ ২৭ ফেব্রুয়ারী ১৯৩৬ সালে শানি-নিকেতন থেকে বার্তাটি পাঠান, ‘যিনি বিশ্বের মহত্তমদের অন্যতম, সেই পবিত্র পয়গম্বর হজরত মহম্মদের উদ্দেশ্যে আমি আমার অন-রের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি। মানুষের ইতিহাসে ...।’৩৭ এই তিনটি বাণী রবীন্দ্র রচনাবলীতে এমনকি পরিশিষ্ট হিসেবেও অন-র্ভুক্ত হয়নি। কবি মজহারের আক্ষেপ যথার্থ বলা যায় বৈ কি।
ভারতবর্ষে আগত মুসলিম শাসকদের কীর্তি নিয়ে কোনো উচ্ছ্বাস, প্রশংসাপত্র না লিখলেও বলাকা’র অন-র্গত ‘তাজমহল’ এবং এই তাজমহলের কারণেই ‘হে সম্রাট কবি’ বা ‘ভারত-ইশ্বর শাজাহান’ প্রশংসাধন্য কবিতা ‘শাজাহান’লেখেন । সাধারণ মুসলমান কৃষক-প্রজাদের সঙ্গে জমিদার রবীন্দ্রনাথের যথেষ্ট ঘনিষ্ঠতা তৈরি হলেও তিনি সাহিত্যে তাদের প্রবেশ অধিকার সীমাবদ্ধ করে দিয়েছিলেন। সম্রাট (শাজাহান), নবাব (মুসলমানীর গল্প), শাহাজাদা ও তার কন্যা (দালিয়া), কখনো ব্যতিক্রমের মতো গল্পের চরিত্র হয়ে এলেও অবংশীয়, কুল গৌরবহীন সাধারণ মুসলমানেরা নয়। বেশি হলে ‘মুসলমান চাকর’, মুসলমান পাগল (ক্ষুধিত পাষাণ), ইত্যাদি।
তবে রবীন্দ্রনাথ ১৮৯১ সালে জমিদারি পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে জাত ধর্ম কুলের অতিরিক্ত বাছবিচার উপেক্ষা করে প্রজাদের একাসনের ব্যবস'া করেন, ‘সব আসন তুলে দিয়ে হিন্দু-মুসলমান-ব্রাহ্মণ-চণ্ডাল সবাইকে একই ধরণের আসনে বসার ব্যবস'া করতে হবে।’৩৭ বলেছেন, ‘প্রাচীন প্রথা আমি বুঝি না। সবার জন্যে একাসন করতে হবে। জমিদার হিসাবে এই আমার প্রথম হুকুম।’৩৭ এবং জমিদারির প্রথম দিনেই প্রারম্ভিক ভাষণে ঘোষণা করলেন, ‘সাহাদের হাত থেকে শেখদের বাঁচাতে হবে। এটাই আমার সর্বপ্রধান কাজ।’৩৭ সুদখোর মহাজনদের হাত থেকে চাষীদের মুক্ত করবার জন্য কৃষিঋণের ব্যবস'া করেন, খোলেন কৃষিব্যাঙ্ক ১৯০৫ সালে। পরে নোবেল প্রাইজ হিসেবে প্রাপ্ত টাকাও ওই ব্যাঙ্কে ঢালেন। পাতিসরে অবসি'ত সমবায় পদ্ধতির কৃষিব্যাঙ্ক কুড়ি বছর চলার পর ফেল করে। রবীন্দ্রনাথ ঋণগ্রস- হয়ে পড়েন। অধিকাংশ মহাজনই ছিল হিন্দু। আর যে প্রজা-কৃষকদের সুবিধার জন্য কৃষিব্যাঙ্ক খোলা হয় তাদের অধিকাংশ ছিলেন মুসলমান। যুক্তবঙ্গের স্মৃতি গ্রনে' অন্নদাশংকর রায় দেখিয়েছেন মুসলমান প্রজা রবীন্দ্রনাথকে কত ভালবাসতেন। জমিদার রবীন্দ্রনাথ ও প্রজা সম্পর্কের প্রশংসা বিভিন্ন গ্রনে' ছড়িয়ে আছে। সে সবের খতিয়ান না করে তখনকার রাজশাহী জেলা গেজেটিয়ারে সাদা কর্মকর্তা এল এস এস ও-ম্যালে জমিদার রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে যা বলেছেন তাই পড়ে দেখা যাক।
ুওঃ সঁংঃ হড়ঃ নব রসধমরহবফ ঃযধঃ ধ ঢ়ড়বিৎভঁষ ষধহফষড়ৎফ রং ধষধিুং ড়ঢ়ঢ়ৎবংংরাব ধহফ ঁহপযধৎরঃধনষব. অ ংঃৎরশরহম রহংঃধহপব ঃড় ঃযব পড়হঃৎধৎু রং মরাবহ রহ ঃযব ঝবঃঃষবসবহঃ ঙভভরপবৎ'ং ধপপড়ঁহঃ ড়ভ ঃযব বংঃধঃব ড়ভ জধনরহফৎধহধঃয ঞধমড়ৎব, ঃযব ইবহমধষর ঢ়ড়বঃ, যিড়ংব ভধসব রং ড়িৎষফ-রিফব. ওঃ রং পষবধৎ ঃযধঃ ঃড় ঢ়ড়বঃরপধষ মবহরঁং যব ধফফং ঢ়ৎধপঃরপধষ ধহফ নবহবভরপরধষ রফবধং ড়ভ বংঃধঃব সধহধমবসবহঃ, যিরপয ংযড়ঁষফ নব ধহ বীধসঢ়ষব ঃড় ঃযব ষড়পধষ তবসরহফধৎং.
অ াবৎু ভধাড়ঁৎধনষব বীধসঢ়ষব ড়ভ বংঃধঃব মড়াবৎহসবহঃ রং ংযড়হি রহ ঃযব ঢ়ৎড়ঢ়বৎঃু ড়ভ ঃযব ঢ়ড়বঃ, ঝরৎ জধনরহফৎধহধঃয ঞধমড়ৎব. ঞযব ঢ়ৎড়ঢ়ৎরবঃড়ৎং নৎড়ড়শ হড় ৎরাধষং. ঝঁন-রহভবঁফধঃরড়হ রিঃযরহ ঃযব বংঃধঃব রং ভড়ৎনরফফবহ, ৎধরুধঃং ধৎব হড়ঃ ধষষড়বিফ ঃড় ংঁনষবঃ ড়হ ঢ়ধরহ ড়ভ বলবপঃসবহঃ. ঞযবৎব ধৎব ঃযৎবব ফরারংরড়হং ড়ভ ঃযব বংঃধঃব, বধপয ঁহফবৎ ধ ঝঁন-সধহধমবৎ রিঃয ধ ংঃধভভ ড়ভ ঃধযধংরষফধৎং, যিড়ংব ধপপড়ঁহঃং ধৎব ংঃৎরপঃষু ংঁঢ়বৎারংবফ. ঐধষভ ড়ভ ঃযব উধশযরষধং ধৎব পযবপশবফ নু ধহ ড়ভভরপবৎ ড়ভ ঃযব যবধফ ড়ভভরপব. ঊসঢ়ষড়ুববং ধৎব বীঢ়বপঃবফ ঃড় ফবধষ ভধরৎষু রিঃয ঃযব ৎধরুধঃং ধহফ ঁহঢ়ড়ঢ়ঁষধৎরঃু বধৎহং ফরংসরংংধষ. জবমরংঃৎধঃরড়হ ড়ভ ঃৎধহংভবৎ রং মৎধহঃবফ ড়হ ধ ভরীবফ ভবব, নঁঃ রং ৎবভঁংবফ রহ ঃযব পধংব ড়ভ ধহ ঁহফবংরৎধনষব ঃৎধহংভবৎবব. জবসরংংরড়হং ড়ভ ৎবহঃ ধৎব মৎধহঃবফ যিবহ রহধনরষরঃু ঃড় ঢ়ধু রং ঢ়ৎড়াবফ. ওহ ১৩১২ রঃ রং ংধরফ ঃযধঃ ঃযব ধসড়ঁহঃ ৎবসরঃঃবফ ধিং জং.৫৭,৫৯৫. ঞযবৎব ধৎব খড়বিৎ চৎরসধৎু ঝপযড়ড়ষং রহ বধপয ফরারংরড়হ ধহফ ধঃ চধঃরংধৎ, ঃযব পবহঃৎব ড়ভ সধহধমবসবহঃ, ঃযবৎব রং ধ ঐরময ঊহমষরংয ঝপযড়ড়ষ রিঃয ২৫০ ংঃঁফবহঃং ধহফ ধ পযধৎরঃধনষব ফরংঢ়বহংধৎু. ঞযবংব ধৎব সধরহঃধরহবফ ড়ঁঃ ড়ভ ধ ভঁহফ ঃড় যিরপয ঃযব বংঃধঃব পড়হঃৎরনঁঃবং ধহহঁধষষু জং.১,২৫০ ধহফ ঃযব ৎধরুধঃং ৬ ঢ়রবং ঃড় ৎঁঢ়বব রহ ঃযবরৎ ৎবহঃ. ঞযবৎব রং ধহ ধহহঁধষ মৎধহঃ ড়ভ জং.২৪০ ভড়ৎ ঃযব ৎবষরবভ ড়ভ পৎরঢ়ঢ়ষবং ধহফ ঃযব নষরহফ. অহ ধমৎরপঁষঃঁৎধষ নধহশ ধফাধহপবং ষড়ধহং ঃড় ৎরুধঃং ধঃ ১২ ঢ়বৎপবহঃ ঢ়বৎ ধহহঁস. ঞযব ফবঢ়ড়ংরঃড়ৎং ধৎব পযরবভষু ঈধষপঁঃঃধ ভৎরবহফং ড়ভ ঃযব ঢ়ড়বঃ, যিড় মবঃ রহঃবৎবংঃ ধঃ ৭ ঢ়বৎপবহঃ. ঞযব নধহশ যধং ধনড়ঁঃ জং.৯০,০০০ রহাবংঃবফ রহ ষড়ধহং.চ ৩৮
পাশাপাশি ঠাকুর বাড়ির অন্য জমিদারদের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথেরও প্রজা-পীড়ন, মুসলমান প্রজা-পীড়নেরও বিস-র অভিযোগ আছে, অভিযোগ আছে প্রজা-নির্যাতনের দলিলপত্র নষ্ট করে ফেলার, ভয় দেখিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখার। খাজনা পরিশোধে অপারগ মুসলমান প্রজার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেবার, এমনকি মুসলমান প্রজাদের শিক্ষা দেবার জন্য নমঃশূদ্র প্রজা এনে মুসলমানদের এলাকায় বসতি স'াপনের সামপ্রদায়িক বুদ্ধিও রবীন্দ্রনাথ করেছিলেন। সমাজতন্ত্রবাদী কাঙাল হরিনাথের পত্রিকা ‘গ্রামবার্তা’য় ঠাকুর জমিদারদের নিপীড়নের অনেক খবর বিবরণ ছাপা হতো। বিশিষ্ট লেখক শ্রী অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়-র লেখা ‘সিরাজদ্দৌলা’ গ্রনে'র প্রশংসাসূচক আলোচনা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পরে যখন রবীন্দ্রনাথের ও ঠাকুর জমিদারদের নানা নিষ্ঠুর ঘটনা উল্লেখ করে কাঙাল হরিনাথ শ্রী অক্ষয় মৈত্রেয়কে চিঠি লেখেন, এবং মৈত্রেয় মহাশয় তাঁর এক প্রবন্ধে হরিনাথের চিঠির ভাষ্য উল্লেখ করেন, তাতে রবীন্দ্রনাথ ভীষণ রুষ্ট হয়ে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়-র ‘রানী ভবানী’ গ্রন' প্রকাশের অর্থসাহায্যের প্রতিশ্রুতিদাতা বন্ধু জমিদার নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়কে বলে প্রত্যাহার করিয়ে নেন। ‘রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন’ প্রবন্ধের জন্য অধ্যাপক আহম্মদ শরীফ গবেষক অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরীকে কাঙাল হরিনাথের ‘গ্রামবার্তা’ এবং ঠাকুর জমিদারদের সম্পর্কে জানতে চেয়ে চিঠি লেখেন। শরীফ সাহেবের চিঠির উত্তরে অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরীর লেখা চিঠিতে সংশ্লিষ্ট প্রচুর তথ্য পরিবেশিত হয়। চিঠিটির প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে আর একবার পড়ে দেখা যাক ঃ
৭. ৯. ৮৫
শ্রদ্ধাভাজনেষু
স্যার, সালাম জানবেন। অসুস'তার জন্যে আপনার চিঠির জবাব দিতে কয়েকদিন দেরী হলো। অনুগ্রহ করে মাফ্‌ করবেন আমাকে।
ঠাকুর জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ কাঙাল হরিনাথের ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’র কোন্‌ বর্ষ কোন্‌ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল তা আমার সঠিক জানা নেই। আমাদের কাছে ‘গ্রামবার্তা’র যে ফাইল আছে, তাতে এই সংবাদ নেই। প্রজাপীড়নের এই সংবাদ-সূত্রটি পাওয়া যায় কাঙাল-শিষ্য ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয়র একটি প্রবন্ধে। কাঙালের মৃত্যুর পর অক্ষয়কুমারের এই প্রবন্ধটি সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত ‘সাহিত্য’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রবন্ধে মৈত্রেয়বাবু কাঙাল হরিনাথের সংবাদপত্র পরিচালনায় সততা ও সাহসের পরিচয় প্রসঙ্গে প্রজাপীড়নের সংবাদ ‘গ্রামবার্তা’য় প্রকাশের উল্লেখ করেন। ঠাকুর-জমিদারদের অত্যাচার সম্পর্কে হরিনাথ নিজে অক্ষয়কুমারকে যে পত্র লেখেন, তিনি এই প্রবন্ধে তা উদ্ধৃত করে দেন। এই প্রবন্ধ প্রকাশের ফলে রবীন্দ্রনাথ বিশেষ রুষ্ট ও অপ্রসন্ন হন এবং তাঁর অন-রঙ্গ বন্ধু নাটোরের মহারাজা জগদীন্দ্রনাথ রায়কে বলে অক্ষয়কুমারের ‘রানী ভবানী’ গ্রন'প্রকাশের অর্থ-সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করান। কাঙাল-পুত্র সতীশচন্দ্র মজুমদার-সূত্রে জানা যায়, ঠাকুর-জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ-প্রকাশের অপরাধে (?) তাঁরা লাঠিয়াল-গুণ্ডা লাগিয়ে কাঙালকে শায়েস-া করার ব্যবস'া নেন। এইসব ঘটনা ঠাকুর-জমিদারীর ইতিহাসের দুঃখজনক ‘কালো অধ্যায়’।
এ-ছাড়া অন্যত্র, যেমন মীর মশাররফ হোসেন সম্পাদিত ‘হিতকরী’ পত্রিকায়, ঠাকুর-জমিদাররা যে প্রজাসাধারণের দুঃখ-কষ্ট মোচনে তেমন তৎপর ও মনোযোগী ছিলেন না তার ইঙ্গিত আছে। ঠাকুরবাবুরা তাঁদের জমিদারী-এলাকায় গো-কোরবানী নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন এবং এই নির্দেশ অমান্যকারীদের নানাভাবে নিগৃহীত হতে হয়। শিলাইদহ ঠাকুর-জমিদারীর এই ভূস্বামী-স্বার্থরক্ষার কৌশল-ব্যবস'া ও প্রজাপীড়নের ঐতিহ্য চারপুরুষের, দ্বারকানাথ থেকে সুরেন্দ্রনাথ পর্যন-। কাঙাল হরিনাথের দিনলিপিতেও এর ইঙ্গিত মেলে।
শিলাইদহ জমিদারীতে রবীন্দ্রনাথের আমলেও কিছু অবাঞ্ছিত ও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। চরের মুসলমান প্রজাদের ঢিঁঢ করবার জন্য নমঃশূদ্র প্রজা এনে বসতি স'াপনের সামপ্রদায়িক-বুদ্ধিও রবীন্দ্রনাথের মাথা থেকেই বেরিয়েছিল। এ-ছাড়া পুত্র রথীন্দ্রনাথের নিরীক্ষামূলক শখের কৃষি-খামারের প্রয়োজনে গরীব মুসলমান চাষীর ভিটেমাটি দখল করে তার পরিবর্তে তাকে চরের জমি বরাদ্দের মহানুভবতাও রবীন্দ্রনাথ প্রদর্শন করেছিলেন। এ-সব কথা ও কাহিনী উক্ত-জীবনীকারদের যত্ন ও সৌজন্যে চাপা পড়ে গেছে। সত্য ইতিহাসকে তুলে ধরতে গেলে অনেককেই হয়তো সামপ্রদায়িক বা রবীন্দ্র-বিদ্বেষী শিরোপা, নয়তো সুভো ঠাকুরের (‘বিস্মৃতিচারণার প্রতিক্রিয়া’ দ্রষ্টব্য) মতো ধিক্কার ও তিরস্কার অর্জন করতে হবে।
ঠাকুর-জমিদারদের প্রজা-পীড়নের বিষয়ে আমি রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ জীবনের নিপুণ ভাষ্যকার শ্রী শচীন্দ্রনাথ অধিকারীকে (তিনি নিজে শিলাইদহবাসী ও ঠাকুর-এস্টেটের কর্মচারী ছিলেন এবং এই বিষয়গুলো জানতেন) চিঠিপত্রে নানা প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি এ-সব জিজ্ঞাসার জবাব এড়িয়ে ও অস্বীকার করে এই ধরণের কৌতূহলকে রবীন্দ্র-বিদ্বেষী বলে অভিহিত করেছিলেন।
উপরি-বর্ণিত বিষয়গুলোর কিছু কিছু তথ্য আমার সংগহে আছে। আপনার প্রয়োজন হলে সেগুলো পাঠাতে পারি। আপনার নির্দেশের অপেক্ষায় রইলাম। এই বিষয়ে আপনি কোন প্রবন্ধ লিখেছেন কী না জানিয়ে বাধিত করবেন। আমার গবেষণার কাজ (‘মীর মশাররফ হোসেনের শিল্পকর্ম ও সমাজচিন-া’) চালিয়ে যাচ্ছি। এ-বছরের মধ্যে থিসিস্‌ জমা দেবো এমন আশা আছে। আমার লেখার কাজে আপনার প্রশ্রয় ও প্রেরণার কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি। আপনার জবাবের প্রত্যাশায় রইলাম। আন-রিক শ্রদ্ধা ও সালাম জানিয়ে শেষ করি।

স্নেহসিক্ত,
আবুল আহসান চৌধুরী ৩৬

পেশা হিসেবে জমিদারি রবীন্দ্রনাথ কখনো আনন্দে গ্রহণ করেননি, ভোগও করেননি। পিতৃদেবের আদেশ না হলে কখনো তিনি হয়তো জমিদারি সশরীরে করতেন না। তিনি বলেছেন, ‘আমার জন্মগত পেশা জমিদারি কিন' আমার স্বভাবগত পেশা আসমানদারি। এই জিনিসটার পরে আমার শ্রদ্ধার একান- অভাব। আমি জানি জমিদার জমির জোঁক ; সে প্যারাসাইট, পরাশ্রিত জীব।’৩৯ ‘রায়তের কথা’ প্রবন্ধে জমিদারি অভিজ্ঞতা থেকে আরও অনেক কথা লিখেছেন। তবে শেষ পর্যন- তিনি জমিদারি উচ্ছেদে বা এই প্রথা রদ করার বিপক্ষে ছিলেন। জমিদার ‘রক্তচোষা জোঁক’ হলেও তিনি এই প্রথা অক্ষণ্ন রাখার অদ্ভূত অনুমান যুক্তি খুঁজে পেয়েছেন, প্রজা ও রায়তদের হাতে জমি থাকলে ‘মাড়োয়ারি দখল স'াপনের উদ্দেশ্যে ক্রমশ জমি ছিনিয়ে নিতে ইচ্ছা করে, তা হলে অতি সহজেই সমস- বাংলা তারা ঘানির পাকে ঘুরিয়ে তার সমস- তেল নিংড়ে নিতে পারে।’৩৯ কৃষকের হাতে কৃষকের জমি ফিরিয়ে দিতে তিনি আরও সমস্যা আবিষ্কার করতে পারেন, ‘মূল কথাটা এইজ্জরায়তের বুদ্ধি নেই, বিদ্যা নেই, শক্তি নেই, আর ধনস'ানে শনি। তারা কোনোমতে নিজেকে রক্ষা করতে জানে না। তাদের মধ্যে যারা জানে তাদের মতো ভয়ঙ্কর জীব আর নেই। রায়ত-খাদক, রায়তের ক্ষুধা যে কত সর্বনেশে তার পরিচয় আমার জানা আছে।৩৯ কাজেই জমিদার থেকে বিদ্যা বুদ্ধি শক্তিহীন মূঢ় রায়ত বেশি ভয়ংকর ! তো রবীন্দ্রনাথ অভিজ্ঞতা থেকে রায়তের বিরুদ্ধে জমিদারের পক্ষে ওকালতি করে বলেছেন, ‘আমার যেটুকু অভিজ্ঞতা তাতে বলতে পারি, আমাদের দেশে মূঢ় রায়তদের জমি অবাধে হস-ান-র করার অধিকার দেওয়া আত্মহত্যার অধিকার দেওয়া।’৩৯ রবীন্দ্রনাথ যে ‘মূলকথা’ বললেন, তারও মূল আছে, এবং মূলের কারণ হলো, ‘শতকরা প্রায় ৯০ জন জমিদার ছিল (উচ্চবর্ণের) হিন্দু এবং অধিকাংশ কৃষক ছিল মুসলমান ও তথাকথিত নিম্নজাত হিন্দু।’৪০ রবীন্দ্রনাথ সচেতনভাবে রায়তের মূঢ়তার ওপর দায় চাপিয়ে নিজের শ্রেণীর স্বার্থ অক্ষুণ্ন দেখতে চেয়েছেন। ১৭৯৩-এ চিরস'ায়ী বন্দোবসে-র ফলে যে জমিদারশ্রেণীর উদ্ভব হয় তাদের মধ্যে ইংরেজের ‘বেনিয়ান’ রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরও ছিলেন। ইংরেজের সঙ্গে বাণিজ্য এবং জমিদারি কেনায় তিনি সফল হন। পরে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথও এই জমিদারি বহুগুণ বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন। ইংরেজ শাসনের দুটি নির্ভরযোগ্য খুঁটিই ছিল এক, জমিদার আর দুই, মুৎসুদ্দি বুর্জোয়া। রবীন্দ্রনাথের পিতামহ ও পিতা এই দুই খুঁটির অন্যতম ছিলেন বৈকি। অমিতাভ চৌধুরী, অন্নদাশংকর রায় প্রমুখের সাফাই আর আবুল আহসান চৌধুরী প্রমুখের বিপরীত তথ্য যেমনই হোক না কেন, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের জীবন ও রচনাবলী ভাবতে সাহায্য করে যে তিনি ধর্মবর্ণগত ঐক্যের বদলে জনগত ঐক্য প্রত্যাশা করলেও শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে জাতচর্চার নিন্দা করলেও তাঁর সাহিত্যে মুসলমান দূরে, প্রান-বর্তী, মুসলমান সমপ্রদায়ের প্রতি করা হয়েছে নির্দয় শীতল উপেক্ষা, কখনো সরব নিন্দা।
‘ভাগ্যবিধাতার অযাচিত বদান্যতা’য় পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বালক রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে যান শানি-নিকেতন থেকে অমৃতসর, ডালহৌসি থেকে হিমালয়ের বক্রোটা পর্বতশিখরে। ১৮৭৩-এর ফেব্রুয়ারিতে এই যাত্রা শুরু হয়েছিল। ‘হিমালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রবলতা, নিঃসঙ্গতা ও ঐশ্বর্যের ভিতর স্বাধীন বিচরণের’ কথা রবীন্দ্রনাথ জবিনস্মৃতিতে বললেও সেই স্বাধীনতা ছিল মহর্ষি অনুমোদিত। উপনয়নের পর পর এই হিমালয় যাত্রা শুধু আনন্দ ভ্রমণ নয়জ্জবেদ, উপনিষদ, ঋষিদের ভারত আত্মাকে অন-রের ভিতর আবিষ্কার ও উপলব্ধি করানো ছিল পিতার উদ্দেশ্য। গোরা উপন্যাসে পরেশবাবুর কাছে গৌর-এর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ যে প্রার্থনা করেন সেই উপলব্ধির সূচনা এই বক্রোটা পর্বত শিখর থেকে বলা যায়, ‘আপনি আমাকে আজ সেই দেবতারই মন্ত্র দিন, যিনি হিন্দু মুসলমান খৃস্টান ব্রাহ্ম সকলেরইজ্জযাঁর মন্দিরের দ্বার কোনো জাতির কাছে, কোনো ব্যক্তির কাছে, কোনোদিন অবরুদ্ধ হয় নাজ্জযিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।৪১ সাহিত্যের এই ভারতবর্ষ কতটা ব্যবহারিক জীবনের ভিতর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ! ‘জনগত ঐক্য’ বা ‘সকলের ভারতবর্ষ’ তাঁর প্রার্থিত, এক অর্থে এই বোধ তাঁর উপনিষদের শিক্ষা হলেও, উপন্যাসের গোরা সেই উপলব্ধিতে পৌঁছাতে পারলেও, পরিবার বিশেষ করে বাবা দেবেন্দ্রনাথের অনতিক্রম্য প্রভাবে রবীন্দ্রনাথের তা অর্জন করা সবসময় সম্ভব হয়নি। রবীন্দ্রনাথের কাছে উপনিষদ পৃথিবীব্যাপ্ত আলো, যে আলোয় উদ্ভাসিত সকলেই ... তেমনি দেবেন্দ্রনাথের ব্রাহ্মধর্ম বা আদি ব্রাহ্ম সমাজের অনুসৃত হিন্দু ব্রাহ্ম ও হিন্দুত্বের ভিতর থেকেই অন্যকে এবং পৃথিবীকে বোঝা। ‘হিন্দু ব্রাহ্মরা হিন্দুই, অর্থাৎ যে ব্যক্তি সে ব্রাহ্ম হইলেও হিন্দু, ব্রাহ্ম না হইলেও হিন্দু। ... হিন্দু সমাজে ভ্রম আছে, অন্ধসংস্কার আছে, সবই আছে মানি কিন' তাহার চেয়ে বেশি করিয়া মানি হিন্দু সমাজেও সত্য আছেন, মঙ্গল আছেন, ব্রহ্ম আছেন। হিন্দু সমাজের মধ্যে আমি সেই সত্যের দিকে মঙ্গলের ব্রহ্মের দিকে দাঁড়াইব ইহাই যেন আমার সংকল্প হয়। ... ব্রাহ্মধর্ম হিন্দু-ইতিহাসের একটি বিকাশ, অর্থাৎ ব্রাহ্মধর্ম যত বড়োই সর্বজনীন ধর্ম হউক না, বিধাতার সৃষ্টির নিয়ম তাহাকেও মানিতে হয়, নতুবা তাহা সত্যই হইতে পারে না।’৪২ রবীন্দ্রনাথকে এই বক্তব্য প্রকাশ করতে হয় যখন কেশববাবুদের ব্রাহ্ম মত দাবী করেন হিন্দুদের সঙ্কীর্ণ গণ্ডী অনেককাল আগেই অতিক্রম করেছে বলে।
উপবীতধারণ বা পৈতাগ্রহণ সমাজের মধ্যে অধিকার ও জাতভেদ নির্ধারণ করে। হিন্দুধর্মের বিকাশমান ও সংস্কারমুক্ত আধুনিকদের পৈতা ধারণ সংস্কারকে আগলে থাকারই নামান-র। কিন' রবীন্দ্রনাথ মনে করেন, পৈতা বা উপবীতধারণ বিধাতারই নিয়ম, যে নিয়ম কৃত্রিম নয় সেই নিয়ম বা গণ্ডী অতিক্রম করা সম্ভব নয়।
দেবেন্দ্রনাথ ১৮৪৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আরো ২০ জনের সঙ্গে ব্রাহ্মধর্ম প্রচলন ও দীক্ষাগ্রহণ করেন। প্রাথমিক পর্যায়ে যেমন ছিল দ্বিধাদ্বন্দ্ব, তেমনি ছিল অবিচলতা। রাখালদাস হালদার ব্রাহ্মদের উপবীত ত্যাগ করা বিধেয় বলে মনে করেন, ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষাগ্রহণের পর জাতিভেদের স্মারক পৈতা কাম্য হতে পারে না। রাখালদাসের এই সাহসী প্রস-াব পেশ করেছিলেন ১৮৪৫ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্রাহ্ম সম্মেলনে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৬৭’র দিকে উপবীত ত্যাগ করেন, বন্ধু রাজানারায়ণ বসুকে লেখেন, ‘ব্রাহ্মদের মধ্যে কোনো জাতিভেদ থাকিতে পারে না’৪৩ ‘এবং ব্রাহ্মদিগের উপনয়ন স্বধর্মসম্মত নহে।’৪৩ এমনকি মহর্ষি ব্রাহ্মদের মধ্যে তখন অসবর্ণ বিবাহ হতে পারে বলে মত দেন। মহর্ষি নিজের উদ্যোগে অব্রাহ্মণ কেশবচন্দ্র সেনকে ব্রাহ্মসমাজের আচার্যের পদে অভিষিক্ত করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে এইসব সংস্কার একরকম বৈপ্লবিক বৈকি। তবে মহর্ষির পরিবারের সকলে রাতারাতি সকল আচার-সংস্কার বর্জন করে ব্রাহ্ম হয়ে উঠতে পারছিলেন না। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তীব্র বিরোধেও তিনি জড়িয়ে পড়তে রাজি ছিলেন না, ‘মাতা, পিতা, স্ত্রী, পুত্রকে দুঃখ দিয়া স্বজাতি হইতে পৃথক হওয়া কর্তব্য নহে’৪৩ বলে মনে করেছেন। দেবেন্দ্রনাথের বৈপ্লবিক আদর্শ নিজের মনে আর চিঠিপত্রের মতামতে যতটা বিরাজ করে ততটা তার সংসারে নয়। এবং তিনি তা চানও নি, স্বজাতি হইতে পৃথক হওয়া কর্তব্য জ্ঞান করেননি। দেবেন্দ্রনাথ যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন ঠাকুর পরিবারে কোনো অসবর্ণ বিয়ে হয়নি, দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, সৌদামিনী দেবীর বিয়ে হয়েছিল সম্পূর্ণ হিন্দু রীতিতে। বিবাহ, অন্নপ্রাসন, নামকরণ ইত্যাদি হিন্দুমতেই অনুষ্ঠিত হতো। ‘বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা’ গ্রনে' বিনয় ঘোষ দেখিয়েছেন, সামাজিক ও পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠানে হিন্দুরীতির সঙ্গে প্রকাশ্য বিচ্ছেদ ও বিরোধ মহর্ষির কাম্য ছিল না। হিন্দুরীতির সঙ্গে দেবেন্দ্রনাথের এই আপোষী মনোভাব শেষ পর্যন- ব্রাহ্মসমাজকে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলে। কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে তরুণ প্রগতিশীল অংশ গঠন করেন ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ, আর দেবেন্দ্রনাথের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় আদি ব্রাহ্মসমাজ। এই ভাঙ্গন চূড়ান- হয় ১১ নভেম্বর ১৮৬৪ সালে।
‘শ্রীযুক্ত নবগোপাল মিত্র মহাশয়ের উদ্‌যোগে ও শ্রীযুক্ত গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের আনুকূল্য ও উৎসাহে হিন্দুমেলা প্রতিষ্ঠিত হইল। শ্রীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও দেবেন্দ্রনাথ মল্লিক হইলেন মেলার প্রধান পৃষ্ঠপোষক।’৮ গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন মহর্ষির ভাই গিরীন্দ্রনাথের ছেলে এবং পৃষ্ঠপোষক দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বয়ং মহর্ষির বড়ছেলে। হিন্দুজাতীয়তাবাদী চেতনা ও হিন্দু মতের মানুষের এই মিলনে মহর্ষিও ছিলেন সশরীরে সমর্থক। পূর্বে উল্লিখিত জাতীয় সভার এক সভায় ১৮৭২ সালে দেবেন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেন, আর রাজনারায়াণ বসু বক্তৃতা করেন ‘হিন্দু ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব’ বিষয়ে। দেবেন্দ্রনাথ ধীরে ধীরে প্রচলিত হিন্দু রীতিনীতিতে ফিরে আসেন। এক সময় তিনি উপবীত ত্যাগ করলেও ১৮৭৩ সালে মহা সমারোহে তিনি পুত্র সৌমেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথকে উপবীত দান করেন। শুধু তাই নয়, মহর্ষির বিশেষ বন্ধু, ঠাকুর পরিবারের নিকটজন, ব্রাহ্মসমাজের সভাপতি রাজনারায়ণ বসুকে রবীন্দ্রনাথের উপনয়ন অনুষ্ঠানে উপনয়ন গৃহে আসন গ্রহণ করায় শূদ্র বলে অপমানিত ও বিতাড়িত হতে হয়। বালক রবীন্দ্রনাথের সামনেই এই ঘটনা ঘটে।
‘পৈতা’ বিষয়ক প্রাসঙ্গিক একটা ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ-মৃণালিনীর চতুর্থ সন-ান এবং তিন কন্যার তৃতীয়জন মীরা বা অতসীলতার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বিয়ে ঠিক করেন বরিশালের ‘সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজে’র সভ্য বামনদাস গঙ্গোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পুত্র ‘প্রিয়দর্শন তেজস্বী’ নগেন্দ্র নাথ গঙ্গোপাধ্যয়ের সঙ্গে। বিয়ের পর সকল খরচ সহ পড়ালেখার জন্য আমেরিকা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে পেয়ে নগেন্দ্রনাথ বিয়ে করতে সম্মত হন। পণ প্রথার সমালোচনা করে ‘বিলাসের ফাঁস’ নিবন্ধ লিখলেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর তিন কন্যাকেই যৌতুকের বিনিময়ে বিয়ে দেন। অবশ্য ‘বিলাসের ফাঁস’ রচনাটি তিন কন্যার বিয়ে আয়োজনের তিক্ত অভিজ্ঞতার পরেই লেখা। সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের সভ্য নগেন্দ্র ও তার পরিবার জীবনযাপনে, চিন-ায় সম্পূর্ণভাবেই হিন্দু রীতিনীতি ও সংস্কার মুক্ত। রবীন্দ্রনাথ সে সব জেনে হিন্দু আচার সংস্কার বিষয়ে নিজের ও আদি ব্রাহ্ম সমাজের মনোভাব নগেন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে জানান। ‘আমি তোমাকে নিজের মতে আনিবার জন্য তর্ক করিতেছি নাজ্জব্রাহ্ম ধর্ম বলিতে আমি যাহা বুঝি তাহারই কিঞ্চিৎমাত্র আভাস দিতে চেষ্টা করিলাম। ... সিঁদুর বা আলতা-পরাকে আমরা বাহ্য সৌন্দর্য হিসাবে কেহ দেখি না। কিন' মেয়েদের সিঁদুর বা আলতা পরার মধ্যে স্বামীর প্রতি যে মঙ্গল ইচ্ছা চিরদিন এদেশে প্রকাশ পাইয়া আসিয়াছে তাহারই কোমলতা ও কাব্যরস আমাদের মনকে আকর্ষণ করে। ... কিন' (সিঁদুর) না পরায় দেশী মেয়েলিত্বের অভাবে আমাদের মনকে আঘাত দেয়...।’৪৪ এই চিঠিতে নগেন্দ্রনাথের বিশ্বাসের কোনো পরিবর্তন হয় না। হিন্দু রীতিনীতি অনুযায়ী বিয়ের নানা অনুষ্ঠানে নগেন্দ্র নানারকম আচরণ করেন। বিয়ের আগে শানি-নিকেতনের মন্দিরে নগেন্দ্রনাথকে আদি-ব্রাহ্মসমাজ মতে দীক্ষা দেন রবীন্দ্রনাথ। তবে ‘আদি ব্রাহ্মসমাজীয় রীতি অনুসারে উপবীত ধারণ ব্রাহ্মণের পক্ষে অনিবার্য। নগেন্দ্র গাঙ্গুলি সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের যুবক, তিনি উপবীত-ধারণে অস্বীকৃত হন। শুনিয়াছিলাম, বিবাহ সভায় মন্দিরের মধ্যে তাঁহার গলদেশে যজ্ঞ-সূত্র দিবার চেষ্টা করা হইলে তিনি তাহা লইয়া দূরে নিক্ষেপ করেন।’৪৫ রবীন্দ্রনাথ-জীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের এই তথ্যের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বড়কন্যা মাধুরীলতার রথীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠির ভাষ্য মিলিয়ে দেখা যাক, ‘...২৩ জ্যৈষ্ঠ (১৩১৪) শুভদিনে, শুভক্ষণে, শুভমুহূর্তে, শুভযোগে, শুভগোধুলিলগ্নে বিবাহ ! শুভলগ্নের কথা পরে, আগে পৈতার কথা শ্রবণ কর পূর্ব্বে লিখিতে ভুলিয়াছিলাম, ... বড় বৌঠান প্রমুখ্যাৎ শুনিলাম শ্রীমান নগেন্দ্র যজ্ঞোপবীত ধারণ করিয়া দ্বিজন্ম লাভ করিবেন। সেদিন তিনি ব্রাহ্মণ হইবেন। ... যথাশাস্ত্র যজ্ঞোপবীত ধারণ সমাপ্ত হইল, বাবা নানাপ্রকার উপদেশ দিলেন যাহাতে এ বিষয়ে (পৈতা) নগেন্দ্রের যে সকল কুসংস্কার ছিল সেগুলি দূরীভূত হয় ...। নগেন্দ্র কি বুঝিল ভগবান জানেন, ফিরিয়া আসিয়াই বাবার স্বহস-দত্ত পৈতা ফেলিয়া দিল।’৪৬ পরবর্তীকালে অবশ্য নগেন্দ্রের সঙ্গে মীরা দেবীর বিয়ে আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ ঘটে যায়। ঠাকুর পরিবারের প্রথম বিবাহ বিচ্ছেদ। একমাত্র বিচ্ছেদও কি !
ঔপনিষদিক আদর্শ, প্রাচীন বা আদি ভারতবর্ষীয় দর্শন এবং হিন্দু আচার অনুষ্ঠানের সঙ্গে দেবেন্দ্রনাথের ধর্মীয় ও জীবনাদর্শের প্রভাব রবীন্দ্রনাথের ওপর ঘটে প্রবলভাবে। ‘দেবেন্দ্রনাথের ধর্মীয় আদর্শের প্রতিফলন রবীন্দ্রনাথে যতোটা গভীরভাবে পড়েছিলো, পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের ওপর ততোটা পড়েনি।’৪৭ একটি ঘটনা স্মরণ করা যাক। রবীন্দ্রনাথের ভাই বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলে বলেন্দ্রনাথের মাত্র ২৯ বছর বয়সে মৃত্যু হলে তার কিশোরী বিধবা সাহানা দেবীর বিবাহের আয়োজন হয়। বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহরীতি প্রচলনের তখন মধ্যযুগ। সাহানা দেবী চলে গেছেন পিতার গৃহে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্ম হয়েও বিধবা বিবাহের পক্ষে কখনো কথা বলেননি। আর তখন তো তিনি পরিচিত হিন্দু ব্রাহ্মণ ব্রাহ্ম। তাঁর পক্ষে বিধবা বিয়ে মেনে নেয়া অসম্ভব। হাজার হোক ঠাকুর বাড়ির বিধবা, তার সম্মান নেই ! মহর্ষি বড়ছেলে দ্বিজেন্দ্রনাথকে বললেন এই বিয়ে যাতে না হয় তার ব্যবস'া নিতে। হিন্দুমেলার পৃষ্ঠপোষক হলেও সংস্কৃতিবান দ্বিজেন্দ্রনাথ অপারগ হলেন পিতার এই অমানবিক নির্দেশ মান্য করতে। আই সি এস সত্যেন্দ্রনাথের পক্ষে তো সম্ভবই নয়। তিনি এই বিয়ের ঘোর সমর্থক, উপরন' তিনি তখন নারীবাদী হয়ে উঠেছেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথও পিতার ইচ্ছা পূরণে অসমর্থ হলেন, কারণ তিনিও চান কিশোরী সাহানা দেবী অকাল বৈধব্যের অভিশাপ মুক্ত প্রাণভরপুর সংসারে ফিরে আসুক। তখন মহর্ষি ডাকলেন কনিষ্ঠপুত্র রবিকে। মহর্ষির আদেশ যেভাবেই হোক এ বিয়ে বন্ধ করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ পিতার আদেশ শিরধার্য করে সাহানা দেবির পিত্রালয়ে যেয়ে বিয়ে বন্ধের ব্যবস'া করে ঠাকুরবাড়ির কিশোরী বিধবা সুন্দরী সাহানা দেবীকে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে ফিরিয়ে আনেন। এই ঘটনা উল্লেখ করে অমিতাভ চৌধুরী রবীন্দ্রনাথের ‘মানসিক দ্বন্দ্বে জীর্ণ’ হওয়ার কথা বলেন, বলেন রবীন্দ্রনাথ নীতিগতভাবে এই বিয়ে সমর্থন করেছিলেন। দুঃখের বিষয় অমিতাভ বাবু তার এই মতের সমর্থনে একটি নজিরের কথাও উল্লেখ করতে পারেননি। কোনো দৃষ্টান- ছাড়া এই মত তাঁর ব্যক্তিগত স্বকল্পিত মত বলেই মনে হয়। রবীন্দ্রনাথ দীর্ঘ জীবনে শতসহস্র গদ্য পদ্যে বিদ্যাসাগর প্রবর্তিত হিন্দু বিবাহরীতি সমর্থন করে কোনো কিছু লেখেননি। নানাধরনের গল্প মিলিয়ে দেড়শতাধিক গল্পের মধ্যে একটি মাত্র গল্প ‘প্রতিবেশিনী’। এই গল্পে এক বিধবার পাণিপ্রার্থী দুই তরুণকে নিয়ে একটি প্রহসনের মতো গল্প লেখেন। রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রবন্ধ নিবন্ধের বিষয় দেখে অভিভূত ও বিস্মিত হতে হয়, কী বিষয় নিয়ে তিনি লেখেননি ! শুধুমাত্র বিধাব বিবাহ বিষয়টিই যা ব্যতিক্রম।
দেবেন্দ্রনাথ মৃত্যুবরণ করেন ১৯০৫ সালে। রবীন্দ্রনাথ ছেলে রথীন্দ্রনাথের বিয়ে দেন ১৯০৭ সালে এক বিধবার সঙ্গে। পিতার আদেশ পালন করতে যেয়ে এক অকাল বিধবার বিয়ে ভেঙে দিয়েছিলেন, সেই তিনিই ছেলের বিয়ে দেন এক বিধবার সঙ্গে ! তবে এক্ষেত্রে প্রমাণ করা কঠিন যে, বিধবার বিয়ে ভেঙ্গে দেওয়ার মানসিক দায় থেকে মুক্তির বা আদর্শগত সমর্থনের কারণে তিনি নিজের ছেলের সঙ্গে বিধবার বিয়ের আয়োজন করেছেন। কারণ বিধবা পাত্রী সমাজের অন্য কেউ নয়, সেও একজন ঠাকুর পরিবারের নিকট-আত্মীয়, রথীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের পূর্ব চেনা, রবীন্দ্রনাথের কাকা গিরীন্দ্রনাথের ছোটছেলে গুণেন্দ্রনাথ, তাঁর কন্যা বিনয়নীর মেয়ে অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের অত্যন- প্রিয়ভাজন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাগ্নি প্রতিমা দেবী অকাল বৈধব্যবরণ করলে রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে বিয়ের আয়োজন হয়। মানসিক দ্বন্দ্বে জীর্ণ হয়ে এই বিয়ের আয়োজন নয়, প্রতিমা দেবীর নিজের লেখা ‘স্মৃতিচিত্র, রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য’ গ্রনে'র সম্পাদক সুনীল জানা ভূমিকা নিবন্ধে জানাচ্ছেন, ‘কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর অনেকদিন থেকেই একান- ইচ্ছা ছিল, ভারি সুন্দরী এই মেয়েটিকে (প্রতিমা দেবী) পুত্রবধূ করে আনেন। রবীন্দ্রনাথেরও অমত ছিল না, কিন' তখন তা আর ঘটে উঠেনি। অভিভাবকেরা মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যস- হয়ে উঠেছিলেন। কিছুদিন আগেই মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু (২৯/১১/১৯০২) হয়েছে। তাছাড়া রথীন্দ্রনাথও তখন অপ্রাপ্তবয়স্ক। ... কিন' মেয়ের অভিভাবকরা অপেক্ষা করতে রাজি হননি। মাত্র বছর দশেক বয়সেই প্রতিমার বিয়ে (ফাল্গুন ১৩১০) হয়ে যায় রবীন্দ্রনাথের সহপাঠী নীরদনাথ মুখোপাধ্যায়ের পুত্র নীলানাথের সঙ্গে। আর বিয়ের মাত্র মাস দুয়েকের মধ্যেই গঙ্গায় ডুবে মারা যান নীলানাথ। অকালে বিধবা হন প্রতিমা। মৃণালিনী দেবীর ইচ্ছাই কিন' পূর্ণ হয় শেষ পর্যন-। রথীন্দ্রনাখ বিলেত থেকে শিক্ষা শেষ করে ফিরে এলে রবীন্দ্রনাথেরই আগ্রহে রথীন্দ্রনাথ ও প্রতিমা দেবীর বিয়ে সম্পন্ন হয় ১৪ই মাঘ ১৩১৬ (২৭/০১/১৯১০) তারিখে। প্রতিমা দেবীর বয়স তখন ১৬ আর রথীন্দ্রনাথের বয়স ২১’ (দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা, জানুয়ারি ২০০০, পৃষ্ঠা ৫)।
বর্তমানের বিখ্যাত বিশ্বভারতী একসময় ছিল ব্রাহ্মচর্যাশ্রম। এই আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৯০১ সালে। তখন রবীন্দ্রনাথ উপবীতধারী পরিপূর্ণ একজন ব্রাহ্মণ। বিদ্যালয়ের পরিবর্তে তিনি বলেন আশ্রম। ছাত্ররা কাষায়বস্ত্রধারী মুণ্ডিতমস-ক, নগ্নপদ। অধ্যাপকেরাও প্রাচীনকালের মুনি ঋষি। আশ্রমে বিদ্যাপাঠের শুরুতে হতো বৈদিক মন্ত্রপাঠ, উপাসনা ও অধ্যাপক প্রণাম। শিক্ষকেরা সকলে ব্রাহ্মণ। সে-সময় কুঞ্জলাল ঘোষ নামের একজন অব্রাহ্মণ শিক্ষক এলেন। ব্রাহ্মণবংশীয় ছাত্রগণ অব্রাহ্মণ অধ্যাপককে প্রণাম করবে না। কুঞ্জলাল বিব্রত। সব শুনে রবীন্দ্রনাথ সংহিতার দোহাই দিয়ে রায় দিলেন, না, অব্রাহ্মণ শিক্ষককে প্রণাম করা যাবে না। বেচারা কুঞ্জলাল ঘোষকে চাকরি ছেড়ে দিতে হলো। পরে ক্রমেই পরিবর্তমান রবীন্দ্রনাথ নিজেই আশ্রমের সকল সংস্কার, অতিরিক্ত শাস্ত্রসংস্কার উপড়ে ফেলে বিশ্ব বিদ্যায়তন করে গড়ে তুললেন বিশ্বভারতী।
জমিদারি পরিচালনার উদ্দেশ্যে পূর্ববঙ্গে অবস'ানের সময় ছোট গল্প কবিতা গান রচনার উজ্জ্বল সময়ে আরও একটি গভীর বোধে রবীন্দ্রনাথ আলোড়িত হয়েছিলেন - তা হলো বাউল দর্শন, বিশেষ করে শিলাইদহের লালন শাহ্‌’র দর্শনঋদ্িধ গীত কবিতায় তিনি পেয়েছিলেন সেই মহামিলনের ঐক্যের দর্শন - ‘ফাল্গুনী,’ ‘পরিত্রাণ,’ ‘প্রায়শ্চিত্ত,’ ‘অচলায়তন,’ ‘শারদোৎসব,’ ‘রাজা,’ ‘ঋণশোধ,’ ‘মুক্তধারা’ ইত্যাদি নাটকে মুক্তি ও মহামিলনের বাউল দর্শন দ্বারা প্রভাবিত। গীতাঞ্জলির গীতি কবিতায় তো বাউল চিন-ার গভীর ছাপ অনেক গবেষক দেখিয়েছেন। বিশেষ করে ঔৎ. ঊ. ঈ. উরসড়পশ তাঁর জধনরহফৎধহধঃয ঞধমড়ৎব - ঃযব মৎবধঃবংঃ ড়ভ ঃযব ইধঁষং ড়ভ ইবহমধষ প্রবন্ধে গীতাঞ্জলির কবিতায় বাউল চিন-া ও সুরের প্রভাবের কথা বলেছেন বিস-ৃত করে। অবশ্য অন্নদাশঙ্কর রায় মনে করেন, ‘তাঁর (রবীন্দ্রনাথের) উপর লালনের প্রভাব যদি পড়ে থাকে তবে ফাল্গুনিতে-গীতাঞ্জলীতে নয়। ...লালনের বেশির ভাগ গান ইংরেজিতে যাকে বলে মিস্টিক, না যাকে বলে এসোটেরিক। রবীন্দ্রনাথের কবিতা বা গান কখনো কখনো মিস্টিক, কিন' এসোটেরিক কদাপি নয়। ...তাই যদি হয় তবে রবীন্দ্রনাথের উপর বাউল প্রভাব একান- সীমাবদ্ধ। লালনের প্রভাব তো আরো কম।’৩৩ শানি-দেব ঘোষ ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত বিচিত্রা’ গ্রনে'ও এই প্রভাবের কথা বলেছেন। শানি-দেব লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের গানে যে বাউল সুরের প্রভাব লক্ষণীয়, তাও মধ্যবঙ্গের বাউলদের, পশ্চিমবঙ্গের নয়’। শিলাইদহ অঞ্চলের বাউলদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়েছিল, তাদের গানে হয়েছিলেন আলোড়িত। বিশেষ করে পূর্ববঙ্গের পদকর্তা লালন শাহ্‌, মদন, বিশা, গগন, হাসন রাজার গান তিনি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। তবে কোনো একজন মধ্য ও পূর্ব বঙ্গের বাউল বা পদকর্তাও তাঁর গল্প বা নাটকের ভরকেন্দ্রে চিত্রিত হয়নি।
রবীন্দ্রনাথ কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ার আখড়া থেকে লালনের গানের খাতা সংগ্রহ করেছিলেন। যে খাতা দুটি শানি-নিকেতনের রবীন্দ্রভবনে সংরক্ষিত রয়েছে। এই খাতা নিয়ে অনেক বিতর্ক অভিযোগ আছে । এই প্রবন্ধের প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে শুধু বলা যায়, ১৩২২-এর আশ্বিন থেকে মাঘ সংখ্যা ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘হারামণি’ বিভাগে রবীন্দ্রনাথ নিজেই লালনের কুড়িটি গান প্রকাশ করে লালন ফকিরকে বিশেষভাবে কলকাতার শিক্ষিত বাবুদের কাছে পরিচিত করে তুলেছিলেন। শিক্ষিত, শহরের বাবু, রবীন্দ্রনাথও অত্যন- রুচিবান, ইউরোপের উচ্চশ্রেণীর সৌন্দর্যতত্ত্ব, শিল্প-সাহিত্য পাঠে অভ্যস-দের কাছে লালনের ‘লোকাল টোন’ কিছু ইতরবিশেষ লাগে। তাদের ভদ্রসমাজে উচ্চারণ নিষিদ্ধ শব্দ রুচিতে আঘাত করে। রবীন্দ্রনাথ তাই লালনের গানের সেইসব কথা ‘ভদ্রসামজে উচ্চারণ করিতে কুণ্ঠাবোধ হয়’ এমন শব্দের কিছু ‘পরিমার্জন’ করে প্রকাশ করেন।
‘ছেলেভুলানো ছড়া’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ একটি প্রচলিত ছড়ায় মেয়েকে শ্বশুরবাড়ি পাঠানোর যে কঠিন অন-র্বেদনা আছে তার বিষাদময় চিত্রের আলোচনা করে ছড়াটির একটি সভ্যপাঠ তৈরি করেন। ‘কন্যাটির মুখে এসব ভাষা ব্যবহার হওয়া উচিৎ হয় না যাহা আমি অদ্য ভদ্রসমাজে উচ্চারণ করিতে কুণ্ঠাবোধ করিতেছি। তথাপি সেই ছত্রটি একেবারেই বাদ দিতে পারিতেছি না। কারণ তাহার মধ্যে ইতর ভাষা আছে বটে, কিন' তদপেক্ষা অনেক অধিক পরিমাণে বিশুদ্ধ করুণ রস আছে।’৪৮ রবীন্দ্রনাথ তার শ্রেণীর প্রতিনিধি অথবা বিবেক হয়ে ছড়াটির ইতর ভাষার কিছুটা বদল করেন।

‘বোন কাঁদেন বোন কাঁদেন খাটের খুরো ধরে
সেই যে বোন গাল দিয়েছেন স্বামীখাকী বলে।’ ৪৮

রবীন্দ্রনাথ মূল কথাটি ‘ভাতারখাকি’কে স্বামীখাকি রূপ দিয়েছেন। ‘অবাস-ব ও গালি হিসেবে অব্যবহৃত স্বামীখাকি কথাটির দ্বারা তিনি মূলের জীবন- গালিটিকে উৎখাত করে ছড়াটির একটি ভদ্রসমাজে পরিবেশযোগ্য চেহারা তৈরি করলেন’৪৯ কার স্বার্থে ? পূর্ববঙ্গের সাধারণ মুসলিম এমনকি হিন্দু পরিবারেও স্বামীর পরিবর্তে ভাতার শব্দটিও ব্যবহৃত হয়, এবং ভাতারখাকি গালিও বিরল নয় উক্ত সমাজে। সুকুমার সেন রবীন্দ্রনাথকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর সঙ্গে তুলনা করে বলেন, ‘রবীন্দ্রনাথকে সহজেই ক্ষমা করতে পারি। তিনি পণ্ডিত ঘরের ছেলে ছিলেন না, সুতরাং ব্রাহ্মণ-পণ্ডিতের ‘ভাষ’ ও ভাষার সঙ্গে তাঁর কোনো পরিচয় ছিল না এবং প্রাচীন ধরণের কথকথা তিনি কখনো শোনেননি। তাই সাধারণ্যে অবগত অনেক প্রচলিত বাংলা শব্দের সঙ্গে সেগুলির স'ানে ব্যবহৃত নব প্রচলিত সংস্কৃত শব্দের তুলনা করতে পারেননি।’ ৫০ সংস্কৃত ভর্ত্তৃ বা ভর্তা + সাং = ভাতার, তো ‘ভাতার’ শুধু ইতরজনের ব্যাকরণহীন ধ্বনি নয়। সমস্যা হলো ভাষার ওপর পণ্ডিত মোল্লার পুরোহিতগিরি। তারা তাদের হাতের জপমালা বা তসবিহ’র সীমাবদ্ধ বুলির বাইরে স্বতঃস্ফূর্ত ধ্বনি বা ভাষার প্রাকৃত প্রবাহকে গ্রহণ করতে পারেন না। ‘ভাষা জিনিসটা পণ্ডিত বা মোল্লার হাতের মোরাব্বা নহে। দেশের জলবায়ু ও আলোকে ইহা পুষ্ট হইয়া থাকে। ইহা স্বীয় জীবন- গতির পথে, ইচ্ছাক্রমে বর্জন ও গ্রহণ করিয়া চলিয়া যায়, স্বীয় ললাটলিপিতে কোনো শিক্ষকের ছাপ মারিয়া পরিচিত হইতে চায় না।’৫১ রবীন্দ্রনাথের তথাকথিত সংশোধনী মেনে কেউ ভাতারখাকি-কে স্বামীখাকি বলবে না, এই ভরসা। বাংলা ভাষাটা যে প্রাকৃত ভাষারই একটি রূপ, টোলের পণ্ডিতরা তা বরদাস- করতে পারেন না। জোর করে সংস্কৃত শব্দ এনে বাংলার সংস্কৃত রূপ দেবার চেষ্টার কথা দীনেশচন্দ্র সেনের জবানে শোনা যাক, ‘টোলের পণ্ডিতেরা এই ভাষায় অপর্য্যাপ্ত সংস্কৃত শব্দ আনয়ন করিয়া ইহার শ্রী বদলাইয়া দিয়াছেন ; এইজন্য কাহারও মনে হইতে পারে, বাঙ্গালা ভাষা সংস্কৃত হইতে উদ্ভূত হইয়াছে। সংস্কৃত যুগের পূর্ব্ব সাহিত্য, বিশেষ করে এই (মৈয়মনসিংহ) গীতিকাগুলি পাঠ করিলে সে ভুল ঘুচিয়া যাইবে। খাঁটি বাঙ্গালা যে প্রাকৃতের কত নিকট ও সংস্কৃত হইতে কত দূরবর্ত্তী তাহা স্পষ্ট হৃদয়ঙ্গম হইবে।’৫১
মানুষের মুখের স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ত শব্দ হলেও সে শব্দ যদি প্রচলিত মান বাংলা বা কলকাতার শিক্ষিতদের মুখের বুলি না হয়, রবীন্দ্রনাথ বিব্রতবোধ করেন। বাঙালি এবং বিশেষ করে বাঙালি মুসলমানের কণ্ঠে ‘খুন’ একটি বিশেষ পরিচিত শব্দ। খুন শব্দের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে অর্থ ও ব্যঞ্জনা ঝলসে ওঠে। রবীন্দ্রনাথের প্রশ্রয়ধন্য, এবং রবীন্দ্রনাথকে যিনি দেবতার আসনে বসিয়ে আক্ষরিক অর্থেই পূজা করতেন সেই কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি প্রিয় শব্দও খুন। রক্তের বদলে খুন শব্দের দ্ব্যার্থবোধক ব্যবহার নজরুল করেছেন বহুবার ; রবীন্দ্রনাথের পায়ের কাছে বসে আরবী ফার্সি উর্দু বহুল শব্দে রচিত গান বহু কবিতা শুনিয়ে কবিগুরুকে আনন্দিত করেছেন। একবার রবীন্দ্রনাথ ‘খুন’ শব্দের ওপরে বিরক্ত প্রকাশ করলেন। ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কবিতাটি রবীন্দ্রনাথকে শুনিয়েছেন নজরুল। এমনকি ‘উদিবে সে রবি আমাদেরই খুনে রাঙিয়া পুনর্বার’ গানটিও গেয়ে শুনিয়েছেন। ‘খুন’ শব্দের ব্যবহারে রবীন্দ্রনাথের বিরক্তির কথা শুনে নজরুল বলেন, ‘তিনি রক্তের পক্ষপাতী, অর্থাৎ ওই লাইনটাকে ‘উদিবে সে রবি মোদেরি রক্তে রাঙিয়া পুনর্বার’ও করা চলত, কিন' ওতে ওর অর্ধেক ফোর্স কমে যেত।’৫২ ‘পাজামা’র মধ্যে যেমন একদা দেখেছিলেন বিজাতীয়তা তেমনি খুন শব্দেও তাঁর একই কারণে আপত্তি। ১৩ ডিসেম্বর ১৯২৭-এ রবীন্দ্র পরিষদের এক সংবর্ধনা সভায় বাংলা কবিতার ‘খুন’ শব্দের ব্যবহার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘...সেদিন কোন একজন বাঙ্গালী হিন্দু কবির কাব্যে দেখলুম তিনি রক্ত শব্দের জায়গায় ব্যবহার করেছেন ‘খুন’। পুরাতন রক্ত শব্দে তাঁর কাব্যে রাঙ্গা রং যদি না ধরে তাহলে বুঝব সেটাকে তাঁরই অকৃতিত্ব।’ ‘শনিবারের চিঠি’র সজনীকান- দাস, মোহিতলাল মজুমদার প্রমুখ নজরুল-রবীন্দ্রের সুসম্পর্কে চিড় ধরাতে দীর্ঘদিন থেকে চেষ্টা করছিলেন। শনিবারের চিঠি পত্রিকায় নজরুলের গান কবিতা নিয়ে প্যারডি, ব্যঙ্গ গদ্যসহ বিষোদ্গার হতো। রবীন্দ্রনাথকেও নজরুলের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ কখনো সজনীবাবুদের কথায় কান দেননি, এখন ‘খুন’ বিষয়ে মত প্রকাশ করে তিনি নিজের অজানে-ই ধরা পড়লেন। শনিবারের চিঠি রবীন্দ্রনাথের ভাষণের ‘বাঙালি হিন্দু কবি’র বদলে শুধু বাঙ্গালী কবি লিখে প্রচার করে যে, এইবার রবীন্দ্রনাথ নজরুলকে ধরেছে। ‘বাঙ্গালার কথা’ সাময়িক পত্রের ৪ পৌষ ১৩৩৪ সংখ্যাতেও হিন্দু শব্দটি বাদ দিয়ে বাঙ্গালী কবির কথা লেখা হয়। অন্যদিকে নজরুলের সঙ্গীসাথীরাও নজরুলকে উত্তেজিত করে তোলে। নজরুল উত্তেজিত হয়ও, স্বয়ং কবিগুরু একটি শব্দকে নিয়ে এই বক্তব্য দিতে পারে ! নজরুলও বুঝে, ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ বা ‘উদিবে সে রবি...’ গানটি সেইদিনই কবিগুরুকে শুনিয়ে এসেছিলাম। তারপরই এই ভাষণ। নজরুল শেষ পর্যন- একটি দীর্ঘ প্রতিবাদ গদ্য লেখেন, শ্লেষ, দুঃখ, অহংকার, শ্রদ্ধা ভরা অসাধারণ গদ্য ‘বড়র পিরীতি বালি বাঁধ’। ‘বড়র পিরীতি’ মানে যে রবীন্দ্রনাথের স্নেহমাখা প্রশ্রয় সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। নজরুল শুধু খুন শব্দের আপত্তি নিয়ে নয়, হিন্দু জাতীয়তাবাদী মুখোশকেও আক্রমণ করেছেন এই লেখায় ‘... কবিগুরু আমায়ও বাণ নিক্ষেপ করতে ছাড়েননি। তিনি বলেছেন, আমি কথায় কথায় রক্তকে ‘খুন’ বলে অপরাধ করেছি। কবির চরণে ভক্তের সশ্রদ্ধ নিবেদন, কবি ত নিজেও টুপি-পায়জামা পরেন, অথচ আমরা পরলেই তাঁর এত আক্রোশের কারণ হয়ে উঠি কেন, বুঝতে পারিনে। এই আরবি-ফার্সি শব্দ প্রয়োগ কবিতায় শুধু আমিই করিনি। আমার বহু আগে ভারতচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ করে গেছেন। ... সম্ভ্রান- হিন্দুবংশের অনেকেই পায়জামা-শেরওয়ানি-টুপি ব্যবহার করেন, এমনকি লুঙ্গিও বাদ যায় না। তাতে তাঁদের কেউ বিদ্রূপ করে না, তাঁদের ড্রেসের নাম হয়ে যায় তখন ‘ওরিয়েণ্টাল’। কিন' ওইগুলোই মুসলমানেরা পরলে তারা হয়ে যায় ‘মিয়া সাহেব’। মৌলনা সাহেব আর নারদ মুনির দাড়ির প্রতিযোগিতা হলে কে যে হারবেন বলা মুশকিল...। আমি ত টুপি-পায়জামা-শেরওয়ানী-দাড়িকে বর্জন করে ফেলেছি শুধু ঐ ‘মিয়া সাহেব’ বিদ্রূপের ভয়েইজ্জতবুও নিস-ার নাই। এইবার থেকে আদালতকে নাহয় বিচারালয় বলব কিন' নাজির-পেশকার-উকিল-মোক্তারকে কী বলব ? ...তিনি (রবীন্দ্রনাথ) ইটালিকে উদ্দেশ্য করে কবিতা লিখেছেন। তাতে ‘উতারো ঘোমটা’ তাঁকেও বারবার ব্যবহার করতে দেখেছি। ...‘উতারো ঘোমটা’ আমি লিখলে হয়ত সাহিত্যিকদের কাছে অপরাধীই হতাম। কিন' ‘উতারো’ কথাটা যে জাতেরই হোক, ওতে এক অপূর্ব সঙ্গীত ও শ্রী’র উদ্বোধন হয়েছে ও-জায়গাটায়...। ‘খুন’ আমি ব্যবহার করি আমার কবিতায়, মুসলমানি বা বলশেভিক রং দেওয়ার জন্য নয়। হয়ত কবি ও-দুটোর একটারও রং আজকাল পছন্দ করছেন না, তাই এত আক্ষেপ তাঁর। ...আমি মনে করি, বিশ্ব-কাব্যলক্ষ্মীর একটা মুসলমানী ঢং আছে। ...স্বর্গীয় অজিত চক্রবর্তী ও-ঢংয়ের ভূয়সী প্রশংসা করে গেছেন। বাংলা কাব্যে লক্ষ্মীকে দুটো ইরানি ‘জেওর’ পরালে তার জাত যায় না, বরং তাকে আরও খুবসরতই দেখায়। আজকের কলা-লক্ষ্মীর প্রায় অর্ধেক অলঙ্কারই ত মুসলমানি ঢংয়ের। ...আমি যেখানে খুন শব্দ ব্যবহার করেছি, সে ঐ রকম ন্যাশনাল সঙ্গীতে বা রুদ্ররসের কবিতায়। যেখানে ‘রক্তধারা’ লিখবার সেখানে জোর করে ‘খুনধারা’ লিখি নাই। তাই বলে ‘রক্ত-খারাবি’ও লিখি নাই, হয় ‘রক্তারক্তি’ নাহয় ‘খুনখারাবি’ লিখেছি। কবিগুরু কেন, আজকালকার অনেক সাহিত্যিক ভুলে যান যে, বাংলার কাব্য-লক্ষ্মীর ভক্ত অর্ধেক মুসলমান। তারা তাঁদের কাছ থেকে টুপি আর চাপকান চায় না, চায় মাঝে মাঝে বেহালার সাথে সারেঙ্গীর সুর শুনতে...। এতেই মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল বলে যাঁরা মনে করেন, তাঁরা সাহিত্য-সভায় ভিড় না করে হিন্দু-সভারই মেম্বার হন গিয়ে।’ ৫২
‘শনিবারের চিঠি’ বা ‘বাঙ্গালার কথা’ সাময়িকিতে ‘হিন্দু’ শব্দ তুলে শুধু ‘বাঙ্গালী কবি’ বলে রিপোর্ট করলেও তাতে যেমন রবীন্দ্রনাথের বক্তব্যের কোনো পরিবর্তন হয় না, তেমনি নজরুলের এই প্রতিবাদ গদ্যেরও প্রয়োজনীয়তা অসার হয়ে পড়ে না। রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ভাতিজি ইন্দিরা দেবীর স্বামী রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য সাহিত্যিক প্রমথ চৌধুরী ‘বঙ্গ সাহিত্যে খুনের মামলা’ নিবন্ধে বুঝাতে চাইলেন, নজরুলকে উদ্দেশ্য করে কবিগুরু খুনের কথা বলেননি। একজন ‘বাঙ্গালী হিন্দু কবি’ আর ‘বাঙ্গালী কবি’র মধ্যে পার্থক্য কোথায় ? বরং ‘বাঙ্গালী হিন্দু কবি’ বলার মধ্যে সংকীর্ণতা রয়েছে। আর যথাযথ ওজন ও ভাবের জন্য কি ‘হিন্দু কবি’ খুন লিখতে পারে না ! রবীন্দ্রসাহিত্যে যে বিরল কয়েকটি মুসলমান চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে যেমন হবির খাঁ, অছিমদ্দি, জুলিখা প্রমুখ কারও সংলাপ বা মুখের ভাষাতে মুসলমান বাঙালি পরিবারে ব্যবহৃত কোনো শব্দ নাই। চরিত্রের জীবন- হয়ে ওঠা, গল্পের ভিতরে তার স্বাভাবিক বিকাশের জন্য, শিল্পের স্বার্থে চরিত্রের মুখের স্বাভাবিক বুলিই দিতে হবে। কিন' রবীন্দ্রনাথ এই স্বাভাবিকতা তৈরিতে কুণ্ঠিত। হবির খাঁ যখন লেখকের বর্ণনার মধ্যে থাকেন তখন একরকম, যখন সংলাপ বলেন, তখনি তার কৃত্রিমতা কানে বাজে। রবীন্দ্রনাথ নিজে ‘বাঙ্গালী হিন্দু কবি’ বলে এই অপারগতা ! ‘শাসি-’ গল্পের নিম্নবর্ণের অতি দরিদ্র দুখিরাম রুই, ছিদাম রুই আর চন্দরার মুখের ভাষা, প্রয়োজনীয় ডিটেল বা প্রতিবেশ বর্ণনায় তিনি বেশ সফল। শাসি-র জীবন ও পরিবেশ রবীন্দ্রনাথের দর্শন ও অভিজ্ঞতার অতীত ছিল।
বাংলা বাঙালির ভাষা। সেই বাঙালি হিন্দু মুসলমান খৃস্টান বৌদ্ধ ইত্যাদি হতে পারে। জীবনযাপনের প্রাত্যহিকতায় ধর্মীয় সংস্কার, আচার ব্যবহার, শাস্ত্র পাঠও স্বাভাবিক। পুরাণ ও দেব দেবী সংশ্লিষ্ট শব্দ, ভাব ও ভাষা জীবনে ব্যবহৃত হয়, মুসলমানের ক্ষেত্রেও তাই। তো একদিকে সংস্কৃত অন্যদিকে আরবী ফার্সি শব্দের প্রবেশ অনুপ্রবেশের ঘটনা স্বাভাবিক। এই স্বাভাবিকতাকে প্রতিহত, অথবা জোর ভাষার স্বাসে'্যর অনুকূল নয়, ভাষা তা গ্রহণ করে না। প্রশাসনিক বা অ্যাকাডেমকি সিদ্ধান- দিয়ে ভাষা সৃষ্টি বা বদল করা যায় না। সংস্কৃত যুগের পূর্বের মতো আরবী ফার্সি প্রবেশের পূর্বেও বাংলা প্রাকৃত প্রবাহে ছিল। দীনেশ চন্দ্র সেন গবেষণা করে বলেছেন, ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের যাহা শ্রেষ্ঠ সম্পদ, তাহা দ্বারা সংস্কৃতপূর্ব্ব যুগই তাহাকে মণ্ডিত করিয়াছিল। সেই যুগেই গোরক্ষনাথের অমরালেখ্য অঙ্কিত হয়, সেই যুগেই বেহুলা ও মালঞ্চমালার ন্যায় রমণীতিলকেরা বঙ্গসাহিত্যের কিরীট উজ্জ্বল করিয়াছিলেন। সেই সময়েই কালু ডোম, কালকেতু ও চাঁদ সদাগরের ন্যায় মৌলিক, একব্রত অটল চরিত্রগুলি এই সাহিত্যের বিভূষণ হয়।’৫২ রবীন্দ্রনাথ বাঙালি কবির ‘খুন’ শব্দ ব্যবহারে ক্ষেপে সংস্কৃত রক্ত ব্যবহারের নসিহত করেন ইতিহাসের যে পাঠ ও অনুধাবন থেকে, সেখানেই ভাষার স্বাভাবিক প্রকাশের প্রবহমানতাকে ক্ষুণ্ন করে। ভারতীয় পুরাণের এবং সংস্কৃত ভাষার শব্দ যেমন হিন্দু মুসলমানের নিজস্ব শব্দ হয়ে উঠেছে, তেমনি বাংলা ভাষায় প্রচলিত আরবী ফার্সি শব্দও তাই। বঙ্কিমচন্দ্র, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, দীনেশ চন্দ্র সেন, মীর মোশারফ হোসেন, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ প্রাকৃত বাংলার সঙ্গে সংস্কৃত, আরবী, ফার্সি শব্দ অসাধারণ শিল্প নৈপুণ্যে ব্যবহার করেছেন। তুলনায় রবীন্দ্রনাথ রক্ষণশীল। বাংলায় আত্তিকৃত আরবী ফার্সি শব্দ সরিয়ে সংস্কৃত শব্দ ব্যবহার এবং প্রচলনের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে তিনি অ্যাকাডেমিক প্রয়াস চালিয়েছিলেন। পূর্ব বঙ্গের তমুদ্দিনের প্রয়াসের মতো ব্রাহ্মণ্য প্রয়াসও ব্যর্থও হয়েছে। ‘গত পাঁচ ছয় শত বছরের মধ্যে বাঙ্গালা ভাষাটা হিন্দু ও মুসলমান উভয়েরই হইয়া গিয়াছে। মুসলমানদের ধর্মশাস্ত্র ও সামাজিক আদর্শ অনেকটা আরবি ও পারসি সাহিত্যে লিপিবদ্ধ, সেই সাহিত্যের জ্ঞান তাঁহাদের নিত্যকর্ম্মের জন্য অপরিহার্য্য। আমাদের (হিন্দুদের) যেরূপ সংস্কৃতের সহিত সম্বন্ধ, আরবি ও পারসির সঙ্গে তাহাদেরও কতকটা তাই। ...কিন' হিন্দু লেখকগণ মুখে যে সকল কহিয়া থাকেন, সংস্কৃতের ঘোর প্রভাবের বশবর্ত্তী হইয়া লিখিবার সময় সেগুলি অন্যরূপ করিয়া ফেলেন। শতবার কথিত ও শ্রুত ‘খাজনা’ তাঁহাদের লেখনীতে ‘রাজস্ব’ রূপে পরিণত হয়জ্জচিরাচরিত ‘ইজ্জৎ’ সম্মান হইয়া দাঁড়ায়, ... এবং আরও শত শত নিত্যকথিত বিদেশী শব্দ, যাহাদের অসি'মজ্জা বাঙ্গালার জলবায়ুতে দেশীয় রূপ ধারণ করিয়াছে, তাহারা লিখিত সাহিত্যে সংস্কৃত আগন'কের নিকট নিজেদের স'ান ছাড়িয়ে দিতে বাধ্য হইয়া থাকে।’ ৫২ এই বিষয় ভিন্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধের, আপাতত এই নাতিদীর্ঘ ভূমিকা শুধু ‘মরণশরণ কিম্বা যবননিধন / যবননিধন কিম্বা মরণশরণের মুগ্ধ শ্রোতা কিশোর রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে বিশাল বৃহৎ হয়ে উঠলেও যবনের জীবনকে যেমন সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা করেন না, তেমন যবনের ভাষা নিয়েও কটাক্ষ করতে কুণ্ঠিত হন না তার প্রাসঙ্গিকতা বিবেচনা করে এই প্রসঙ্গের অবতারণ করা।
আদি ব্রাহ্ম সমাজের অধিপতি ‘হিন্দু ব্রাহ্ম’ মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের আটটি বড় হয়ে ওঠা পুত্র সন-ানের মধ্যে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন অধিক পিতৃ অনুগত। অনুগত পুত্রের জন্য মহর্ষি পিতাও করেছেনজ্জমাত্র বারো বছরের কিশোর রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গেছেন হিমালয়ের বক্রোটা পর্বত শিখরে। ব্রাহ্ম হয়েও বড় উৎসব করে জাত কুলের স্মারক ‘পৈতা’ চড়িয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের কানি-মান শরীরে। তার আগে রবীন্দ্রনাথের অন্নপ্রাশনের সময়ও তিনি করেছেন ব্যতিক্রমী উৎসব। রবীন্দ্রনাথের দিদি সৌদামিনী দেবী ‘পিতৃস্মৃতি’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘রবির অন্নপ্রাশনের যে পিঁড়ার উপরে আলপনার সঙ্গে তাহার নাম লেখা হইয়াছিল, সেই পিঁড়ির চারিধারে পিতার আদেশে ছোট ছোট গর্ত করানো হয়। সেই গর্তের মধ্যে সারি সারি মোমবাতি বসাইয়া তিনি আমাদের তাহা জ্বালিয়া দিতে বলিলেন। নামকরণের দিন তাহার নামের চারিদিকে বাতি জ্বলিতে লাগিল।’ ৫৩
বাতির কিরণে রবীন্দ্রনাথ নামটি উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হয়ে ওঠে। আর ওই প্রদীপের গভীর তলাতে জমে থাকে সামান্য অন্ধকার। এই অন্ধকার আলোর সমালোচনা নয়, আলোর প্রমাণও।

্র

সূত্রনির্দেশ

১। হিন্দুমুসলমান, কালান-র, রবীন্দ্র রচনাবলী, দ্বাদশ খণ্ড, বিশ্বভারতী, কলিকাতা ১৪০২, পৃষ্ঠা ৬২০।
২। ঐতিহাসিক চিত্র, আধুনিক সাহিত্য, রবীন্দ্র রচনাবলী পঞ্চম খণ্ড, বিশ্বভারতী, কলিকাতা ১৪০২, পৃষ্ঠা ৫৯৯।
৩। গ্রন'পরিচয়, গল্পগুচ্ছ, বিশ্বভারতী, কলিকাতা, পৃষ্ঠা ৮৭৯।
৪। ঐ পৃষ্ঠা ৮৫৫।
৫। মুসলমান রাজত্বের ইতিহাস, আধুনিক সাহিত্য, রবীন্দ্র-রচনাবলী পঞ্চম খণ্ড, বিশ্বভারতী, কলিকাতা ১৪০২, পৃষ্ঠা ৫৯১।
৬। কালান-র, কালান-র, রবীন্দ্র-রচনাবলী দ্বাদশ খণ্ড, বিশ্বভারতী, কলিকাতা ১৪০২, পৃষ্ঠা ৫৩৭।
৭। গ্রন'পরিচয়, গল্পগুচ্ছ, বিশ্বভারতী, কলিকাতা, পৃষ্ঠা ৮৬০।
৮। হিন্দুমেলার ইতিবৃত্ত, যোগেশচন্দ্র বাগল, মৈত্রী, কলিকাতা ১৯৬৮, পৃষ্ঠা ৭।
৯। মনোমোহন বসু বক্তৃতামালা থেকে এই উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন গবেষক গোলাম মুরশিদ তাঁর রবীন্দ্রবিশ্বে পূর্ববঙ্গ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৩ গ্রনে', পৃষ্ঠা ২৪।
১০। রবীন্দ্রবিশ্বে পুর্ববঙ্গ, পূর্ববঙ্গে রবীন্দ্রচর্চা, গোলাম মুরশিদ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ২৬।
১১। জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নাটক সমগ্র, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ ২০০২ গ্রনে' ‘নাটকসমগ্র ঃ পটকথা’ ভূমিকা-নিবন্ধে ‘জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি,’ বসন-কুমার চট্টপাধ্যায় থেকে উদ্ধৃত।
১২। ঐ পৃষ্ঠা ২০।
১৩। পুরুবিক্রম, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নাটক সমগ্র, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ ২০০২, পৃষ্ঠা ১৮।
১৪। ঐ পৃষ্ঠা ১৯।
১৫। ঐ পৃষ্ঠা ১০১।
১৬। ঐ পৃষ্ঠা ১০২।
১৭। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবনস্মৃতি থেকে উদ্ধৃত, নাটকসমগ্র ঃ পটকথা ভূমিকা নিবন্ধে উল্লিখিত হয়েছে পূর্বোক্ত গ্রনে', পৃষ্ঠা ২৪।
১৮। জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্ররচনাবলী নবম খণ্ড, বিশ্বভারতী, কলিকাতা, ১৪০২।
১৯। রুদ্রচণ্ড, রবীন্দ্ররচনাবলী চতুর্দশ খণ্ড, বিশ্বভারতী, কলিকাতা, ১৪০২, পৃষ্ঠা ৬৪৪।
২০। ঐ পৃষ্ঠা ৬৪৬।
২১। অশ্রুমতী ঃ জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নাটকসমগ্র, সাহিত্য সংসদ, কলিকাতা, ২০০২, পৃষ্ঠা ১১৩।
২২। নাটকসমগ্র ঃ পটকথা, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ নাটকসমগ্র, প্রথম খণ্ড, সাহিত্য সংসদ, কলিকাতা, ২০০২, পৃষ্ঠা ২৭।
২৩। ঐ পৃষ্ঠা ১০১।
২৪। জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্র রচনাবলী নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৩।
২৫। ঐ পৃষ্ঠা ৪৬৬।
২৬। গ্রন' পরিচয়, রবীন্দ্র রচনাবলী নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭০৪।
২৭। হিন্দুর মুসলমানী পরিচ্ছদ কেন ? নির্বাচিত প্রবন্ধ, শ্রী নারদচন্দ্র চৌধুরী, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, পৃষ্ঠা ২২০।
২৮। ঐ পৃষ্ঠা ২২১।
২৯। জীবনস্মৃতি, রবীন্দ্র রচনাবলী নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬৮।
৩০। কালান-র, কালান-র, রবীন্দ্র রচনাবলী দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৩৮।
৩১। ভগ্নহৃদয়, রবীন্দ্র রচনাবলী চতুর্দশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪৭।
৩২। লালন ফকির ও তাঁর গান, অন্নদাশঙ্কর রায়, মিত্র ও ঘোষ, কলিকাতা, আশ্বিন ১৪০২ (২য় মুদ্রণ), পৃষ্ঠা ৪৩।
৩৩। ঐ পৃষ্ঠা ৪১।
৩৪। ঐ পৃষ্ঠা ৩৯।
৩৫। ‘খৃষ্ট’ গ্রন' পরিচিতি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্র রচনাবলী চতুর্দশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৪৩।
৩৬। রবীন্দ্রোত্তর তৃতীয় প্রজন্মে রবীন্দ্র মূল্যায়ন, ইদানীং আমরা, আহমদ শরীফ, মুক্তধারা, ঢাকা, ১৩৯৩, পৃষ্ঠা ১১২।
৩৭। ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ, অমিতাভ চৌধুরী, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা, ১৪০০, পৃষ্ঠা ২।
৩৮। জমিদার রবীন্দ্রনাথ, অমিতাভ চৌধুরী একত্রে রবীন্দ্রনাথ, দেশ পাবলিশিং, কলকাতা, ১৩৯০, পৃষ্ঠা ২৭৯।
৩৯। রায়তের কথা, রবীন্দ্র রচনাবলী দ্বাদশ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫৪, ৬৫৫ এবং ৬৫৬।
৪০। বাংলা বিভাজনের অর্থনীতি-রাজনীতি, সুনীতি কুমার ঘোষ, নিউ হরাইজন বুক ট্রাস্ট, কলকাতা, ২০০১, পৃষ্ঠা ৪১।
৪১। গোরা, রবীন্দ্র-উপন্যাস সংগ্রহ, বিশ্বভারতী ১৯৯০, পৃষ্ঠা ৭৯৪।
৪২। হিন্দু ব্রাহ্ম, গ্রন' পরিচয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্র রচনাবলী নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭২৪-৭২৭।
৪৩। দেবেন্দ্রনাথের পত্রাবলী, জানুয়ারি ১৮৬৩ তারিখের পত্র, পৃষ্ঠা ৩৮ এবং পৃষ্ঠা ৪৯।
৪৪। রবীন্দ্রনাথের তিনকন্যা, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়. মিত্র ও ঘোষ, কলিকাতা, ১৪০৭, পৃষ্ঠা ৮০।
৪৫। ঐ পৃষ্ঠা ৭৯।
৪৬। ঐ পৃষ্ঠা ১০৫।
৪৭। পরিজন-পরিবেশে রবীন্দ্র-বিকাশ, সুকুমার সেন, কলকাতা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৬২, পৃষ্ঠা ১০-১১।
৪৮। ছেলেভুলানো ছড়া-১, লোকসাহিত্য, রবীন্দ্র রচনাবলী, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬৪।
৪৯। লোকসংস্কৃতির নন্দনতত্ত্ব, পবিত্র সরকার, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ১৯৯৬, পৃষ্ঠা ১১।
৫০। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী’র বাংলা ভাষা প্রবন্ধ সম্পর্কে সুকুমার সেন এই মন-ব্য করেন। প্রাসঙ্গিক তথ্য, বাংলা ভাষা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনা-সংগ্রহ দ্বিতীয় খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস-ক পর্ষৎ ২০০০, পৃষ্ঠা ৫৬৭।
৫১। মৈমনসিংহ-গীতিকার ভূমিকা, দীনেশচন্দ্র সেন, মৈমনসিংহ গীতিকা, সম্পাদক সৈয়দ আজিজুল হক, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ৩১৭-৩২১ (যত্রতত্র)।
৫২। বড়র পিরীতি বালির বাঁধ, নজরুল-রচনাবলী ৪র্থ খণ্ড, বাংলা একাডেমী, ঢাকা ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ২৬-২৮।
৫৩। গ্রন' পরিচয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্র রচনাবলী নবম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৯১।

রবীন্দ্রনাথের বিবাহ-ভাবনা ও তিন কন্যা সমম্প্রদান


সাদ কামালী

চন্দ্রনাথ বসু একজন ভাবুক জ্ঞানবান পণ্ডিত মানুষ। তাঁর ‘শকুন্তলা’ সমালোচনায়
রবীন্দ্রনাথ ‘আশ্চর্য প্রতিভার পরিচয়’ পেয়েছিলেন। এই পণ্ডিত চন্দ্রনাথ বসু ‘হিন্দুপতড়বী’
এবং ‘হিন্দুবিবাহের বয়স ও উদ্দেশ্য’ নামে দু’টি আলোচিত প্রবন্ধ লেখেন। উক্ত প্রবন্ধে
হিন্দুবিবাহের ‘আধ্যাত্মিকতা’, ‘হিন্দুদম্পতির একীকরণতা’ এবং ‘বাল্যবিবাহ’ সম্বন্ধে
তিনি প্রা শাস্ত্র ও ধর্মমতের সঙ্গে একমত হয়েও নিজের মত বিস্তৃতভাব লেখেন। তখন
কয়েকটি ‘কাগজেও অবিশ্রান্ত প্রতিধ্বনিত’ হতে থাকে শ্রী চন্দ্রনাথ বসুর মত।
‘খ্যাতনামা গুণী ও গুণজ্ঞ লেখক শ্রীযুক্ত’ অক্ষয়কুমার সরকারও উক্ত প্রবন্ধদ্বয়ের কিছু
কিছু বিষয় নিয়ে চন্দ্রনাথ বাবুর প্রশংসা ও কিছু সমালোচনা করে প্রবন্ধ লেখেন। মানুষের
শরীর, মন ও সমাজের মঙ্গল সম্পর্কিত প্রায় সব বিষয়েই অত্যন্ত সংবেদনশীল রবীন্দ্রনাথ
যেমন বরাবর নিজের মত পরিষ্কার করে প্রকাশ করেন, এ-ক্ষেত্রেও তার ব্যতিμম ঘটল
না। সময়টা বাংলা ১২৯৪ সন, সায়ান্স অ্যাসোসিয়েশন হলে রবীন্দ্রনাথ উক্ত প্রবন্ধ দু’টি
অবলম্বন করে হিন্দুবিবাহ, বাল্যবিবাহ সম্পর্কে সুদীর্ঘ প্রবন্ধ পাঠ করেন। চন্দ্রনাথ বাবুর
ধর্ম, শাস্ত্র প্র া সমর্থিত মতের বিপক্ষে রবীন্দ্রনাথ ইতিহাস, যুক্তি, যুগের প্রয়োজন ও
কল্যাণ বিবেচনা সাপেক্ষে নিজের মত ‘হিন্দুবিবাহ’ নামক প্রবন্ধে অত্যন্ত জোরের সঙ্গে
প্রকাশ করতে সক্ষম হন। কালের বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথের ওই মত ছিল সাহসী ও
অগ্রবর্তী। ‘রবীন্দ্রনাথের বিবাহভাবনা ও তিন কন্যা সমপ্রদান’ প্রবন্ধের প্রয়োজনে
রবীন্দ্রনাথের ‘হিন্দুবিবাহ’ থেকে প্রয়োজনীয় মতটুকু যাচাই করে দেখা হবে ;
সামগ্রীকভাবে হিন্দুবিবাহ বিষয়ে চন্দ্রনাথ বাবুর মতের পক্ষে সামাজিক সাড়া রবীন্দ্রনাথকে
উদ্বুদ্ধ করে হিন্দুবিবাহ বিষয়ে নিজের মত প্রকাশ করায়। ‘বঙ্গসাহিত্যের শীর্ষস্থানীয় বলিয়া
গণ্য’ কেউ কেউ এবং ‘সাধারণের শ্রদ্ধার পাত্র’ কোন কোন পণ্ডিতবর্গও যখন হিন্দুবিবাহ
নিয়ে আলোচনা শুরু করেন তখন রবীন্দ্রনাথেরও উদ্বিগড়ব হওয়ার কারণ ঘটে, কারণ তাঁদের
আলোচনায় শাস্ত্রসম্মত ঐতিহাসিকতা বা বিজ্ঞানসম্মত উপযোগিতার বিষয়ে বড়ো-
একটা-কিছু বলেন নাই, ‘কেবল সূক্ষ্মযুক্তি ও কবিত্বময় ভাষা প্রয়োগ করিয়া হিন্দুবিবাহের
পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিকতা সপ্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। হিন্দুসভ্যতার ইতিহাসে
μমে μমে হিন্দুবিবাহের বিস্তর রূপান্তর ঘটিয়াছে⎯ইহার মধ্যে কোন্‌ সময়ের বিবাহকে
যে তাঁহারা হিন্দুবিবাহ বলেন তাহা ভালোরূপ নির্দেশ করেন নাই। যদি বঙ্গদেশের
উচ্চবর্ণের মধ্যে প্রচলিত বর্তমান বিবাহকে হিন্দুবিবাহ বলেন, তবে প্রাচীন শাস্ত্র হইতে
তাহার পবিত্রতা ও আধ্যাত্মিকতা প্রমাণ করিবার চেষ্টা কেন। ... সেকালের শাস্ত্রোক্তি
এখন প্রয়োগ করিলে অনেক সময়ে চোখে ধুলা দেওয়া হয়। হিন্দুবিবাহের পবিত্রতা
সম্বন্ধে যদি কেহ বৈদিক বচন উদ্ধৃত করেন তাহার জানা উচিত যে, বৈদিক কালে স্ত্রীপুরুে
ষর সামাজিক ও গার্হস্থ্য অবস্থা আমাদের বর্তমান কালের ন্যায় ছিল না। যিনি
হিন্দুবিবাহের পক্ষে পুরাণ ইতিহাস উদ্ধৃত করেন, তিনি এক মহাভারত সমস্ত পড়িয়া
দেখিলে অকূল সমুদ্রে পড়িবেন। মহাভারতের নানা কাহিনীতে বিবাহ সম্বন্ধীয় নানা
বিশৃঙ্খলা বর্ণিত হইয়াছে ; ঐতিহাসিক পদ্ধতি-অনুসারে তাহার ভালোরূপ সমালোচনা ও
কালাকাল নির্ণয় না করিয়া কোনো কথা বলা উচিত হয় না। যিনি মনুসংহিতার দোহাই
দেন তাঁহার প্রতি আমার গুটিকতক বক্তব্য আছে। ... মনুসংহিতা যে-সমাজের সংহিতা
সে-সমাজের সহিত আমাদের বর্তমান সমাজের মূলগত প্রভেদ। শিক্ষার ঐক্য নাই অথচ
সমাজের ঐক্য আছে, ইহা প্রমাণ করিতে বসা বিড়ম্বনা’ (হিন্দুবিবাহ, রবীন্দ্র-রচনাবলী,
ষষ্ঠ খণ্ড, বিশ্বভারতী বৈশাখ ১৩৯৫, পৃষ্ঠা ৬৫৭)। সমাজ বা পরিবারের মঙ্গলার্থে কালের
প্রয়োজন সাপেক্ষে শাস্ত্রের ঐতিহাসিকতা বিবেচনা করে হিন্দুবিবাহের নিয়মাবলী ঠিক
করার পক্ষে রবীন্দ্রনাথ। শাস্ত্রের প্রাচীন সম্পূর্ণ অনুসরণের বিপক্ষে তিনি, চন্দ্রনাথ বাবু
যখন প্রাচীন শাস্ত্রের দোহাই দিয়ে বলেন, ‘প্রাচীন সমাজে স্ত্রীলোকের সবিশেষ সসম্মান
ছিল’ (ঐ, পৃষ্ঠা ৬৫৯) তখন রবীন্দ্রনাথ দেখতে পান ‘শাস্ত্রে স্ত্রীলোকের অসম্মানেরও
প্রমাণ আছে’ (ঐ)। তিনি বলেন, ‘মনুসংহিতায় স্ত্রীনিন্দাবাচক যে-সকল শে−াক আছে
তাহা উদ্ধৃত করিতে লজ্জা ও কষ্ট বোধ হয়’ (ঐ)। অতঃপর রবীন্দ্রনাথ সংহিতার নবম
অধ্যায়ের চতুর্দশ, পঞ্চদশ, ষোড়শ, সপ্তদশ ও অষ্টদশের শে−াক পাঠ করে দেখতে বলেন,
এবং হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধে তিনি কিছু নজির হিসেবে পেশও করেন। শুধু সংহিতা নয়,
মহাভারতের স্বয়ং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির ও ভীষ্মদেবের স্ত্রীচরিত্র সম্বন্ধে তুমুল নিন্দার উলে−খ
করে বলেন, ‘বর্তমান সমাজে তাহার সমগ্র ব্যক্ত করিবার যোগ্য নহে’ (ঐ)। কিন্তু
পণ্ডিতবর্গ, বিশেষ করে পণ্ডিত শ্রীযুক্ত কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য ‘ভারতবর্ষের ধর্মপ্রণালী’ প্রবন্ধে
যখন বলেন, ‘মনু প্রভৃতি ধর্মশাস্ত্রকারেরা যাহা কিছু উপদেশ করিয়াছেন, সমাজই সেসকে
লর কেন্দ্রস্থান, সমাজের কল্যাণ লক্ষ্য করিয়া সেই সকল ব্যবস্থার সৃষ্টি করা
হইয়াছে।’ সমাজের মঙ্গল প্রশেড়ব হিন্দুবিবাহের বিষয়ে তখন রবীন্দ্রনাথের মত অত্যন্ত
যুক্তিপূর্ণ হয়ে ওঠে, ‘সমাজের মঙ্গল যদি বিবাহের প্রধান উদ্দেশ্য হয়, পারত্রিক বা
আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য যদি তাহার না থাকে বা গৌণভাবে থাকে, তবে বিবাহ সমালোচনা
করিবার সময় সমাজের মঙ্গলের প্রতিই বিশেষ দৃষ্টি রাখিতে হইবে। এবং যেহেতু
সমাজের পরিবর্তন হইয়াছে এবং নানা বিষয়ে জ্ঞানের বৃদ্ধি হইতেছে, অতএব সমাজের
মঙ্গলসাধক উপায়েরও তদনুসারে পরিবর্তন আবশ্যক হইতেছে। পুরাতন সমাজের নিয়ম
সকল সময় নূতন সমাজের মঙ্গলজনক হয় না। অতএব আমাদের বর্তমান সমাজে
বিবাহের সকল প্রাচীন নিয়ম হিতজনক নয় কি না তাহা সমালোচ্য’ (ঐ, পৃষ্ঠা ৬৭৭)।
বয়সের সীমা সম্পর্কে মনু যে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছিলেন, চন্দ্রনাথ বাবু তার পক্ষে প্রবল
ওকালতি করলেও রবীন্দ্রনাথ একমত হতে পারেন না। পুরুষের ২৪ হতে ৩০-এর মধ্যে
বয়স-সীমা তিনি মেনে নিলেও যৌবনপূর্ব ৮ হতে ১২-র মধ্যে বালিকাবিবাহর তীব্র
সমালোচনা করেন রবীন্দ্রনাথ। দাঁত ওঠা মাত্র খুব শক্ত জিনিস খেতে দেওয়া দাঁতের
স্বাস্থ্যের জন্যই ভালো নয়, তেমনই যৌবন সঞ্চার হওয়ামাত্র স্ত্রী-পুরুষ সন্তান জন্মদানে
যোগ্য হয়ে ওঠে না। এক্ষেত্রে তিনি বিজ্ঞানের মত ও সমাজের মঙ্গলচিন্তা করে বলেন,
‘ইহা স্বীকার করিতেই হইবে যে, অভিজ্ঞ বৈজ্ঞানিক মান্য ব্যক্তিগণ কারণ দর্শাইয়া
২
বলিয়া থাকেন যে, যৌবনারম্ভ হইবামাত্রই অপত্যোৎপাদন স্ত্রী, পুরুষ এবং সন্তানের
শরীরের পক্ষে ক্ষতিজনক’ (ঐ, ৬৬৭)। বিজ্ঞানের মতই রবীন্দ্রনাথের মত। বলেন,
‘বৈজ্ঞানিক বিষয়ে বৈজ্ঞানিক পণ্ডিতদের কথায় যদি কর্ণপাত না করি তবে সত্য সম্বন্ধে
কিছু কিনারা করা দুর্ঘট’ (ঐ)। হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধ পাঠ সভার সভাপতি ডাক্তার মহেন্দ্রলাল
সরকার মহাশয়ও বিজ্ঞানের মতে আস্থা রেখে বক্তব্য দেন। এবং রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রবন্ধে
সভাপতির মতের প্রতিধ্বনি করেন। এই বিষয়ে শ্রদ্ধাস্পদ পণ্ডিত অক্ষয়বাবুকে উদ্ধৃত
করেন,⎯‘আসুন না, সকলে মিলিয়া আমরা বালকবিবাহের কার্যত প্রতিবাদ করি।
করিলে বালবৈধব্যের প্রতিরোধ করা হইবে। যাহার বিবাহ হয় নাই সে বিধবা হইয়াছে এ
বিড়ম্বনা আর দেখিতে হইবে না। ... যিনি যেরূপ শাস্ত্রব্যাখ্যা করুন কন্যার বয়সও
বাড়াইতেই হইবে।’ ‘কিশোর বালকের সহিত অপোগণ্ড বালিকার বিবাহ অন্যায়’
অক্ষয়বাবুর এই মতের মতো রবীন্দ্রনাথও মনে করেন, তবে তিনি অক্ষয়বাবুর ‘কার্যত
প্রতিবাদ’ বা ‘প্রতিরোধ’-এর কথা বলেন না, বলেন ভিনড়বভাবে কিছুটা
নিম্নস্বরে⎯সভাসমিতি করে কাগজে লিখে বা বলপূর্বক বাল্যবিবাহ উঠানো যাবে না,
তিনি মনে করেন, ‘যাঁহারা আইন করিয়া জবরদস্তি করিয়া এই প্র া উঠাইতে চান,
তাঁহারা এ প্র াকে নিতান্ত স্বতন্ত্র করিয়া লইয়া দুই একটি ফলাফলমাত্র বিচার
করিয়াছেন, হিন্দুসমাজের বাল্যবিবাহের আনুষঙ্গিক অন্যান্য প্রা তাঁহারা দেখেন নাই।
সামাজিক অন্যান্য সহকারী-নিয়মের মধ্য হইতে বাল্যবিবাহ বলপূর্বক উৎপাটন করিলে
সমাজে সমূহ দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার প্রাদুর্ভাব হইবে’ (ঐ, পৃষ্ঠা ৬৭৭)। আইন করে
বাল্যবিবাহ বন্ধ করা হলে কি উপায়ে সমাজে ‘সমূহ দুর্নীতি’, ‘সমাজের সমূহ অনিষ্ট’ ও
‘বিশৃঙ্খলার প্রাদুর্ভাব’ হবে সে-বিষয়ে তিনি অন্য প্রসঙ্গের মতো ব্যাখ্যা করেননি। শিক্ষার
প্রভাবে ধীরে ধীরে যুগের উপযোগিতা সূত্রে বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে বলেই তিনি বিশ্বাস
করতেন। রবীন্দ্রনাথের এই ভাষণের বহু পূর্বেই বিদ্যাসাগর মহাশয় বাল্যবিবাহের পক্ষের
যুক্তি, রবীন্দ্রনাথ কথিত ‘দুর্নীতি’ বিশৃঙ্খলার যুক্তি খণ্ডন করেই ‘বাল্যবিবাহের দোষ’
প্রবন্ধে অবিলম্বে এই অনুচিত বিয়ে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়
বাল্যপরিণয় প্র ার অবর্তমানে ‘বালকবালিকাদের দুষ্কর্মাসক্ত’ হবার সম্ভাবনা যদি ঘটে তা
থেকে উদ্ধারের পথ পরিষ্কার বুঝিয়ে দেন, ‘যদি বাল্যকালাবধি বিদ্যার অনুশীলনে সর্বদা
মন নিবিষ্ট থাকে, তাহা হইলে কদাপি দুষিঙঊয়াপ্রবৃত্তির উপস্থিতিই হয় না। কারণ, বিদ্যা
দ্বারা ধর্মাধর্মে ও সদসৎ কর্মে প্রবৃত্তি-নিবৃত্তি-বিচার জন্মে এবং বিবেকশক্তির প্রাখর্য বৃদ্ধি
হয়’ (বিদ্যাসাগর রচনাবলী, পৃষ্ঠা ৬৮৪)। চন্দ্রনাথ বসুর বিবাহ সম্পর্কিত মতের
সমালোচনায় অনেক পণ্ডিতবর্গের মত উদ্ধৃত করলেও রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরকে কখনো
স্মরণ করেন না। যদিও রবীন্দ্রনাথের হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধের অধিকাংশ সুচিন্তিত মতের
সঙ্গেই বিদ্যাসাগরেরও মিল রয়েছে। হয়তো এজন্য যে, বিদ্যাসাগর প্রচলিত
বিবাহনিয়মকে যে দণ্ডে দণ্ডিত করতে চান, রবীন্দ্রনাথ সেখানে সমন্বয় সমঝোতার পথ
খোঁজেন। ‘অনন্তর সর্বদেশে এই বিবাহের প্র া পূর্বপূর্বাপেক্ষা উত্তরোত্তর উৎকৃষ্ট হইয়া
আসিতেছে। অস্মদ্দেশে উত্তরোত্তর উৎকৃষ্ট হওয়া দূরে থাকুক, বরং এমত নিকৃষ্ট হইয়াছে
যে, যথার্থ বিবেচনা করিলে স্পষ্ট বোধ হইবে, বর্তমান বিবাহনিয়মই অস্মদ্দেশের
সর্বনাশের মূল কারণ’ (ঐ, পৃঃ ৬৮০)। রবীন্দ্রনাথের সমন্বয়ের পথে এমন ‘যথার্থ
বিবেচনা’ বিবেচ্য হয় না।
হিন্দুবিবাহ বাল্যবিবাহ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের এই মতপ্রকাশ হয়েছিল বাংলা ১২৯৪ বা
ইংরেজি ১৮৮৭ সনে। রবীন্দ্রনাথ তখন ২৬ বছরের যুবক। তাঁর স্ত্রীর বয়স তখনো ১৪
হয়নি। কবিপতড়বী মৃণালিনী দেবীর জন্ম ১৮৭৪-এর ১ মার্চ। হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ
‘শরীরতত্ত্ব সম্বন্ধে মস্ত পণ্ডিত’ ডাক্তার কার্পেণ্টার-এর মতো বিশেষজ্ঞের মতের ওপর
জোর দিয়ে এবং সাক্ষী মেনে চন্দ্রনাথ বসুর উচিৎ সমালোচনা করেন। ডাক্তার
কার্পেণ্টার-এর মতে ১৩ হইতে ১৬ বৎসরের মধ্যে স্ত্রীলোকদের যৌবনলক্ষণ প্রকাশ
হইতে আরম্ভ করে। ‘যৌবনারম্ভে স্ত্রী-পুরুষের জননেন্দ্রিয় সকলের বিকাশ লক্ষণ দেখা
দিবামাত্র যে বুঝিতে হইবে যে, উক্ত ইন্দ্রিয় সকল সম্পূর্ণ ব্যবহারযোগ্য হইয়াছে তাহা
নহে, তাহা কেবল পূর্ববর্তী আয়োজন মাত্র। নরনারী যখন সর্বাঙ্গীণ পরিস্ফুটতা লাভ করে
হিসাবমতে তখনই তাহারা জাতিরক্ষার জন্য জননশক্তি প্রয়োগ করার অধিকারী’ (ডাক্তার
কার্পেণ্টার, হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধে উদ্ধৃত)। কার্পেণ্টার-এর বক্তব্যে আস্থা রেখে রবীন্দ্রনাথ
নিজে মন্তব্য করেন, ‘তবে আমাদের দেশে ১০/১১ বৎসর বয়সেও যে যৌবন সঞ্চার
হইবার উপμম দেখা যায় তাহা বাল্যবিবাহের অস্বাভাবিক ফল বলিতে হইবে।’ মৃণালিনী
দেবীকে তিনি বিয়ে করেন ৯ ডিসেম্বর ১৮৮৩ তারিখে, মৃণালিনীর বয়স তখন মাত্র ৯
বছর ৯ মাস ! ‘বাল্যবিবাহের অস্বাভাবিক ফল’ স্বরূপ মৃণালিনী প্রম সন্তান কন্যা
মাধুরীলতা (বেলা)-র জন্ম দেন মাত্র ১২ বছর ৮ মাস বয়সে, অর্থাৎ ২৫ অক্টোবর
১৮৮৬ তারিখে। ৯ বছরের বালিকাকে বিবাহ এবং ১২ বছরের বালিকার গর্ভে সন্তান
উৎপাদন সম্পনড়ব করেও ‘চন্দ্রনাথ বাবুর কথা ভালো করিয়া সমালোচনা করা কি শুধু
সায়ান্স অ্যাসোসিয়েশন হলের পরিকল্পিত আনুষ্ঠানিক সভানুকূল বক্তব্য ? অক্ষয়বাবুর
কার্যকর প্রতিবাদের স্থলে তিনি শিক্ষার প্রভাবের কথা বলেন, তখন রবীন্দ্রসমাজে বা
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষার অভাব ছিল এমন কথা নিন্দুকেও মুখে তুলবে না। যাই হোক,
জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ২ মিনিটে মাধুরীলতার জন্ম। প্রম সন্ত
ানের অপূর্ব শ্রীরূপ দেখে নবীন-পিতা কবি রবীন্দ্রনাথ অভাবিত পুলক অনুভব করেন।
অদম্য উৎসাহে প্রম সন্তানের লালন-পালন শিক্ষা তথা সর্বাঙ্গীণ সুন্দর করে গড়ে তুলতে
কোনো ত্রুটি করেননি ; ভগিড়ব নিবেদিতার পরামর্শে মাধুরীলতা সহ পরবর্তী আরও দুটি
৩
কন্যার ও দুটি পুত্রের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। রবীন্দ্রনাথ থেকেও বয়সে বড় এবং ছোট
ঠাকুর বাড়ির অনেক মেয়ে বউ নাতনী, এমনকি বিধবারা দেশে বিদেশে নাম-করা স্কুলে
কলেজে পড়লেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর সন্তানদের স্কুলে ভর্তি করাননি। বাড়িতেই ইংরেজি,
সংস্কৃত, বাংলা সহ হাতের কাজের জন্য একাধিক বিদেশি দেশি শিক্ষক শিক্ষিকা নিয়োগ
করেছেন। নিজে পড়িয়েছেন। বালিকা স্ত্রী মৃণালিনীকেও তিনি নিয়মিত স্কুলে দেননি।
বিশিষ্ট পণ্ডিতের কাছে তিনি সংস্কৃত ভাষা সাহিত্য শিক্ষার গুরুত্ব দিয়েছেন। বিশিষ্ট
রবীন্দ্র গবেষক, সংগ্রাহক, অধ্যাপক পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘সংস্কৃত শেখানোর
উপরেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তার দায়িত্ব নিয়েছেন পণ্ডিত শিবধন বিদ্যার্ণব,
যাঁর বিশুদ্ধ সংস্কৃত উচ্চারণ মুগ্ধ করেছিল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ও পণ্ডিত হেমচন্দ্র
ভট্টাচার্যকে’ (রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, পৃষ্ঠা ৩৭১)। প্র াগত শিক্ষাপদ্ধতি এবং
নারীশিক্ষা বিষয়ে তাঁর নিজস্ব মত থাকলেও জীবনের অধিকাংশ সময়ে যে-সব সামাজিক
উনড়বয়ন কাজে নিয়োজিত রেখেছিলেন তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ বিশেষভাবে সফল হন
বিদ্যায়তন প্রতিষ্ঠায়। আলোকিত ঠাকুর পরিবারের সর্বাধিক উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক রবীন্দ্রনাথ
ছেলে-মেয়েদের জ্ঞান বিজ্ঞান এমনকি কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রয়াসে অত্যন্ত
সচেতন ছিলেন, তবুও নিজের মেয়েদের এবং মৃণালিনী দেবীকে কেন নিয়মিত স্কুলে
যেতে দিলেন না ঠাকুর বাড়ির অন্য ছেলে মেয়ে বউদের মতো তার উত্তর
রবীন্দ্রজীবনীকারদের কাছ থেকেও মেলে না। যদিও ‘স্ত্রীশিক্ষা’ এই প্রবন্ধের আলোচ্য
বিষয় নয়, তবু বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছেলে বলেন্দ্রনাথের বিধবা সাহানা দেবীর (বিবাহপূর্ব
নাম সুশীলতা) শিক্ষা বিষয়ক একটি ছোট ঘটনা উলে−খ করা যেতে পারে। শাশুড়ি
প্রফুল−ময়ী বালিকা বিধবা সাহানাকে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। স্কুলের পড়া শেষে
তিনি টিচার্স ট্রেনিং নেবার জন্যে বিলেতেও গিয়েছিলেন। সাহানা এক সময়ে বিজ্ঞান
পড়তে চেয়েছিলেন শান্তি নিকেতনে। চিঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথকে, কবির কথাতেই
তিনি (পিত্রালয় থেকে) চলে এসেছিলেন জোড়াসাঁকোয়, মনে কোনও দ্বিধা না রেখে।
কিন্তু এ-সময় রবীন্দ্রনাথ তাঁকে একেবারেই উৎসাহ না দিয়ে লিখলেন, ‘আমাদের
বিদ্যালয়ে ংপরবহপব পড়াইবার সুবিধা আছে বটে কিন্তু ষধনড়ৎধঃড়ৎু-তে তোমাকে
শিক্ষা দিতে গেলে সকলের সামনে তোমাকে বাহির হইতে হইবে⎯সে কি সম্ভব হইবে ?
এ-কথার অর্থ বুঝতে রীতিমত কষ্ট হয়’ (ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব, পৃষ্ঠা
১৪৬)। রবীন্দ্রনাথের এই লোকসমাজের ভয় দ্বিধার কারণ এও হতে পারে যে, বালিকা
সাহানার অকাল বৈধব্য ঘটে গেলে তার পিতা-মাতা এলাহাবাদে ফিরিয়ে নিয়ে যেয়ে
বিধবা সাহানার পুনরায় বিয়ের আয়োজন করছিলেন, হিন্দু ব্রাহ্ম বলে পরিচিত আদি
ব্রাহ্মসমাজের প্রধান মহর্ষি ঠাকুরবাড়ির বিধবার এই বিয়ে মেনে নিতে পারছিলেন না।
দ্বিজেন্দ্র সত্যেন্দ্র জ্যোতিন্দ্র মহর্ষির কথা মান্য করে বিধবার বিয়ে ঠেকাতে যাননি, কিন্তু
রবীন্দ্রনাথ মহর্ষি পিতার কথায় এলাহাবাদ যেয়ে পিতা-মাতা সাহানা দেবীকে বুঝিয়ে বিয়ে
বন্ধ করে বালিকা বিধবা সাহানাকে জোড়াসাঁকোয় ফিরিয়ে এনেছিলেন। এই ঘটনা তখন
অনেকেই জানতেন। তাই শান্তি নিকেতনে সাহানা দেবী পড়তে এলে তাকে দেখে মনে
পড়বেই যে রবীন্দ্রনাথ বালিকা বিধবা মেয়েটির বিয়ে বন্ধ করে দিয়েছিলেন, এই দ্বিধা
থেকেই হতে পারে তিনি সাহানা দেবীকে তারই বিদ্যালয়ে লোকের সামনে হাজির করতে
চাননি। তবে স্ত্রী-শিক্ষার পক্ষে বিদ্যাসাগর পরবর্তী রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধে প্রবন্ধে যুক্তি তর্ক
করেছেন প্রচুর। হয়তো তার পদ্ধতি ও শিক্ষাপ্রণালী ছিল সম্পূর্ণ তাঁর মতো করে,
মেয়েরা কাণ্ট হেগেল পড়লেও শিশুদের স্নেহ এবং পুরুষদের দূরছাই বলে উপেক্ষা করবে
না। বিধাতা তাদের হৃদয়প্রাবল্যে কোনো কার্পণ্য রাখেননি। তিনি মনে করেন, ‘বাসুকির
মাথার উপর পৃথিবী নাই এই খবরটা পাইলে মেয়েদের মেয়েলিভাব নষ্ট হইবে’ না।
‘স্ত্রীশিক্ষা’ (বিচিত্রা, পৃষ্ঠা ২২৪) প্রবন্ধে তিনি শিক্ষাপ্রণালীতে মেয়েদের মেয়ে হইতে
ব্যবহারিক শিক্ষার উপর জোর দেন ‘তাই বলিয়া শিক্ষাপ্রণালীতে মেয়ে-পুরুষে কোথাও
কোনো ভেদ থাকিবে না, এ-কথা বলিলে বিধাতাকে অমান্য করা হয়। বিদ্যার দুটো
বিভাগ আছে। বিশুদ্ধ জ্ঞানের, একটা ব্যবহারের। যেখানে বিশুদ্ধ জ্ঞান সেখানে মেয়ে
পুরুষে পার্থক্য নাই, কিন্তু যেখানে ব্যবহার সেখানে পার্থক্য আছেই। মেয়েদের মানুষ
হইতে শিখাইবার জন্য বিশুদ্ধ জ্ঞানের শিক্ষা চাই, কিন্তু তার উপরে মেয়েদের মেয়ে
হইতে শিখাইবার জন্য যে ব্যবহারিক শিক্ষা তার একটা বিশেষত্ব্‌ আছে এ-কথা মানিতে
দোষ কী ?’ রবীন্দ্রনাথ কন্যাদের কেন পুত্রেরও বিশুদ্ধ জ্ঞানের সঙ্গে ব্যবহারিক শিক্ষাদানও
করেছেন। বিশুদ্ধ জ্ঞানের জন্যেই তিনি সংস্কৃত শিক্ষা ও উপনিষদ, সাহিত্য পুরাণ পাঠে
অধিক মনোযোগী ছিলেন, ইংরেজি শিক্ষার জন্য তিনি একাধিক শ্বেতাঙ্গ গৃহশিক্ষকও
রেখেছেন। আবার তাঁর বিশ্বাস ছিল রামায়ণ মহাভারত পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে পরিচয়
ব্যতিরেকে শিক্ষার সম্পূর্ণতা হয় না’ (রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, পৃষ্ঠা ৩৯৩)। অন্যদিকে
শিক্ষায়তনে পদ্ধতিগত ‘বিশুদ্ধ শিক্ষা’ এবং বিজ্ঞান শিক্ষার তেমন প্রয়োজন মনে করেননি
তাঁর কন্যাদের জন্য।
বিদ্যালয়ে না গেলেও মাধুরীলতা সংস্কৃত, ইংরেজি, বাংলায় ভালো শিক্ষা লাভ
করেছিলেন শুধু নয়, ভালো গল্প ও গদ্যও লিখেছেন প্রচুর। মাধুরীলতার বয়স যখন ১৪-
ও হয়নি, মে ১৯০০ সালের কথা, কবির দুই বন্ধু শ্রীশচন্দ্রের ও কবি দেবেন্দ্রনাথ সেনের
মাধুরীলতার সমবয়সী কন্যাদের বিয়ের খবরে রবীন্দ্রনাথ প্র ম আদরের বেলা মাধুরীলতার
বিয়ের কথা ভাবতে শুরু করেন ; কারণ ‘বেলাও খুব মস্ত হয়েছে।’ শুরু হয় পাত্র খোঁজা।
সেই কালের বিবেচনায় বেলার হয়তো বয়স হয়েছে, কিন্তু কেবল যৌবন প্রারম্ভের এই
বয়সে বিয়ের বিপক্ষেই তো তিনি জোরাল বক্তব্য দিয়েছেন কিছু পূর্বে ! বেলার বয়স
৪
বিবেচনা ছাড়াও ঠাকুরবাড়ির একটি প্রাও রবীন্দ্রনাথের চিন্তায় কাজ করেছে বলে তাঁর
সব জীবনীকারই যা মনে করেন তা হলো, ‘মহর্ষির জীবদ্দশায় ঠাকুর পরিবারের
প্রানুযায়ী বিয়ের যাবতীয় তাঁদের সরকারি তহবিল থেকেই খরচ মেটানো হত। ...
অনুমান, পারিবারিক এই ব্যবস্থার জন্যেই চৌদ্দ পূর্ণ হওয়ার আগেই বেলার বিয়ে দিতে
চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। অপ্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিবাহের জন্যে তাঁকে উদ্যোগী হতে দেখে
অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন’ (পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, পৃঃ ৩৭৩)।
নিজের লিখিত মতামত প্রকাশের পর ‘ব্যক্তিস্বার্থে’ ভূমিকা বিস্মরণে কিঞ্চিৎ অস্বস্তি প্রকাশ
করেন রবীজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল, কারণ ‘হিন্দুবিবাহ’ ‘অকাল বিবাহ’ প্রভৃতি প্রবন্ধে
ও চন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে বিতর্কে তিনি বাল্যবিবাহরোধে সভাসমিতি, কাগজে কাগজে লেখা
বা আইন-প্রণয়নের যৌক্তিকতা স্বীকার না করলেও তাঁর স্পষ্ট সমর্থন ছিল যৌবন
বিবাহের প্রতি। সেক্ষেত্রে শ্রীশচন্দ মজুমদার, দেবেন্দ্রনাথ সেন, এমনকি সত্যপ্রসাদ
গঙ্গোপাধ্যায় তাঁদের প্রাপ্তবয়স্কা কন্যাদের বিবাহ দিতে ব্যস্ত হলেও তাঁদের সঙ্গে
রবীন্দ্রনাথের অবস্থানের পার্থক্য ছিল। কেবল কবি নয়, বাঙালি সমাজে তাঁর ভূমিকা ছিল
চিন্তানায়কের। তাই ব্যক্তিস্বার্থে তাঁর সামাজিক ভূমিকা বিস্মরণের ইতিবৃত্তটি কিঞ্চিৎ
অস্বস্তিকর’ (রবীজীবনী ৪র্থ খণ্ড)। তবে কবি রবীন্দ্রনাথের সামাজিক ভূমিকা এবং তার
ওপর ‘চিন্তানায়ক’-এর দায়ভার চাপানো কি ঠিক ! বাংলার সেরা কবি ব্যক্তিত্বের
জীবনীকারের এই অস্বস্তিও খুব স্বস্তিকর নয়। শুধু বয়স তো নয়, তিন কন্যার সমপ্রদানে
রবীন্দ্রনাথকে নিঃসঙ্কোচে যৌতুক প্রদান এবং গোত্র বর্ণ মিলাতে যেভাবে ভূমিকা রাখতে
হয় তাতেও তাঁর অস্বস্তি হওয়ার কথা। আর অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের কথা কেন, চন্দ্রনাথ
বসুর প্রা বিশ্বাসযুক্ত মতের বিরুদ্ধে উচিৎ জবাব তিনি দেন ⎯ অন্যদিকে বারো বছর
পূর্ণ হয়নি এমন বালিকা বধূ মৃণালিনী তখন গর্ভবতী হন। এই স্ববিরোধীতাও প্রশান্তবাবু
দেখেছেন, তারিখ ঘটনা উলে−খ করেছেন, কিন্তু অস্বস্তি প্রকাশ করেননি।
হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধের সময় রবীন্দ্রনাথ মধ্যকুড়ির যুবক, পারিবারিক প্র া ও গোত্র মিলিয়ে
সবে বিয়ে করেছেন দক্ষিণডিহি-ফুলতলা গ্রামের শুকদেবের বংশধর, ঠাকুর এস্টেটের
কর্মচারী বেণীমাধম রায়চৌধুরীর কন্যা ও প্রম সন্তান ভবতারিণী বা ফুলি বা বিবাহোত্তর
নাম মৃণালিনী দেবীকে, মাথার ওপর প্রখর ব্যক্তিত্ববান পিতা মহর্ষি। পরে, পরিণত বয়সে,
যখন মৃণালিনী গত হয়েছেন, মহর্ষিও আর নেই, সময় ১৯২৫ ⎯ জার্মান মনীষী
কাউণ্ট কাইসারলিঙ বর্তমান সভ্য সমাজের বিবাহ ও তৎসংμান্ত সমস্যার বিষয়ে একটি
গ্রন্থ সম্পাদন প্রয়োজনে ভারতীয় বিবাহ সংμান্ত একটি প্রবন্ধের জন্য রবীন্দ্রনাথকে
অনুরোধ করেন। রবীন্দ্রনাথ অনুরোধ রক্ষা করে আর একটি দীর্ঘপ্রবন্ধ লেখেন,
‘ভারতবর্ষীয় বিবাহ’। ‘প্রবাসী’র ১৩৩২ শ্রাবণ সংখ্যায় বাংলায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়।
অবশ্য তিনি বাংলাতেই প্র ম লিখেছিলেন, কারণ ‘কাউণ্ট কাইসারলিঙ ভারতীয় বিবাহ
সম্বন্ধে আমার কাছে একটা লেখা চেয়েছিলেন। ইংরেজিতে দেরি হবে ভয় করে বাংলায়
লিখেচি ⎯ পরে তর্জমা করে তাঁকে পাঠাতে হবে’ (রবীন্দ্রনাথের চিন্তাজগৎ, সমাজচিন্তা,
পৃষ্ঠা ২১৮)। ভারতবর্ষীয় বিবাহ প্রবন্ধে তিনি ভারতীয় সমাজের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য,
প্রা, সংস্কার, মূল্যবোধ এবং নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও তাদের ঐতিহ্যগত সামাজিক
অবস্থানের ভিতর ভারতীয় বিবাহকে দেখেছেন ‘হিন্দুবিবাহ’ প্রবন্ধের মতো নয়, এখানে
তাঁর কণ্ঠ দার্শনিক−গভীর, নৈর্ব্যক্তিক এবং কিছু বিমূর্তও। পশ্চাতপটে আছে পশ্চিমা
সমাজের বিবাহ ও নারী-পুরুষের সম্পর্কের ইঙ্গিত। প্রচলিত প্র া সংস্কার ও মূল্যবোধের
কথা তিনি এই প্রবন্ধে সংগত কারণেই সমালোচনা করেন না, নিজের মতও আলাদা
করে প্রকাশ করেন না, ভারতবর্ষীয় প্রচলিত বিবাহ প্র াকেই তিনি মহিমান্বিত করেছেন
ভারতীয় দর্শনের আলোকে। প্র া বিশ্বাস সংস্কার বিষয়ে প্রচলের বাইরে তাঁর বক্তব্য না
থাকলেও নারী-পুরুষের সম্পর্ক ও তাদের সামাজিক অবস্থান, ভূমিকা বিষয়ে তাঁর মত
বিস্তৃতভাবে পুনরায় লেখেন ; এই ধারণাগুলো তিনি ‘নারী প্রসঙ্গ’ (১৯২৩), ‘নারী’,
‘পশ্চিমযাত্রীর ডায়ারি’ (১৯২৪) ইত্যাদি গদ্যেও লিখেছেন। নতুন সময়ে নরনারীর
সম্পর্কের পুরনো ধরন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠলে বিবাহ প্র ার পুরাতন আধারটির বিকৃতি ঘটে,
ফলে ভারতীয় বিবাহের মূলভাব সবকিছুর সঙ্গে মানানসই হতে পারছে না। বিজ্ঞান,
অভিজ্ঞতা আর পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে মিল রেখে নতুন করে ভাববার কথাও তিনি বলেন
একবার ‘একদিন ভারতীয় সমাজের যে-আধারের উপরে তার বিবাহপ্র া প্রতিষ্ঠিত ছিল,
সেই আধারের বিকৃতি হওয়াতে বিবাহের মূলগত ভাব সকল ও তার ব্যবহার সকল
কিছুর সঙ্গে ঠিকমত খাপ খাচ্ছে না। সত্যযুগের জন্যে একদল আক্ষেপ করছে, সে
আক্ষেপের ডাকে সত্যযুগ সাড়া দিচ্ছে না। এখন সময় এসেছে নূতন করে বিচার
করবার, বিজ্ঞানকে সহায় করবার, বিশ্বলোকের সঙ্গে চিন্তার ও অভিজ্ঞতার মিল করে
ভাববার’ (ঐ, পৃঃ ২১৩)। নতুন করে অনেকেই ভাবছেন, রবীন্দ্রযুগ থেকেই, কিন্তু স্বয়ং
রবীন্দ্রনাথ নারীসত্তার ভিতর যে দার্শনিক অন্বয় আবিষ্কার করেছেন তার সঙ্গে বিজ্ঞান
আর তার নতুন যুগের মেলানো কঠিন। বিবাহকার্যে নারী পুরুষই অন্যতম প্রধান বিষয়।
কাইসারলিঙ সাহেবকে তিনি জানান, ‘ভারতীয় বিবাহের বিচার করতে হোলে একথা
জানা চাই যে এ-বিবাহে স্ত্রী পুরুষের অধিকারের সাম্য নেই। এখানে অধিকার বলতে
আমি বাহ্য অধিকারের কথা বলছি নে। এই অসাম্যের দ্বারা স্ত্রীলোকের চরিত্রে হীনতা
ঘটতে পারত। তা যে ঘটেনি তার কারণ, স্বামী তার পক্ষে আইডিয়া। ব্যক্তির কাছে
পাশববলে সে নত হয় না, আইডিয়ার কাছে ধর্মবলে সে আত্মসমর্পণ করে’ (ঐ, পৃঃ
২১১)। অসাম্য তিনি দেখেন ঠিকই, কিন্তু এ যেন কাম্য, এই অসাম্য ধর্মেরই বর ! এই
অসাম্যের অগৌরবকে তিনি মহিমান্বিত করতে চান ধর্মবলে আইডিয়াল স্বামীর কাছে
৫
আত্মসমর্পণের ভিতর দিয়ে। ঠিক এরকম বক্তব্যই ভারতবর্ষীয় বিবাহ লিখবার পূর্বে
১৮৮৯ সনে তিনি লিখেছিলেন। সেখানে সত্যযুগের জন্য তারই আক্ষেপ প্রকাশ করতে
হয় যখন তিনি দেখেন ‘নতুন সময়ে নারীরা পুরুষাশ্রয়ের বিরুদ্ধে যে একটা কোলাহল
উঠেছে, সেটা আমার অসংগত এবং অমঙ্গলজনক মনে হয়। পূর্বকালে মেয়েরা পুরুষের
অধীনতাগ্রহণকে একটা ধর্ম মনে করত ; তাতে এই হত যে, চরিত্রের উপরে অধীনতার
কুফল ফলতে পারত না, ... অধীনতাতেই চরিত্রের মহত্ত্ব সম্পাদন করত। ... সাধ্বী
স্ত্রীর প্রতি যদি কোনো স্বামী পাশব ব্যবহার করে, তবে সে ব্যবহারের দ্বারা স্ত্রীর অধোগতি
হয় না, বরং মহত্ত্বই বাড়ে’ (রমাবাইয়ের বক্তৃতা উপলক্ষে, পত্র)। নারী বা স্ত্রীর এই
অধীনতা রবীন্দ্রনাথের কাছে অনতিμম্য ‘অবশ্যম্ভাবী অধীনতা।’ অর্থাৎ চন্দ্রনাথ বাবুর
তুমুল বিরোধীতার পর সায়ান্স অ্যাসোসিয়েশন হলের সভার সভাপতি ডাঃ মহেন্দ্রলাল
সরকারের বিজ্ঞান-নির্ভর চিন্তার সঙ্গে শতভাগ একই মতপ্রকাশ করার দুই বছর পর তিনি
এই পত্র লেখেন। ‘ভারতবর্ষীয় বিবাহ’ প্রবন্ধে ওই একবার যেমন নতুন করে বিচার
করবার, বিজ্ঞানকে সহায় করবার কথা বলছেন, তেমন তিনি তো চন্দ্রনাথ বসুর প্রবন্ধ
সমালোচনা-কালীনও বলেছিলেন, বলেছিলেন জোর দিয়ে, নিজে বা কন্যাদের বেলায়
তেমন ভাববার প্রয়োজন মনে না করলেও। এখানে জোর অবশ্য নতুন কালের উপর নয়,
বরং আক্ষেপ প্রকাশ করেন ভারতীয় বিবাহপ্র া ‘যে আধারের উপর’ প্রতিষ্ঠিত ছিল ‘সেই
আধারের বিকৃতি হওয়াতে’। নতুন কালে পুরুষ ও নারী সত্তাও নতুন কালের ধারণায়
গড়া। সভ্যতাসৃষ্টির কাজে এখন নারীর ভূমিকা কোনো নারী এবং পুরুষও মনে করে না
স্বল্পপ্রয়োজনীয়। রবীন্দ্রনাথ ভারতীয় বিবাহ ভাবনায়ও ভাবছেন, সভ্যতাসৃষ্টিকালে নারীর
এই স্বল্পপ্রয়োজনীয়তার অগৌরব আজও লেগে আছে।’ কারণ নারীর প্রকৃতির মধ্যে
হৃদয়বৃত্তির যে প্রবলতা তা ‘স্বভাবতই চলবার দিকে প্রমুখ নয়, আঁকড়াবার দিকেই তার
ঝোঁক। এই জন্যে সুস্থিতির মধ্যে যে সম্পদ, নারী তারই সাধনা করলে সার্থকতা লাভ
করবে।’ তো ‘নতুন কাল বিবেচনার’ কথাটি কথার কথাই। এর পক্ষে তাঁর চিন্তা ও যুক্তি
বিস্তার করেন না, বরং রমাবাইয়ের বক্তৃতা উপলক্ষ্যে পত্র বা পশ্চিমযাত্রীর ডায়েরিতে
প্রকাশিত নারী ভাবনারই পুনরপ্রকাশ করেন। ‘ভারতবর্ষীয় বিবাহ’ প্রবন্ধে তিনি যতটা
‘হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধ’-এর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেন, ততটাই ঐক্য স্থাপিত করেন চন্দ্রনাথ
বসুর প্রবন্ধের মূলভাবের সঙ্গে।
মাধুরীলতা এবং অন্য কন্যাদের বিয়ে প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। রবীন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ, কবি
বিহারীলাল চμবর্তীর তৃতীয় পুত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতীছাত্র শরৎকুমার পাত্র
হিসেবে নির্বাচিত হলেন কবির বন্ধু প্রিয়নাথ সেনের সহযোগিতায়। শরৎকুমার
‘প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজি ও দর্শন অনার্সে প্রম শ্রেণীতে প্র ম স্থান পেয়ে
ঈশান-বৃত্তি, হেমন্তকুমার মেডাল ও কেশবচন্দ্র সেন মেডাল’ প্রাপ্ত এবং ১৮৯৫-এ
‘মেটাল অ্যাণ্ড মর‌্যাল সায়েন্স’-এ এম.এ. অবশ্যই প্র ম শ্রেণীতে প্র ম, ১৮৯৬-এ বি.
এল. ডিগ্রির পর মজঃফরপুর আইন ব্যবসায় শুরু করেন। তো মেধাবী ও সুপ্রতিষ্ঠিত এই
পাত্রের জন্য রবীন্দ্রনাথকে যথেষ্ট বিড়ম্বিত ও আপোশী হতে হয়। কবি বিহারীলাল অতি
ঘনিষ্ঠজন হলেও তাঁর পরিবার থেকে পাত্র-পণ চাওয়া হয় কুড়িহাজার টাকা। রবীন্দ্রনাথ
সব পধংয খোঁজ নিয়ে দেখেন দশহাজার টাকার বেশি কিছুতেই তিনি ব্যবস্থা করতে
পারবেন না, তাও হয়তো কিছু টাকা দিতে হবে কিস্তিতে। বন্ধু প্রিয়নাথ সেনকে লিখছেন,
‘বেলার যৌতুক সম্বন্ধে কিছু বলা শক্ত। মোটের উপর ১০,০০০ পর্যন্ত আমি চেষ্টা
করতে পারি। সেও কতক নগদ এবং কতক রহংঃধষসবহঃ-এ’ (পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়,
রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, পৃষ্ঠা ৩৭৪)। কিন্তু পাত্রপক্ষ সহজে রাজী নয়। রবীন্দ্রনাথের
পক্ষে বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বন্ধু কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য এবং কবি বিহারীলাল
জামিনদার হয়ে পণের টাকা শেষ পর্যন্ত ১২,০০০ টাকায় সমাধা করেন। কিন্তু বড়
গোলমাল বাধে আগেই। পাত্রপক্ষ বিয়ের তিনদিন আগে যৌতুকের টাকা পরিশোধ করতে
বললে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ক্ষুব্ধ হন রবীন্দ্রনাথের উপর, ‘বরকন্যার আশীর্বাদ
স্বরূপেই যৌতুক দিতে হয়, কিন্তু বিবাহের পূর্বেই যৌতুক চাহিবার কি কারণ ? আমার
প্রতি কি বিশ্বাস নাই ? অপদস্থ-অপ্রস্তুত রবীন্দ্রনাথ কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি’ (ঐ)।
তবে তিনি হবু জামাতা শরৎকুমারকে তাঁর এই অবস্থার কথা চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন।
এরপর পাত্রপক্ষ নিয়মনীতির বাইরে আরও একটি আব্দার করে বসলে রবীন্দ্রনাথ
অসম্মানজনক সেই আব্দার প্রমে মেটাতে রাজি হন। তা হলো, বিয়ের কন্যা প্রিয়
বেলাকে অন্যের বাড়িতে নিয়ে পাত্রপক্ষকে দেখাতে হবে। শিষ্টাচার বহির্ভূত এইধরনের
দাবি মেটানো অসম্ভব এবং এতে পরিবারের অপমান হবে বলে মৃণালিনী দেবী
রবীন্দ্রনাথকে সতর্ক করে দিলে তিনি সংসার অনভিজ্ঞতার দায় নিজের কাঁধে নিয়ে পরে
এই প্রস্তাব বদলাতে পাত্রপক্ষকে অনুরোধ করেন প্রিয়নাথের মাধ্যমে। সব শেষে বিয়ে হয়
১৩০৮ সালের ১ আষাঢ় রাত নয়টার সময়। তবে বিয়ের আগে শরৎকুমারকে ব্রাহ্মধর্মে
দীক্ষিত হতে হয়। উলে−খ্য, বিয়ের সব খরচই মহর্ষির পারিবারিক তহবিল থেকেই নির্বাহ
করা হয়েছিল। শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত শরৎকুমার বা তার পরিবার থেকে একের পর এক
রবীন্দ্রনাথের জন্য অসম্মানজনক দাবীদাওয়া করলেও রবীন্দ্রনাথ এমন জামাতা পেয়ে খুব
খুশি। বন্ধু বিজ্ঞানী জগদীশ বাবুকে লিখছেন, ‘আমার জামাতাটি মনের মত হয়েছে।
সাধারণ বাঙালি ছেলের মত নয়। ঋজু স্বভাব, বিনয়ী অথচ দৃঢ়চরিত্র...’ (্‌ঐ)। যৌতুক
নিয়ে দরাদরি, আগেই টাকা পরিশোধের দাবি, অন্যের বাড়িতে বেলাকে দেখার প্রস্তাব
ইত্যাদি বিষয়ে পরিবারের সঙ্গে একমত হওয়া সত্ত্বেও এই প্রশংসা বা বিনয়ী, দৃঢ়চরিত্র,
ঋজু স্বভাবের কথা তিনি বলছেন হয়তো মহৎ হৃদয় আর কবির সারল্যে, এবং যৌতুক
প্রদানে তাঁর কোনো দ্বিধাও ছিল না বলে। অন্যদিকে বেলার বয়সও তিনি তাঁর সুচিন্তিত
প্রবন্ধের মতো চিন্তা করে দেখেননি। পরবর্তী কালে বেলার সাংসারিক জীবনে চরম
অশান্তি, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে শরৎকুমারের সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি, শেষে বেলার
৬
অকাল মৃত্যু (১৩২৫) রবীজীবনে উপযুর্প রি শোকের, কষ্টের ও পরম দুঃখের আরও
একটি অধ্যায় হয়ে ওঠে।
নাম জন্ম বিবাহ জামাতা যৌতুক* মৃত্যু
মৃণালিনী
দুই পুত্র তিন
কন্যা
১ মার্চ
১৮৭৪
৯ ডিসেম্বর
১৮৮৩
রবীন্দ্রনাথ ⎯ ২৩ নভেম্বর
১৯০২
মাধুরীলতা
নিঃসন্তান
২৫ অক্টোবর
১৮৮৬
১৫ জুন
১৯০১
শরৎকুমার
চμবর্তী
১২,০০০ টাকা ১৩ মে
১৯১৮
রেণুকা
নিঃসন্তান
২৩ জানুয়ারি
১৮৯১
৯ আগস্ট
১৯০১
সত্যেন্দ্রনাথ
ভট্টাচার্য
বিলেত প্রবাসের
যাবতীয় খরচ
১৯ সেপ্টেম্বর
১৯০৩
অতসীলতা**
এক পুত্র
এক কন্যা
১৩ জানুয়ারি
১৮৯৪
৭ জুন
১৯০৭
নগেন্দ্রনাথ
গঙ্গোপাধ্যায়
আমেরিকা প্রবাসে
লেখাপড়াসহ যাবতীয় খরচ
১৫ মার্চ
১৯৬৯
* জামাতাদের ইংল্যাণ্ড-আমেরিকায় শিক্ষাকালে এবং দেশে ফেরার পরও রবীন্দ্রনাথ
মাসোহারা দিয়েছেন।
** পুত্র, কন্যা এবং বিচ্ছেদপ্রাপ্ত স্বামী অতসীলতার জীবদ্দশাতেই প্রয়াত হন।
*** রবীজীবনীকার, গবেষক এবং তর্থসংগ্রাহকদের রচনায় জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদির তারিখে
কিছু অমিল দেখা যায়। বর্তমান প্রবন্ধে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের প্রদত্ত তারিখ
ব্যবহার করা হলো।
দ্বিতীয় কন্যা এবং তৃতীয় সন্তান রেণুকার জন্ম ১২৯৭, ১১ মাঘ তারিখে কলকাতার
জোড়াসাঁকো বাড়িতে। রবীন্দ্রনাথ তখন জমিদারি দেখতে পূর্ববঙ্গের পতিসর ছিলেন।
রেণুকার ডাক নাম রাণী। ‘পাঁচ বছরের বড়দিদি মাধুরীলতা ও তিনবছরের বড়দাদা
রথীন্দ্রনাথের সঙ্গে তাঁর শৈশব কাটে’ কখনো কলকাতায়, কখনো শিলাইদহে, কখনো
জনবিরল শান্তিনিকেতনে। দিদি দাদার মতোই রবীন্দ্রনাথের তত্ত্বাবধানে গৃহ শিক্ষকের
কাছে রেণুকার শিক্ষা শুরু হয়। স্বভাবে অত্যন্ত ভাবপ্রবণ, অভিমানী, একরোখা,
সাজগোজে উদাসীন এবং চুল বাঁধতেও বিরক্ত হতেন রেণুকা। জেঠতুতো দাদা
নীতীন্দ্রনাথ রাণীর ‘নাদ্দা’ একবার জন্মদিনে বিখ্যাত দোকান ‘হোয়াইট অ্যাণ্ড হলওয়ে
লেড্‌ল’ থেকে দামী ফ্রক উপহার দেন রেণুকা বা রাণীকে। রাণীর সে জামা পছন্দ হয়
না, লেস ফ্রিল ছিঁড়ে জামাটি গা থেকে খুলে ফেলে দিলে মা মৃণালিনী দেবীও অপ্রস্তুত হয়ে
জানতে চান, কেন তুই এসব করলি ? ‘আমি এসব ভালোবাসিনে, আমার কষ্ট হয় এসব
পরতে, তবু কেন আমাকে জোর করে পরানো হয়’ (্‌ঐ, পৃষ্ঠা ৩৯৪)। রবীন্দ্রনাথ
মাধুরীলতার বিয়ের একমাস যেতে না যেতেই দশবছরের নাবালিকা রেণুকাকে বিয়ে
দেয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। এই সময়টায় রবীন্দ্রনাথ খুব ব্যস্ত⎯ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের
সঙ্গে শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় স্থাপনের জন্য আলোচনা করছেন, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের
সপ্তম-বার্ষিক অধিবেশনে ব্যাকরণ-রচনা প্রসঙ্গে ভাষণ দিয়েছেন, বক্তৃতা করছেন সেই
বিধবা বিবাহ, স্ত্রী-শিক্ষা, বহুবিবাহ ও বাল্যবিবাহ বন্ধের সংগঠক, উদ্যোক্তা বিদ্যাসাগরের
মৃত্যু-বার্ষিকী উপলক্ষ্যে। এর মাঝেই দশ বছরের রেণুকার বিয়ের ব্যবস্থা নিয়ে তৎপর
হচ্ছেন। অভিমানী একরোখা রেণুকার স্বভাব নিয়ে রবীন্দ্রনাথ হয়তো চিন্তিত ছিলেন,
কিন্তু এই নাবালিকার অভিমানী অবুঝ মন কেন বিয়েতে শান্ত হবে ! বরং তাঁর অভিমান
আরও বেড়েছিল ; সে-কথার আগে মৃণালিনীর কাছে রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি চিঠি
পড়ে নেয়া যাক। বিয়ের পর মাধুরীলতাকে মজঃফরপুর স্বামী শরৎকুমারের গৃহে রেখে
এসে পতড়বীকে এই চিঠি লিখছেন, ‘... রাণীও যদি বিবাহ করে দূরে যায় তাহলে ওর
ভালোই হবে। অবশ্য প্র ম বছর-দুই আমাদের কাছে থাকবে, কিন্তু তার পরে বয়স
হলেই (অর্থাৎ বার বছর বয়সে) ওকে সম্পূর্ণভাবেই দূরে (স্বামীর গৃহে) পাঠান ওর
মঙ্গলের জন্যেই দরকার হবে। আমাদের পরিবারের শিক্ষা রুচি অভ্যাস ভাষা ও ভাব
অন্য সমস্ত বাঙালি পরিবার থেকে স্বতন্ত্র⎯সেইজন্যেই বিবাহের পর আমাদের মেয়েদের
একটু দূরে যাওয়া বিশেষ দরকার। নইলে নূতন অবস্থার প্রত্যেক ছোটখাট খুঁটিনাটি অল্প
অল্প পীড়ন করে, স্বামীর প্রতি একান্ত শ্রদ্ধা ও নির্ভরকে শিথিল করে দিতে পারে। রাণীর
যেরকম প্রকৃতি, বাপের বাড়ি থেকে বিচ্ছিনড়ব হয়ে গেলেই ও শুধরে যাবে ...।’ স্বামীর
প্রতি একান্ত শ্রদ্ধা ও নির্ভরতা যেন ক্ষুণড়ব না হয় সেজন্য রবীন্দ্রনাথ সচেতন, স্বামীর সঙ্গে
ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠার কথা তিনি ভাবছেন না। দশ বারো বছরের একটি
বালিকার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত শিক্ষিত যুবকের সেই সম্পর্ক হওয়ার সুযোগ কোথায় ?
বিদ্যাসাগর স্মরণে রবীন্দ্রনাথ যে দীর্ঘ লিখিত ভাষণ পাঠ করে নানাবিধ বিশেষণে
বিদ্যাসাগরের মহত্ত্ব ও পৌরুষের জয়গান করেছেন সেই বিদ্যাসাগর মহাশয়
‘বাল্যবিবাহের দোষ’ প্রবন্ধে অনাকাঙ্ক্ষিত এই বিয়ের ফলে নানাবিধ দুর্ঘটের কথা চোখে
আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলেন, ‘অস্মদ্দেশীয়েরা ভূমণ্ডলস্থিত প্রায় সর্বজাতি অপেক্ষা ভীরু,
ক্ষীণ, দুর্বলস্বভাব এবং অল্পবয়সেই স্থবিরদশাপণ্ড হইয়া অবসনড়ব হয়, যদ্যপি এতদ্বিষয়ে
অন্যান্য সামান্য কারণ অন্বেষণ করিলে প্রাপ্ত হওয়া যায় বটে, কিন্তু বিশেষ অনুসন্ধান
করিলে ইহাই প্রতীতি হইবে যে, বাল্যবিবাহই এ-সমুদায়ের মুখ্য কারণ হইয়াছে’
(বিদ্যাসাগর রচনাবলী, পৃঃ ৬৮১)। প্রবন্ধের শেষে তিনি শিক্ষিত ভদ্র ‘স্বদেশীয়দের’ কাছে
আবেদন জানান, ‘সুতরাং বাল্যকালে বিবাহ দেওয়া অতিশয় নির্দয় ও নৃশংসের কর্ম।
অতএব আমরা বিনয়বচনে স্বদেশীয় ভদ্র মহাশয়দিগের সনিড়বধানে নিবেদন করিতেছি,
যাহাতে এই বাল্যপরিণয়রূপ দুর্নয় অস্মদ্দেশ হইতে অপনীত হয়, সকলে একমত হইয়া
সতত এমত যতড়ববান হউন’ (ঐ, পৃঃ ৬৮৫)। তো রবীন্দ্রনাথ দশ বছরের বালিকা রাণীকে
বিয়ে দেয়ার তৎপরতা বা সে-সময়ে বালক-বালিকাদের এমন অপরিণত বয়সে বিয়ের
আয়োজন দেখে দেখে বিদ্যাসাগর মহাশয় ‘নৃশংস’ ‘নির্দয়’ কর্মটি বন্ধের আহ্বান
জানিয়েছিলেন। হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধে যেমন তিনি ভেবেছিলেন, শিক্ষার প্রভাবে ধীরে ধীরে
বাল্যবিবাহ-প্র া বন্ধ হবে, একই প্রভাবে অকল্যাণকর সংস্কারও ঘুচে যাওয়ার কথা, এমনকি
৭
মনুর শে−াক বর্ণিত তেমন বাণীও লোকে পবিত্র জ্ঞানে গ্রাহ্য করবে না। রবীন্দ্রনাথের পূর্বেই
বিদ্যাসাগরসহ পণ্ডিত অক্ষয়কুমার বাবু, ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকার এবং রবীন্দ্রনাথ উদ্ধৃত্ত
শরীরতত্ত্বের বিশেষজ্ঞ ডাঃ কার্পেণ্টার বাল্যবিবাহের দোষত্রুটি দেখিয়ে প্রচলিত সামাজিক
আচারকে প্রশেড়বর সম্মুখীন করেছেন। যৌবনপূর্ব বিবাহের সমর্থক রবীন্দ্রনাথও নন এমন প্রতীতি
তাঁর কিছু বক্তব্যের সাপেক্ষে জন্মেও। কিন্তু তিনি বাল্যবিবাহের দোষ মোচনে কার্যকর ভূমিকা
পালন না করে শিক্ষার প্রভাবের ওপর ছেড়ে দিতে চান যে দুর্নীতি ও বিশৃঙ্খলার ভয়ে সেই
পরিস্থিতি শাস্ত্রের নীতি-নৈতিকতা-সংস্কারের অবর্তমানেও আরও ঘটতে পারে। তাঁর কথিত
‘আমাদের বর্তমান সমাজের’ ‘নূতন সমাজের’ অর্থাৎ রবীন্দ্রসমকালীন সময়ে মঙ্গল বিধায় যদি
শাস্ত্রের অপ্রয়োজনীয় অমঙ্গল বিধানের নাগপাশ কাটিয়ে ওঠা অনিবার্য হয়ে ওঠে, তবে
‘স্মৃতিশাস্ত্রপ্রতিপাদিত কল্পিত’ (বিদ্যাসাগর) বিধানের খাড়ায় বালক বালিকার ‘পাণিপীড়নের
প্র া’ নির্দয় প্র া বন্ধ করার জন্য সভাসমিতির আয়োজন, কাগজে লেখা বা প্রয়োজনে আইনের
বাধ্যতা সৃষ্টি করা যাবে না কেন ! রবীন্দ্রনাথের ‘হিন্দুবিবাহ’ প্রবন্ধেই বালবিবাহের অনেক
কুফলের উলে−খ আছে পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞের বরাত দিয়ে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের পরিবারেই স্ত্রী
মৃণালিনীসহ প্রিয়জনের জীবনে ঘটা বিপর্যয়, অনির্বাপিত অকাল শোক কি বয়ে আনেনি ! বহু
বছর ব্যাপি দেশি বিদেশি শিক্ষায় আলোকিত, উচ্চমার্গের শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য সাধানব্রত
রবীন্দ্রনাথের পরিবারেই কি কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার প্রভাব পড়েছিল, যার প্রভাবে বাল্যবিবাহের দোষ
কেটে যাবে ! উলে−খ্য ‘বিদ্যাসাগর চরিত’ নামে দু’টি নিবন্ধে যা স্মরণসভার জন্য লিখিত হলেও
রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের মহত্ত্বের অনর্গল প্রশস্তি করলেও তাঁর ‘বাল্যবিবাহের দোষ’ প্রতিরোধের
কর্ম উদ্যোগের কথা উলে−খ করেন না। অন্যদিকে তিনি ‘শিশুস্ত্রীবিবাহ’, বাল্য বা শৈশববিবাহের
সবসময় নিন্দা করাও সমীচীন মনে করেন না। যদি আগের মতো একানড়ববর্তী পরিবারের
‘সাংসারিক অবস্থা’ এবং আগের মতো ‘শিক্ষা’ থাকে তবে ‘শৈশববিবাহের যে নিন্দাই করিতে
হইবে এমন তো কোনো কথা নাই। অবস্থাবিশেষে তাহার উপযোগিতা কেহই অস্বীকার করিতে
পারিবে না। যদি স্ত্রীশিক্ষা না থাকে এবং একানড়ববর্তী পরিবার থাকে তবে শিশুস্ত্রীবিবাহ
সমাজরক্ষার জন্য আবশ্যক’ (হিন্দুবিবাহ)। আগের মতো যে শিক্ষার কথা ‘যদি’ শর্তে বলছেন
তা তাহলে স্ত্রীশিক্ষা নয়, কারণ শিক্ষাবিহীন শিশু মেয়েটির বিয়ের ‘উপযোগিতা’র কথাই
বলছেন। ‘হিন্দুবিবাহ’ প্রবন্ধে এর পরের স্তবকে পুরুষের শিক্ষার কথা তিনি লেখেন।
প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় শুধু শিক্ষার প্রভাবেই কোনো একটি পুরাতন প্র া দূর হয়ে যাবে !
কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই প্রভাব সত্য হলেও সমাজের ভিতর থেকে তার লোপ ঘটবে না।
ভারতবর্ষে বাল্যবিবাহের দুর্ভোগ এখনো চলছে। বর্তমানকালের সরকার বাধ্য হয়ে আইন সৃষ্টি
করে নারী পুরুষের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স ঠিক করে দিয়েছেন যা ডাঃ কার্পেণ্টিয়ার-এর বক্তবের
অনুরূপ। অন্যদিকে, বিদ্যাসাগর এবং অক্ষয়বাবুদের মতো অনেকের মধ্যে বুর্জোয়া সংস্কৃতির
বিকাশ লাভ করে কারণ তাঁরা সামন্ত ছিলেন না, শ্রেণীতে তাঁরা মধ্যবিত্ত হলেও জীবন ও মানব
সম্পর্কে বোঝার ক্ষেত্রে ইউরোপে ঊনবিংশ শতাব্দিতে সৃষ্টি হওয়া মানবিক বোধের এবং জ্ঞানের
আলোকে বুর্জোয়া ছিলেন। জোড়াসাঁকো ঠাকুর পরিবার জ্ঞান বিজ্ঞান ও শিল্প চৈতন্যে
ইউরোপীয় বুর্জোয়া সংস্কৃতির শ্রেয়টুকু আত্মস্থ করেছিলেন নিজেদের সামন্ত চরিত্রের পটভূমিতে।
সামন্ত ধ্যান ধারণা অনেক ক্ষেত্রে অক্ষুণড়ব রেখেও বুর্জোয়া বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা করে গেছেন। সে
কারণে ব্রাহ্ম কেশবচন্দ্র গং প্রাচীন ধর্মের সংস্কার থেকে বেরিয়ে যেতে পারলেও দেবেন্দ্রনাথ-
রবীন্দ্রনাথ সেভাবে পারেন না।
স্বামীর প্রতি শ্রদ্ধা ও নির্ভরতাকে রবীন্দ্রনাথ মনে করেন স্ত্রীজাতির ধর্ম। যেমন ছোট
বালকের পক্ষে পিতামাতাকে লঙ্ঘন করে চলা অসম্ভব ও প্রকৃতি-বিরুদ্ধ, পিতামাতার
বশ্যতা স্বীকার করাই ধর্ম। বালিকাবধূর কাছে শিক্ষিত প্রতিষ্ঠিত যুবক তো পিতৃতুল্যই
হবেন। অর্থাৎ তিনি বাল্যবিবাহের পক্ষে নিজের অবস্থানকে অন্য প্রবন্ধ বা ব্যক্তিগত
জীবনেও সমর্থন করে যাচ্ছেন। রমাবাইয়ের বক্তৃতা উপলক্ষে ‘চিঠি’ নিবন্ধে তাঁর মত পড়ে দেখা
যাক, ‘কেউ কেউ হয়তো বলবে, পুরুষের আশ্রয় অবলম্বনই যে স্ত্রীলোকের ধর্ম এটা বিশ্বাস
করা সকলের পক্ষে সম্ভব নয়, কেননা এটা একটা কুসংস্কার। সে সম্বন্ধে এই বক্তব্য,
প্রকৃতির যা অবশ্যম্ভাবী মঙ্গল নিয়ম তা স্বাধীনভাবে গ্রহণ এবং পালন করা ধর্ম।’
রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষণিকা’ কাব্যের মুদ্রক প্রেমতোষ বসুর ঘটকালিতে মাধুরিলতার বিয়ের মাত্র
একমাস চব্বিশ দিন পর ২৪ শ্রাবণ ১৩০৮ তারিখে এল.এম.এফ. ডাক্তার সত্যেন্দ্রনাথ
ভট্টাচার্যের সঙ্গে বালিকা রেণুকার বিয়ে সম্পনড়ব হয় অত্যন্ত অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে।
আজন্ম অভিমানী এই বিয়ের আয়োজনে রেণুকা ‘খুশি হননি মোটেই’ বলে
রবীজীবনীকার (পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়) জানিয়েছিন। বিয়ের যৌতুক বা শর্ত অনুযায়ী
সত্যেন্দ্রনাথের বিলেতে যাতায়াতের ও উচ্চশিক্ষার খরচ, মাসোহারাসহ সঙ্গে সত্যেন্দ্রনাথের
মা’কেও মাসোহারা পাঠিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। বিলেতে ডিগ্রি অসম্পূর্ণ রেখেই বছর দুইয়ের
আগে ফিরে এলে ভীষণ অসুস্থ মৃণালিনী দেবী রেণুকার বাসরশয্যার আয়োজন করেন।
রেণুকার বয়স তখন ১১ বছর ৮ মাস। আর ডাক্তার জামাতার ডিস্‌পেন্‌সারি খোলার জন্য
আসবাবপত্র কিনে দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ, সেই সঙ্গে ১৫০ টাকা মাসোহারাও জুগিয়েছেন।
শরৎকুমারের বিলেতবাস কালেও তিনি মাসোহারা পাঠিয়েছেন। বিলেত থেকে অকৃতকার্য
হয়ে ফেরা, বাবার আনুকূল্যে সংসারনির্বাহ ইত্যাদি অভিমানী রেণুকার মানসিক অশান্তি
আর শারীরিক দুর্বলতা বেড়ে ফুলশয্যার অল্প কিছুদিন পরই মৃত্যুপথযাত্রী মৃণালিনী
দেবীর সঙ্গে সঙ্গে রোগশয্যায় পড়েন। স্ত্রীর চিকিৎসার মতো রেণুকার বেলাতেও
রবীন্দ্রনাথ হোমিওপ্যাথি’র ব্যবস্থা করেন। রেণুকাকে রোগশয্যায় রেখে মুণালিনী দেবী
মাত্র ২৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
৮
রেণুকার অসুস্থতা দিন দিন বৃদ্ধি পায়। রবীন্দ্রনাথ একাধিক জায়গায় বায়ুবদল
চিকিৎসাবদল করেও কোনো উনড়বতি ঘটাতে পারেন না। দিনে দিনেই আশঙ্কাজনক হয়ে
উঠছে। এমন বিপনড়ব অবস্থায় রবীন্দ্রনাথ জানতে পারেন তাঁর একান্ত পছন্দের জামাতা
সত্যেন্দ্রনাথ না জানিয়ে পাঞ্জাবে বেড়াতে গেছেন। শুধু তাই নয়, সেখান থেকে টাকা
চেয়ে পাঠিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত বিরক্ত হলেও নিরুপায় হয়ে সেই টাকা
পাঠিয়েছেনও তাঁকে। এই জামাতাকেই রবীন্দ্রনাথ ৭ পৌষ ১৩০৮ বা ২২ ডিসেম্বর
১৯০১ সালে ‘পাঁচজন ছাত্র নিয়ে শান্তিনিকেতনে স্থাপিত ব্রহ্মচর্যাশ্রম’ পরিকল্পিত
বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষের ভার দিতে চেয়েছিলেন। এইসব মানসিক অশান্তি রেণুকার
অসুস্থতা বিপদজনক করে তোলে, শেষমেষ বহু চেষ্টা ব্যর্থ করে ১৯০৩ ১৪ সেপ্টেম্বর
মাত্র ১২ বছর ৭ মাস ২২ দিন বয়সে অভিমানী জেদী রেণুকা চিরবিদায় জানালেন ‘ওঁ
পিতা নোহ্‌সি’ রবীন্দ্রনাথকে, এই পৃথিবীকেও। মৃণালিনীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠি
ভাষ্যমতে রেণুকা পিতা বা বাবার বাড়ি থেকে বিচ্ছিনড়ব হয়ে স্বামীর প্রতি একান্ত শ্রদ্ধা ও
নির্ভরতাকে আশ্রয় করতে পারেননি। মৃত্যুর সময়, বাবার হাত ধরে ‘মৃত্যুর ঠিক পূর্ব
মুহূর্তে আমাকে বলে, বাবা, ওঁ পিতা নোহসি বলো। আমি মন্ত্রটি উচ্চারণ করার সঙ্গে
সঙ্গে তার শেষ নিশ্বাস পড়ল। তার জীবনের চরম মুহূর্তে কেন সে পিতা নোহসি স্মরণ
করল তার ঠিক মানেটা আমি বুঝতে পারলুম না।’ সব মানে, জীবনের কত গূঢ় অর্থ মহা
মনিষী হলেই কি সবসময় বোঝা যায় ! দশ বছরের বালিকার কাছে কিভাবে পিতা মাতার
আশ্রয় এবং নির্ভরতার পরিবর্তে অচেনা এক ভদ্রলোকের ওপর নির্ভরতা কিভাবে তৈরি
হবে এও কি রবীন্দ্রনাথ রেণুকার বিয়ের সময় বুঝতে চেয়েছিলেন ?
অতসীলতা বা মীরা রবীন্দ্রনাথের তৃতীয় কন্যা। ২৯ পৌষ ১৩০০ বা ১৩ জানুয়ারি
১৮৯৪ তারিখে কনিষ্ঠা মীরার জন্ম কলকাতার জোড়াসাঁকো বাড়িতে। মীরার জীবনও
সুখ, আদর ভালোবাসার শৈশব সমাপ্তির আগেই নির্বাপিত হয়ে তাঁকে দুঃখের সাগরে নিয়ে
ফেলে। শৈশবে মায়ের অভাব দুই দিদি দাদা এবং পিতা রবীন্দ্রনাথ ভুলিয়ে দিয়েছিলেন।
সন্তানদের প্রতি রবীন্দ্রনাথের স্নেহ বাৎসল্য কিংবদন্তিতুল্য। বিশুদ্ধ ও ব্যবহারিক শিক্ষা
ছাড়াও তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ স্বপড়ব দেখে যেতেন। দাদা দিদিদের মতো মীরার
পড়ালেখার আরম্ভ গৃহশিক্ষকের হাতে। কিন্তু সে আর কতদিন, বেলা এবং রাণীর মতো
মীরার বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন। মীরার বয়স তখন ১১ বছরও হয়নি। পিতা
দেবেন্দ্রনাথের বয়স হয়েছে, মহর্ষির জীবদ্দশায় কন্যাকে বিয়ে দিতে পারলে আর্থিক সুবিধা
পাবেন। পাত্র খোঁজা অব্যাহত থাকলেও শেষ পর্যন্ত আর মহর্ষির বর্তমানে বিয়ের ব্যবস্থা
হয় না। হয় না কারণ, তিনি তখন অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, উচ্চ শিক্ষার
জন্য ‘কোনো পাত্রকে আমি বিলেতে পাঠাতে চাইও না, পারবও না।’ মোহিতচন্দ্র
সেনকে লেখা চিঠিতে তিনি এ-কথা জানান। নাহলে অনেক পাত্রের সঙ্গে যোগাযোগ তো
হয়েই ছিল। যেমন নৃত্যশিল্পী উদয়শঙ্করের পিতা শঙ্কর পণ্ডিত লাহোরের এক পাত্রের
খোঁজ দিয়েছিলেন। বিলেত পাঠাতে রাজি নয় বলে কথা এগোলো না। রবীন্দ্রনাথের
বিশেষ বন্ধু বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর অত্যন্ত স্নেহের পাত্রী ছিলেন এই মীরা। মীরাকে
তিনি ডাকতেন ‘ক্ষুদ্র বন্ধু’ বলে। ক্ষুদ্র বন্ধুটিকে জগদীশচন্দ্র নিজের পুত্রপ্রতিম ভাগিনেয় ব্রহ্ম
বিদ্যালয়ের ছাত্র অরবিন্দমোহনের ভাবী-বধূ হিসেবে ভেবেছিলেন। এ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ও
মৃণালিনীর সঙ্গে রসিকতাও হতো। হঠাৎ করেই রবীন্দ্রনাথ রেণুকার বিয়ে দিয়ে
দিয়েছিলেন। তাই বন্ধু জগদীশচন্দ্রের অভিলাষ ইঙ্গিত করে লিখেছেন, ‘ভয় নাই তোমার
বন্ধুটিকে তোমার প্রতীক্ষায় রাখিব। ফস করিয়া হস্তান্তর করিব না।’ আবার
জগদীশচন্দ্রকে লেখা চিঠিতে জানা যায়, ‘আশ্রম বিদ্যালয়েরে প্র ম বিদেশি ছাত্র জাপান
থেকে আগত হোরি-কে প্রতিদিন পেয়ালাভরা ফুল উপহার দিয়ে আপন করে নিয়েছেন
বালিকা মীরা’ (রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, পৃষ্ঠা ৪১৩)।
‘বিলাসের ফাঁস’ প্রবন্ধে অভিজ্ঞতা থেকে পণপ্র ার বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও,
যৌতুক হিসেবে বিলেত পাঠানো একসময় বিরোধিতা করলেও, শেষ পর্যন্ত সেই শর্তেই
তিনি রাজী হলেন। মীরা বড়দিদি বেলার কাছে মজঃফরপুর বাসকালেই বরিশালের
সাধারণ ব্রাহ্ম সমাজের সভ্য বামনদাস গঙ্গোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় পুত্র নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে
বিয়ের কথা পাকা করে ফেলেন। বিয়ের পর আমেরিকা পাঠাবে প্রতিশ্রুতি দিলে
নগেন্দ্রনাথ আদি ব্রাহ্মসমাজের পদ্ধতি মতে বিবাহে সম্মত হন। চন্দ্রনাথ বাবুর বিয়ের
ব্যাপারে শাস্ত্রের জোরাল সমর্থনের নিন্দা করলেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর তিন কন্যাকেই তাঁর
পরিবার অনুসৃত আদি ব্রাহ্মসমাজের রীতিতেই বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পনড়ব করেছেন,
প্রয়োজনে পাত্রপক্ষকে এই শর্তে রাজী করিয়ে নিয়েছেন।
মীরার বিয়ের তারিখ ঠিক হয় ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৪, জুন ১৯০৭ তারিখে। রবীন্দ্রনাথ
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে এক চিঠিতে লিখছেন, ‘আগামী
২৩ জ্যৈষ্ঠ মীরার বিবাহ স্থির। স্থান শান্তিনিকেতন। পাত্র শ্রীমান নগেন্দ্রনাথ
গঙ্গোপাধ্যায়। ... নগেন্দ্রকে বিবাহের পর আমেরিকায় রথীদের কাছে কৃষিবিদ্যা শিখিতেই
পাঠাইব। ফিরিয়া আসিলে রথীন্দ্রের সঙ্গে কাজে যোগ দিতে পারিবে’ (রবীন্দ্রনাথ ও
রবীন্দ্রনাথ, পৃষ্ঠা ৪১২)। ২৩ জ্যৈষ্ঠ বিয়ের আগে ৬ বা ৭ জ্যৈষ্ঠে শান্তিনিকেতন মন্দিরে
রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং নগেন্দ্রনাথকে আদি-ব্রাহ্মসমাজ মতে দীক্ষা দেন। তারপর তাঁকে এক
চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘তোমাকে দীক্ষা দিয়া অবধি আমার মন এই নবজীবন ব্রতের প্রতি
আবিষ্ট হইয়া আছে। ... তোমার সংসারের পথে সমস্ত সুখদুঃখ, সমস্ত লাভক্ষতি মঙ্গলের
পথ প্রদর্শক হইয়া তোমাকে যেন ঈশ্বরের দিকেই লইয়া যায়’ (ঐ)। তবে রবীন্দ্রনাথের
মন যত আবিষ্ট হোক, ঈশ্বরের দরবারে জামাতার জন্য আশীর্বাদ যতই করুন, জামাতা
৯
নগেন্দ্র এই আদি ব্রাহ্ম সমাজের নিয়ম কতটা মেনে নিলেন, রবীন্দ্রনাথের স্নেহপূর্ণ
আশীর্বাদে তার মনে কতটা মঙ্গল জন্মেছিল তা জানা যায় মাধুরীলতা আর রাজলক্ষ্মী
দেবীর যুগ্মভাবে লেখা চিঠিতে, নগেন্দ্রনাথের ডায়েরি থেকে এবং মীরা-নগেন্দ্রনাথের
পরিবর্তী সংসার জীবনের ঘটনা প্রবাহে। আমেরিকায় রথীন্দ্রনাথকে লেখা চিঠিতে
নগেন্দ্রনাথের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও অদ্ভূত কত কৌতুকপূর্ণ আচরণের কথা জানা যায়।
‘রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থে পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায় সম্পূর্ণ চিঠিটি এবং আনুষঙ্গিক তথ্য
পরিবেশন করেন। দিদি ও দিদিমা (মাধুরীলতা ও রাজলক্ষ্মী) দীর্ঘ চিঠিতে বিয়ের সকল
বিবরণ জানান, লিখছেন ‘২৩ জ্যৈষ্ঠ শুভদিনে, শুভক্ষণে, শুভমুহূর্তে, শুভযোগে,
শুভগোধূলিলগেড়ব বিবাহ। শুভলগেড়বর কথা পরে, আগে পৈতার কথা শ্রবণ কর ...।
সকালবেলায় সকলে বসিয়া ফুলহার রচনা করিতেছি এমত সময় বড় বৌঠান প্রমুখাৎ
শুনিলাম শ্রীমান নগেন্দ্র যজ্ঞোপবীত ধারণ করিয়া দ্বিজ জন্ম লাভ করিবেন। সেদিন তিনি
ব্রাহ্মণ হইবেন। চেলির যোড় পরিয়া নগড়বপদে সকলকার সহিত মন্দির গমন করিলেন।
যতক্ষণ সকল আয়োজন চলিতেছিল এই অসভ্য সাজে লজ্জায় অধোবদন জামাতা
মন্দিরের বাহিরে পদচারণা করিতে লাগিলেন। নেটিভদের মত খালি পায়ে থাকতে
বোধকরি তখন তাঁহার মাথা কাটা যাইতেছিল। পরে যথাশাস্ত্র যজ্ঞোপবীত ধারণ সমাপ্ত
হইল। বাবা নানাপ্রকার উপদেশ দিলেন যাহাতে এ বিষয় নগেন্দ্রের যে সকল কুসংস্কার
ছিল সেগুলি দূরীভূত হয়, কিছু বোঝাইতে বাকি রাখেন নাই। নগেন্দ্র কি যে বুঝিল
ভগবান জানেন, ফিরিয়া আসিয়াই বাবার স্বহস্তদত্ত পৈতা ফেলিয়া দিল। ... নগেন্দ্র
ল্যাজটি আসবার সময় বাড়িতে রেখে এসেছিল বটে, কিন্তু ব্যবহার সঙ্গে এনেছিল কাজে
লাফানি ঝাঁপানি করতে কোনরকম কসুর করেনি। ... যেই মাথার টোপর বসাতে যাচ্ছি
অমনি হাত থেকে টোপরখানা কেড়ে নিয়ে দুখানা করে ছিঁড়ে ফেলে দিল। সে-সময় কি
বলব রথী, ঠাট্টা নয়, বরের অসভ্যতায় আমাদের পর্য্যন্ত লজ্জাবোধ হয়েছিল।’ এই
নগেন্দ্রের হাতে রবীন্দ্রনাথ নিজেই মীরাকে সম্প্রদান করলেন। আত্মীয়বর্গের সঙ্গে
অসৌজন্য আচরণ ছাড়াও মীরাদেবীর সঙ্গে তার আচরণ ছিল অদ্ভূত, উপহাস তাচ্ছিল্যে
ভরা। বাসরঘরের কিছু আনুষ্ঠানিকতার পর্বে নগেন্দ্রনাথের ব্যবহার বলার মতো, বেলার
চিঠি, ‘বাসরের যা কাজ ফুলের মালাবদল, আতর মাখানো, পান সন্দেশ খাওয়ানো সেসবও
যেন একটা আজগুবি কাণ্ড হল। মালা বদলে কি আছে জানি না, বর তো সেই
পাগলের মতো মালাটা ছুড়ে কোন গতিকে ওর (মীরা) গলায় পরিয়ে দিলে। সন্দেশ
খাওয়াবে, তাও মীরার গলা এক হাতে চেপে ধরে এক হ্যাঁচকা দিয়ে ওর মুখ সোজা করে
নাকে দিলে না মুখে দিলে তার ঠিক নেই। এসেন্স মীরার গায়ে হুড়হুড় করে খানিক ঢেলে
পরে আমাদের গায়ে ঢেলে দিল।’
নগেন্দ্রনাথের এমন অস্বাভাবিক ও অসম্মানজনক আচরণের পিছনে তাঁর মানসিক
অশান্তিও ভূমিকা রেখেছিল বলে রবীজীবনীকার প্রশান্ত বাবু মনে করেন। আমেরিকায়
শিক্ষা, যাতায়াত ও আনুষঙ্গিক খরচ পাওয়ার বিনিময়ে প্র াবদ্ধ আদি সমাজের
দীক্ষাগ্রহণের শর্তে মীরাকে বিয়ে করার প্রস্তাব গ্রহণ করে যে পীড়া বোধ করেন, ১৪
সেপ্টেম্বর লেখা ডায়েরিতে তার উলে−খ আছে। আমেরিকায় যাওয়ার জন্য এই বিয়ের
পূর্বে থেকেই তিনি বিভিনড়বজনের কাছে আর্থিক সাহায্য চেয়ে কোথাও কোথাও
অপমানিত হচ্ছিলেন। আদি ব্রাহ্ম সমাজ থেকে নগেন্দ্রনাথদের ব্রাহ্ম সমাজ হিন্দু ধর্মের
অনেক সংস্কারমুক্ত। শ্রেণী বা বর্ণের স্মারক ব্রাহ্মণের পৈতাসহ অনেক আচার-অনুষ্ঠান
বর্জন করেছিলেন। নগেন্দ্রের মতো সতের আঠার বছরের যুবকের কাছে এসব সংস্কার
প্রগতিশীলতার লক্ষণ বিবেচনায় উজ্জীবিত করে তুলতে পারে। আদিব্রাহ্মসমাজের
দীক্ষাগ্রহণের শর্তে বিবাহে রাজি হওয়ার পর তিনি ডায়েরিতে লিখছেন, ... ‘লাভের
হিসান গণনা করি নাই বরং ক্ষতিই স্বীকার করিয়াছি। ঐ যে বিবাহপদ্ধতির জন্য আমার
মত ও বিশ্বাসকে খাটো করিতে হইয়াছে, যাহা আমি কুসংস্কার ও অনাবশ্যক বলিয়া মনে
করি, তাহা করিতে স্বীকৃত হইয়াছি ইহাই কি এক হিসাবে আমার পক্ষে ক্ষতিকর নয় ?’
(্‌ঐ)। তবে নগেন্দ্র’র আচরণ শুধু এই মানসিক দ্বন্দ্বের জন্যই নয়, প্রকৃতই তিনি উদ্ধত
স্বভাবের ছিলেন। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রশান্তকুমার পাল রবীন্দ্রনাথের চিঠির ভিত্তিতে
দেখেছেন যে নগেন্দ্রনাথের স্বভাব তিনি অনেকটাই বুঝতে পারলেও ‘কন্যাদায় থেকে মুক্ত
হবার আগ্রহে তিনি তা উপেক্ষা করেন। নিজের এই অন্যায় সম্পর্কে তিনি μমেই সচেতন
হয়েছেন⎯নগেনের জন্য আমিই দায়ী, এ-কথা ত কোনোদিন আমি ভুলতে পারব না।
এই বাক্য তাঁর চিঠিতেই আছে’ (রবীজীবনী ৫ম খণ্ড, পৃঃ ৩৬৪)।
মীরার প্রতি তাঁর আচরণ ধীরে এমন অবস্থায় পৌঁছেছিল যে, রবীন্দ্রনাথও খুব বিচলিত বোধ
করছিলেন। মীরার সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা চলাকালেই তিনি নগেন্দ্রনাথকে এক দীর্ঘ চিঠিতে
‘হিন্দুপ্র া’ সংস্কার বিষয়ে নিজের মত লেখেন। সিঁদুর না পরায় দেশি মেয়েলিত্বের অভাবে
আমাদের মনকে আঘাত দেয়, বলেও তিনি জানান। বরকে বরণ, গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান
সম্পর্কেও তিনি নগেন্দ্রকে তাঁর মত বলেন, ‘... এই অনুষ্ঠানগুলির দ্বারা আমরা দেশের
সর্বসাধারণের এবং দেশের প্রাচীনকালের সহিত যুক্ত ⎯ এগুলিকে অবজ্ঞা করিয়া পরিত্যাগ
করিতে আমাদের হৃদয়ে বেদনা বোধ হয়। আমরা ঠিক কিভাবে আমাদের হিন্দুপ্রাকে
দেখি এবং প্রেমের সহিত রাখিতে চাই তাহাই তোমাকে জানাইলাম।’ সাধারণ ব্রাহ্ম
সমাজের সভ্য নগেন্দ্র’র ‘হিন্দুপ্রা’ বা আদিব্রাহ্ম সমাজে অনুসৃত উক্ত প্রা সম্পর্কে
ধারণা এমনকি নগেন্দ্র’র অন্য ভাইদের দৃষ্টিভঙ্গিও রবীন্দ্রনাথ অবগত ছিলেন বলে এ-সব
কথা তাঁকে লিখতে হয়, কিন্তু তিনি ভাবতে পারেননি পরে এই নবীন যুবকের র‌্যাডিক্যাল
১০
অবস্থান সম্পর্কের ক্ষেত্রে সঙ্কট তৈরি করতে পারে। সাধারণ ব্রাহ্ম নগেন্দ্র ব্রাহ্মণের পক্ষে
যে পৈতা ধারণ অনিবার্য তা ধারণ করতে অস্বীকৃত হন। বিবাহসভায় মন্দিরের মধ্যে
‘গলদেশে যজ্ঞসূত্র দিবার চেষ্টা করা হইলে তিনি তাহা লইয়া দূরে নিক্ষেপ করেন’ (্‌ঐ)।
মাত্র এই ঘটনাটিই নগেন্দ্রকে বোঝার পক্ষে যথেষ্ট। তবুও বুঝতে আরও কিছু বাকি
ছিল। রবীন্দ্রনাথ আবারো ভেবেছিলেন, তাঁর ভাবনা মতো কিছু না হতে চাইলেও,
ভেবেছিলেন উপযুক্ত চাকরি, আয় উপার্জনের ব্যবস্থা হলে মেয়ে-জামাতার ‘মনোমালিন্য’
ঘুচবে। রবীন্দ্রনাথের সকল প্রভাব খাটিয়ে উচ্চপদস্থ বন্ধুসহ সরকারের বিভাগেও চাকরির
সুপারিশ করেছেন, অনেক চেষ্টাতেও হয় না। বিরক্ত হয়ে নগেন্দ্রকে লেখেন, ‘...
একসময়ের অশ্বিনীবাবুর (বরিশালের বিখ্যাত স্বাধীনতা-সংগ্রামী) দলে তুমি স্বদেশী
আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলে। আমার ত বোধহয় সেইজন্যে গবর্মেণ্টের কাছ থেকে
কোনো মতেই তুমি ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ পাচ্ছ না। তা না হলে নিশ্চয়ই রাস্তা সহজ হত’ (ঐ)।
শান্তিনিকেতনে রক্ষিত নগেন্দ্রকে লেখা মীরা দেবীর ১৫টি চিঠির মধ্যে শেষদিকের
চিঠিগুলি তিক্ততায় ভরা। নগেন্দ্রনাথের ‘আচরণ জীবনযাত্রা পারিবারিক জীবনে ডেকে
এনেছে অশান্তি, বিভ্রান্তি। অস্মিতা ও অমিতব্যয়িতা-দুর্দম-স্বভাব’ শান্তিভঙ্গের কারণ। বাইরে
চাকরি সংস্থানের জন্য প্রবল চেষ্টার আগে রবীন্দ্রনাথ চেষ্টা করেছেন তাঁর পরিকল্পিত
পল−ীসংগঠন, শিক্ষাসংস্কার, বিশেষ করে আমেরিকা থেকে কৃষির ওপর উচ্চতর পড়ালেখা
করিয়ে আনার পর কৃষি উনড়বয়নে ভূমিকা রাখতে, কিন্তু নগেন্দ্র এসব ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যর্থ
হন। ১৯১২ সালে বিদেশে যাওয়ার আগেই রবীন্দ্রনাথ নগেন্দ্রনাথের অমিতব্যয়িতায়
‘ক্ষুব্ধ’ হন। বিদেশে রবীন্দ্রনাথকে চিঠিতে জানানো হয় নগেন্দ্রনাথের ‘ক্ষমতাপ্রিয়তা’,
‘অহমিকার’ কথা। আবার অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ের দায়িত্ব থেকে
শুরু করে জমিদারি, জোড়াসাঁকো বাড়ি, আদি ব্রাহ্মসমাজ, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ও নিজের
‘জীবনস্মৃতি’ গ্রন্থ এবং ‘ছিনড়বপত্র’ প্রকাশেও নগেন্দ্রের ওপর নির্ভর করেছিলেন, দায়িত্ব
দিয়েছিলেন। এসব ক্ষেত্রেও সৃষ্টি করেছেন জটিলতা, হয়েছেন ব্যর্থ, এমনকি
জোড়াসাঁকো বাড়িতে বসবাসকালীন নগেন্দ্র মাধুরীলতা-শরৎকুমারের সঙ্গে বিবাদ
বাধিয়েছিলেন। মাধুরীলতা পরে জোড়াসাঁকো বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র থাকেন। এবং এই
ঘটনায় বড় মেয়ে-জামাতা রবীন্দ্রনাথের ওপর করেন প্রবল অভিমান। নগেন্দ্রের ওপর
রবীন্দ্রনাথের এতকিছুর পরও নির্ভরতা দেখে হয়তো বড় মেয়ে জামাইকে অভিমানী করে
তুলেছিল। তাঁর জের তিনি বহন করেছেন মাধুরীর মৃত্যু পর্যন্ত। শরৎকুমার রবীন্দ্রনাথকে
করেছেন চূড়ান্ত রকমের অবজ্ঞা, মেয়ে মাধুরীলতাও বাবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে কুণ্ঠিত
ছিলেন, এমনকি নোবেল-উত্তর সম্বর্ধনায় তাঁর সবচেয়ে আদরের মেয়ে বেলা ও শরৎ-এর
অনুপস্থিতি তাঁকে প্রচণ্ড কষ্ট দিয়েছিল, যদিও নগেন্দ্র-মীরা অনুপস্থিত থাকেননি। যাই
হোক, পর্যায়μমে স্বামীর ব্যর্থতা, অভব্য আচরণ, অকর্মণ্যতা ও অসহযোগিতা মীরার
জন্য অপরিসীম লজ্জা ও মনঃকষ্টের কারণ হয়ে ওঠে। মীরার মানসিক যন্ত্রণার সবই
রবীন্দ্রনাথ অবগত ছিলেন। আমেরিকায় রথীন্দ্রনাথকে লেখা এক চিঠিতে মীরার জন্য
তাঁর কষ্ট আক্ষেপের কথা আছে, ‘... ওর (মীরা) জীবনের প্র ম দণ্ড ত আমি ওকে
দিয়েচি⎯ভালো করে না ভেবে না বুঝে আমিই ওর বিয়ে দিয়েছি। যখন দিচ্ছিলুম তখন মনে
মনে খুব একটা উদ্বেগ এসেছিল। ... বিয়ের রাত্রে মীরা যখন নাবার ঘরে ঢুকছিল তখন একটা
গোখ্‌রো সাপ ফস্‌ করে ফণা ধরে উঠেছিল⎯আজ আমার মনে হয় সে সাপ যদি তখনি ওকে
কাটতে তাহলে ও পরিত্রাণ পেত’ (ঐ)। কতটা মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করলে প্রিয় সন্তানের
এমন ভবিতব্য মৃহূর্তের জন্যও ভাবতে পারে মানুষ !
রবীন্দ্রনাথের নিরলস চেষ্টায় শেষ পর্যন্ত শুভানুধ্যায়ী স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়
নগেন্দ্রনাথকে “কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে খয়রা-ফাণ্ডের টাকার ‘গুরুপ্রসাদ সিংহ অধ্যাপক’
পদে নিযুক্ত করে দায়িত্ব দিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃষিশিক্ষা ও গবেষণার বিভাগটি গড়ে
তোলার। এই নিয়োগের ব্যাপারে আশুতোষকে বহু কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল।” এই
প্রসঙ্গের উলে−খ আছে দেশ ১৪০৪ শারদীয় সংখ্যায় ‘রবীন্দ্রনাথ, নগেন্দ্রনাথ ও কলকাতা
বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রবন্ধে। এই স্থায়ী ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানেও মীরা-নগেন্দ্র সম্পর্কের
কোনো উনড়বতি হয়নি। মীরা রবীন্দ্রনাথের সহযোগিতায় আলাদাভাবে বসবাস করতে শুরু
করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্ত অনুযায়ী নগেন্দ্রকে আবার বিলেতে পড়তে যেতে
হলে রবীন্দ্রনাথ বিমান ভাড়া হিসেবে তাকে ৫৮০ টাকা দেন। নগেন্দ্রকে ১৯২৩ সনের
এপ্রিলে বিলেত যেতে হয়। অন্যদিকে ১৯২২ বা ২৩ থেকেই রবীন্দ্রনাথ মীরাকে স্বতন্ত্র
সংসার পাতায় সাহায্য করতে থাকেন। মীরাদেবীকে লিখছেন ‘স্বতন্ত্র গৃহস্থলী করতে তোর
কত খরচ লাগবে⎯মাসে দুশো হলে কি চলবে ? আরো যদি দরকার হয় আমি দেব। ...
তুই যাতে স্বাধীন, স্বতন্ত্র ও স্থায়ীভাবে আপন সংসারের ভার নিতে পারিস এই আমার
ইচ্ছা, নইলে আমার মন নিশ্চিন্ত হতে পারছে না।’ প্রশান্তবাবুর রবীজবনীর ভিত্তিতে
পূর্ণনান্দ চট্টোপাধ্যায়ও এসব খোঁজ তাঁর রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থে উদ্ধৃত করেন।
শান্তিনিকেতনে তিনি মীরার জন্য তৈরি করেন ‘মালঞ্চ’ বাড়িটি। জীবনের শেষ পর্যন্ত
মীরা এই বাড়িতেই বসবাস করেছেন। নগেন্দ্র বিলেত থেকে ফিরে মীরাকে ফিরিয়ে
নেয়ার চেষ্টা করলেও মীরার অমতে রবীন্দ্রনাথ কোনো প্রভাব বিস্তার করেননি। নগেন্দ্র
যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি নিয়ে বালিগঞ্জের বিজ্ঞান কলেজের কৃষি বিভাগে
যোগ দেন তখন কিছুদিন নগেন্দ্রের সঙ্গে বসবাস করলেও মনের অমিল, নানা আচরণের
অত্যাচারে, মীরা বাবার কাছেই বেশি থাকতেন। নগেন্দ্র রবীন্দ্রনাথকে অনুরোধ করেন,
যেন তিনি বুঝিয়ে মীরাকে বালিগঞ্জে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। রবীন্দ্রনাথ নগেন্দ্রকে লিখে
জানান, ‘মীরার সঙ্গে তোমার লেশমাত্র বিচ্ছেদ হয় এ আমার কিছুতেই ইচ্ছাসম্মত নয়, এর
দায়িত্বও আমার পক্ষে কঠিন। তবুও আমাকে পরম দুঃখে এটা স্বীকার করতে হচ্ছে ! এবার
মাদ্রাজে যখন দেখলুম মীরা তোমাকে ভয় করে, তোমার হাত থেকে প্রকাশ্য অপমানের সঙ্কোচে
একান্ত সঙ্কুচিত হয়, তখন স্পষ্ট দেখতে পেলুম তোমাদের দুজনের প্রকৃতির মূল সুরে মিল
১১
নেই। তোমার অধৈর্য্য অসহিষ্ণুতা, তোমার আত্মসংবরণে অসাধ্যতা, তোমার দুর্দান্ত μোধ
এবং আঘাত করবার হিংস্র ইচ্ছা সাংসারিক দিক থেকে আমাকে অনেকসময় কঠিন
পীড়া দিয়েছে।’
ইতিমধ্যে মীরা-নগেন্দ্রর এক ছেলে নীতীন্দ্রনাথ, কন্যা নন্দিতার জন্ম হয়েছে। আজন্ম
দুঃখী মীরার ছেলে প্রকাশনা শিল্পের কারিগরি জ্ঞানের জন্য জার্মানিতে যান, এবং মাত্র
২০ বছর বয়সে যক্ষ্মা রোগে মৃত্যুবরণ করেন। মেয়ে নন্দিতাও পড়ালেখা শেষ করে
কৃষ্ণকৃপালিনীর সঙ্গে দিল−ীতে সুখে সংসার করতে করতে নিঃসন্তান অবস্থায় অকালে
মৃত্যুবরণ করেন। ৭৫ বছর বয়সে কলকাতায় ১৯৭৩ সালে মৃত্যুবরণ করার আগে মীরার
যেমন কেউ আর অবশিষ্ট ছিল না, তেমন, মীরার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের বংশের
শেষচিহ্ন মহাকালে মিলিয়ে গেল।
মীরা দেবীর সঙ্গে নগেন্দ্রনাথের আদালতের মাধ্যমে আইনসঙ্গতভাবে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে
১৯২৯ সালে। রবীন্দ্র-মীরা-নগেন্দ্রের শুভাকাঙ্ক্ষীগণ অনেক চেষ্টা করেছেন এই বিচ্ছেদ
এড়াতে, নগেন্দ্র চেয়েছেন মীরাকে নিয়ে সংসার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ, যে
উদ্যমে অল্প বয়সেই মেয়েদের বিয়ের জন্য অতি উৎসাহী হয়ে যৌতুক ও নানা শর্ত মেনে
মীরাসহ সকলের বিয়ে অনুষ্ঠানে তৎপর হয়েছিলেন, তেমনি মেয়েদের সংসারজীবনে সুখ
শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিরলস চেষ্টা করে শুধু কষ্টই পেয়েছেন, কাঙ্ক্ষিত সুখ মেয়েদের
সংসারে ফেরেনি। শেষ পর্যন্ত মীরার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটনায় মীরার সুখের জন্যেই বিচ্ছেদ
সম্পনড়ব হওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। নগেন্দ্রর অনুরোধে উল্টা লিখেছেন, ... ‘এরকম
সম্বন্ধের মধ্যে একটুও জোর খাটানোটা আমি কোনোমতেই উচিৎ মনে করিনে। এমন
অবস্থায় তোমাদের নিষ্কৃতি দেবার পক্ষে আমার দ্বারা যা করা সম্ভব আমি তা করতে বাধ্য।
কিরকমভাবে চিঠিপত্র দেওয়া দরকার তোমরা পরামর্শ করে আমাকে জানিয়ো’ (ঐ)।
রবীন্দ্রপরিবারে প্র ম এবং একমাত্র আইনি বিবাহ বিচ্ছেদও ঘটে রবীন্দ্রনাথের
সহযোগিতায় ⎯ মীরা দেবীর ইচ্ছা ও মানুষিক শান্তির জন্য এই সহযোগিতা হলেও।
রবীন্দ্রনাথের বিবাহ ভাবনা ... প্রবন্ধে ছেলে রথীন্দ্রনাথের (১৮৮৮-১৯৬১) বিয়ের কথা
বিশষ করে এই প্রসঙ্গে বিধবা বিয়ের প্রশেড়ব রবীন্দ্রনাথের অবস্থান প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এই
বিষয় ভিনড়ব একটি প্রবন্ধ দাবি করলেও কিছু বিষয় অবতারণার অনিবার্যতা এড়ানো যায়
না। রথীন্দ্রনাথের স্ত্রী প্রতিমা দেবী (১৮৯৩-১৯৬৯) ঠাকুর বাড়িরই মেয়ে। রবীন্দ্রনাথের
প্রিয় অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বোন বিনয়িনীর মেয়ে। অপরূপ সুন্দরমুখশ্রীর প্রতিমাকে
মৃণালিনী শিশু বয়সেই ছেলে রথীন্দ্রের বউ করে ঘরে আনবার কথা বলেছিলেন। প্রতিমার
বাবা মা অন্যরাও তা জ্ঞাত ছিলেন। রথীন্দ্র বিয়ের বয়সে পৌঁছতে পৌঁছতে প্রতিমার দশ
বছর হয়ে গেলে তাঁর বাবা-মা অন্যত্র বিয়ের আয়োজন করেন। রবীন্দ্ররাথ কিশোর পুত্রের
বিয়ে আয়োজনে তখন সম্মত ছিলেন না। প্রতিমার ১১ বছর কয়সে গণেন্দ্রনাথের ছোট
বোন কুমুদিনীর ছোট নাতি নীলানাথের সঙ্গে বিয়ে হয়ে যায়। লক্ষণীয়, রবীন্দ্রনাথের
কথিত শিক্ষার প্রভাবে বাল্যবিবাহের দোষ কিন্তু কাটছেই না। প্রতিমার মাতৃপিতৃকুল
তখন শিল্প সংস্কৃতি শিক্ষার আলোয় আলোকিত ভারতের সেরা পরিবার। যাই হোক
বালিকা প্রতিমার নিয়তি অন্যত্র লেখা ছিল। গঙ্গায় সাঁতার কাটতে যেয়ে বিয়ের দুই
মাসের মধ্যে নীলানাথের মৃত্যু হলে বিধবা প্রতিমা ঠাকুরবাড়ি ফিরে আসেন। এর পাঁচ
বছর পর রথীন্দ্র আমেরিকা থেকে পাঠ শেষে ফিরে এলে রবীন্দ্রনাথ প্রয়াত স্ত্রী মৃণালিনীর
পছন্দের প্রতিমা দেবীর সঙ্গেই রথীন্দ্রনাথের বিয়ের প্রস্তাব দেন। বিধবা প্রতিমা ঠাকুরবাড়িই
মেয়ে এবং মৃণালিনীর পছন্দের। পুত্রকে বিধবার সঙ্গে বিবাহের আয়োজনে মৃণালিনীর
আগ্রহরে বিষয়টি রবীন্দ্রনাথকে প্রভাবিত করেছিল। পূর্বে সাহানা দেবীর প্রসঙ্গের উলে−খ
আছে। বালিকা বিধবা সাহানার বিয়ের আয়োজন মহর্ষির কথায় রবীন্দ্রনাথ ঘটতে
দেননি। সেই অপরাধবোধের থেকেও কি প্রতিমাকে নির্বাচন ! পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের
বিশ্বাস আধ্যাত্মিকতা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্র গবেষক
সংগ্রাহক অমিতাভ চৌধুরী দ্বারকনাথ ঠাকুরের কীর্তি, প্রতিভা, সাংগঠনিক শক্তি এবং
চলমান সামাজিক সংস্কার যেমন সতীদাহ প্রা রদ, বিধবা বিবাহের সমর্থন, বিদ্যালয়
প্রতিষ্ঠার সাফল্যের কথা উলে−খ করে ‘অপ্রকাশিত দ্বারকনাথ’ প্রবন্ধে আপশোস করে
বলেন, ‘... এই কীর্তিমান বাঙালি যে কত প্রতিভাধর, কতদিকে তাঁর সাংগঠনিক শক্তি,
তা আমরা আজও ভালোভাবে বিচার করিনি। অন্যের কথা বাদ দিই, তাঁর পৌত্র স্বয়ং
রবীন্দ্রনাথও পিতামহ সম্পর্কে দুচারটে রসিকতা ছাড়া বিশেষ কিছু বলেননি বা
লেখেননি। তিনি সারাজীবন শুধু পিতার (দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর) গুণপনার কথা লিখে
গেছেন। ... পিতার প্রভাব কবির জীবনে সর্বাধিক’ (একত্রে রবীন্দ্রনাথ, পৃষ্ঠা ৪৭৯)।
সর্বাধিক প্রভাববিস্তারি পিতা আদি ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতাদের একজন হলেও প্রাচীন
হিন্দু সমাজের অনেক সংস্কার বিশ্বাসে অক্ষুণড়ব ছিলেন। একবার বর্জন করেও পুনরায়
পৈতা ধারণ করেছিলেন যেমন, তেমন তিনি সংস্কারকদের দলে ভিড়ে বিধবাদের
বিবাহরীতি সমর্থন করেননি। তিনি ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণদের বিয়ের বিরোধীতা করতেন।
রবীন্দ্রনাথের সুবিশাল রচনারাজির ভিতর বিধবা বিয়ের জোরাল সমর্থন জানিয়ে একটি
প্রবন্ধও নেই। এ-প্রসঙ্গে চিঠি নিবন্ধেরও খোঁজ মিলেনি। একটি মাত্র গল্পে (প্রতিবেশিনী)
বিধবা বিয়ের প্রসঙ্গ এনে রম্য কাহিনী লিখেছেন, আর ‘বঙ্কিমের প্রভাবে’ অন্তত দুটি
উপন্যাসে (চোখের বালি, নৌকাডুবি) বিধবা বিবাহ দেখিয়ে সংসারের অশান্তির চূড়ান্ত
পরিণতির কাহিনী তৈরি করেন। হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধে মনুর একটি শে−াক উদ্ধৃতি করে তিনে
১২
বিধবা বিবাহের বিপক্ষেই বলেন, লেখেন, ‘স্ত্রীর মৃত্যুর পর দ্বিতীয়বার বিবাহ সংসারযাত্রার
সুবিধাজনক হইতে পারে, কিন্তু বিধবার দ্বিতীয়বার বিবাহ অধিকাংশ স্থলে সংসারে
বিশৃঙ্খলা আনয়ন করে।’ বিশৃঙ্খলা ঘটে যদি সন্তানাদি থাকে। ‘সন্তানাদি না থাকিলেও
বিধবা রমণীকে পুরাতন ভর্তৃকুল হইতে নূতন ভর্তৃকুলে লইয়া যাওয়া নানা কারণে
সমাজের অসুখ ও অসুবিধাজনক ; ... এইজন্য মনু পুরুষের দ্বিতীয়বার বিবাহের স্পষ্ট
বিধান দিয়াছেন।’ বালিকা প্রতিমা দেবী নিঃসন্তান তো বটেই, উপরন্তু পুরাতন ভর্তৃকুল
থেকে নতুন ভর্তৃকুলে নিয়ে যাওয়ারও অসুবিধা নেই, শুধু জোড়াসাঁকো বাড়ির ৬ নম্বর
থেকে ৫ নম্বরে বদল। প্রতিমা-রথীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন।
হিন্দুবিবাহ প্রবন্ধ লেখার চার বছর পর ১২৯৮ সালে তিনি লেখেন ‘প্রাচ্য ও প্রতীচ্য’
প্রবন্ধটি। প্রাচ্যের সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিচ্যের মূলত ইংল্যাণ্ডের সমাজের তুলনা
করে প্রাচ্যের গুণগান গাইবার সুযোগ করে নেন বিশেষ করে নারী প্রসঙ্গে। এই প্রবন্ধে তিনি
বৈধব্যপীড়িত নারীর ভিতর শান্তি, সৌন্দর্য, সুসামাজিকতা ও উপযোগিতা খুঁজে পান। ‘বাহ্য
সাদৃশ্যে আমাদের বিধবা য়ুরোপীয় চিরকুমারীর সমান হলেও প্রধান একটা বিষয়ে প্রভেদ
আছে। আমাদের বিধবা নারীপ্রকৃতি কখনো শুষ্ক শূন্য পতিত থেকে অনুর্বরতা লাভের
অবসর পায় না। তাঁর কোল কখনো শূন্য থাকে না, বাহু দুটি কখনো অকর্মণ্য থাকে না,
হৃদয় কখনো উদাসীন থাকে না। ... গৃহকার্যের ভার যা স্বভাবতই মেয়েরা ভালোবাসে
তাও তাঁর অভাব নেই। এবং ওরই মধ্যে রামায়ণ মহাভারত দুটো-একটা পুরাণ পড়বার
কিংবা শোনাবার সময় থাকে, ...’ (প্রাচ্য ও প্রতিচ্য, রবীন্দ্ররচনাবলী ৬ষ্ঠ, পৃঃ ৫৪১)।
এমন ভালোবাসার বিধবাকে রবীন্দ্রনাথ পুনরায় বিয়ে দিতে চাইবেন কেন ? বিদ্যাসাগর
মহাশয়দের সংস্কার বাতিকে তিনি পিতৃ আদর্শ থেকে সরে এসে অংশ নিতে চাননি।
প্রতিমা দেবীর বিয়ে শুধু বিধবার প্রতি বিশেষ দায়বোধ থেকে নয়। এছাড়া রথী-প্রতিমার
বিয়েতে প্রতিমাদেবীর বড়মামা গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ আপোশহীন সহযোগিতা
উলে−খ করার মতো। রবীন্দ্রনাথের কাকা গিরীন্দ্রনাথের বড়ছেলে গুণেন্দ্রনাথের বড় ছেলে
গগনেন্দ্রনাথ প্রতিমার মাতা বিনয়িনী সমাজের ভয়ে কুণ্ঠিত হলে বললেন, ‘তোমাদের ভয়
নেই। তোমাদের পিছনে আমি আছি, তোমায় সমাজ ত্যাগ করলে আমিও সমাজ ত্যাগ
করব। তাই বলে একটা বাচ্চা মেয়ের জীবন এভাবে নষ্ট হতে দেওয়া যায় না’
(ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব, পৃঃ ১৪৮)। ছোটমামা বিখ্যাত অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও
এই বিয়ে সমর্থন করেছেন। জ্যেতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ডায়েরিতে লিখেছেন, ‘সমর
গগনদের সঙ্গে রথীর বিবাহ সম্বন্ধে কথা হল⎯ওরা এবার খুব সাহস দেখিয়েছে’ (ঐ)।
গগনেন্দ্রের বিশেষ ভূমিকাতে এই বিয়ে হয়ে যায়। বিধবা বিবাহের ফলে সংসারের
বিশৃঙ্খলতা ঘটে বলে যে রবীন্দ্রনাথের একদা বিশ্বাস ছিল মহর্ষির মৃত্যুর পরে রথীর
বিয়ের মধ্য দিয়ে সেই ভ্রান্তি হয়তো ঘুচল। প্রতিমাকে নিয়ে রথীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ
অত্যন্ত সুখে ছিলেন। রেণুকার মৃত্যুর পাঁচ বছর পর তাঁর স্বামী সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে
ছায়াময়ীর বিয়েতে রবীন্দ্রনাথ মূল ভূমিকা পালন করেন। সত্যেন্দ্র বিয়ের কয়েক মাস
পরে মারা গেলে বিধবা ছায়াময়ীর বিয়ের আয়োজনে রবীন্দ্রনাথের সমর্থন ছিল। বিশেষ
করে ছায়াময়ীর পিতা সতীন্দ্রমোহন বিধবা বিবাহের সমর্থক তো ছিলেনই এবং পাত্র
নলিনীকান্ত সমাজসংস্কারক প্রখ্যাত ব্রাহ্ম নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের পুত্র, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গেও
নবকান্তবাবুর ঘনিষ্ঠতা ছিল। নলিনীকান্ত নিজেও বিধবাবিবাহের জোরাল সমর্থক ছিলেন।
মহর্ষি-মৃত্যুত্তোর (মৃত্যু: ১৯ জানুয়ারি, ১৯০৫) প্রাজ্ঞ রবীন্দ্রনাথ বিধবা বিয়ের কিছু কিছু
আয়োজনে ভূমিকা রাখলেও এ-বিষয়ে তিনি কোনো প্রবন্ধ লেখেননি, কিন্তু
‘বিদ্যাসাগরচরিত্র’ রচনায় বিধবাবিবাহে বিদ্যাসাগরের একনিষ্ঠতার প্রশংসা করেন বৈকি ॥
��
সহায়ক গ্রন্থসমূহ ঃ
১। রবীন্দ্র-রচনাবলী দ্বিতীয় ও ষষ্ঠখণ্ড, ১২৫তম রবীন্দ্রজন্মজয়ন্তী উপলক্ষ্যে
প্রকাশিত, বিশ্বভারতী, বৈশাখ ১৩৯৫।
২। ছিনড়বপত্র, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী, ১৪১১।
৩। রবীন্দ্রনাথের চিন্তাজগৎ, সমাজচিন্তা, গ্রন্থালয় প্রাঃ লিঃ, ১৩৯২।
৪। বিদ্যাসাগর রচনাবলী ১, তুলিকলম, ৩য় সংস্করণ, ১৪০৪।
৫। রবীন্দ্রজীবনকথা, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়, আনন্দ, পঞ্চম মুদ্রণ, ১৯৯৭।
৬। রবীজীবনী, প্রশান্তকুমার পাল, ৪র্থ ও ৫ম খণ্ড।
৭। রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়, আনন্দ, ২০০৭।
৮। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব, আনন্দ, ৩য় সংস্করণ, ২০০৬।
৯। একত্রে রবীন্দ্রনাথ, অমিতাভ চৌধুরী, দে’জ পাবলিশিং, ১৯৮৩।
১০। বিচিত্রা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্রশতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে বিশ্বভারতী, প্র ম প্রকাশ
২৫ বৈশাখ ১৩৬৮, প্র ম বাংলাদেশ সংস