Showing posts with label রবীন্দ্রনাথের পরিবার. Show all posts
Showing posts with label রবীন্দ্রনাথের পরিবার. Show all posts

Thursday, September 16, 2010

শমীন্দ্রনাথ, যে বালক তারার আলোয় ঘুমাল



রবীন্দ্রনাথ যাঁর চেহারা আর স্বভাবের মধ্যে নিজের শৈশবকে খুঁজে পেয়েছেন- কৌতুক ছলে নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে যাঁকে 'শমী ঠাকুর' বলে অভিহিত করেছেন- তিনি কনিষ্ঠ পুত্র পঞ্চম ও শেষ সন্তান শমীন্দ্রনাথ। ১৮৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর শনিবার সন্ধ্যা ছ'টায় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতেই শমীন্দ্রের জন্ম।

বড় দাদা এবং দিদিদের মতো শমীর শৈশব কেটেছে কখনও জোড়াসাঁকোতে-, কখনও শিলাইদহ-কুঠিবাড়িতে। বেশিরভাগ সময়ই স্নেহময়ী জননী মৃণালিনী দেবীর অভিভাবকত্বে- দাদা ও দিদিদের স্নেহছায়ায়। কেন না, পিতা রবীন্দ্রনাথ সে সময় শুধু জমিদারির তত্ত্বাবধায়ক কিংবা পুত্রকন্যার জনকরূপে নিজের সংসারে আবদ্ধ নন। পারিবারিক জীবনের বাইরে আছে তাঁর সাহিত্যিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবন। তাই তাঁকে যোগ দিতে হয় কলকাতা-কংগ্রেসের অধিবেশনে, 'খামখেয়ালি সভা'র অনুষ্ঠানে, ঢাকা কিংবা নাটোরে অনুষ্ঠিত রাজনৈতিক প্রাদেশিক সম্মিলনে, বিজ্ঞানী বন্ধু জগদীশচন্দ্র বসুর বক্তৃতা-সভায় এবং ত্রিপুরার মহারাজা রাধাকিশোর মাণিক্যের সংবর্ধনা-উৎসবে। এরই মাঝে আছে 'ভারতী' পত্রিকার সম্পাদনা, জমিদারি-সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা।

দিদি মাধুরীলতা লিখছেন বাবাকে, ' .. খোকাবাবু (শমী) ভালো আছে। তার হাম বেরিয়েছে। তুমি বোধ হয় মায়ের কাছ থেকে শুনেছে। এখন বেশ মীরির সঙ্গে খেলাধূলা করছে। তোমাকে লিখছি, ওর সেটা ভাল লাগছে না। ও চায় এখন ওর সঙ্গে খেলা করি। খোকাতে, আমাতে, রাণীতে ( মেজ বোন রেণুকা) আর মীরাতে ( ছোট বোন) মিলে তাসের দূর্গ করে, আর পুতুল সৈন্য করে প্রায় ঘণ্টাখানেক খেলা করি...' আর একটি চিঠিতে মাধুরীলতার লিখেছেন, ' রথী (ভাই) জব্বরের কাছে লাঠি খেলা শেখে আর শমীকে শেখায়/ কাল বাদলা ছিল বলে হয়নি।'' ২১ আগস্ট ১৮৯৯ মাধুরীলতার ছিঠি, '' মীরা পণ্ডিত মহাশয়ের কাছে 'ক, খ, গ' পড়ছে। শমী বাবু বড় বেশী পরের দিকে নজর রেখে কাজ করেন। তিনি '18' অবধি গুণতে শিখেছেন, এবং রোজ একখানা ছিঠি লেখেন।...'

১৯০১ সালের ডিসেম্বর মাসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতনে স্থাপন করেছেন ব্রহ্মবিদ্যালয়। সেখানে বাসাও করেছেন। রথীন্দ্রনাথ ছিলেন ছাত্র। শমীর তখন মাত্র চার বছর বয়স। দিদি মীরার সঙ্গে ছবি আঁকতে যেতেন।

এরমধ্যে তার মা মৃণালিনী দেবী ও মেঝদিদি রেণুকা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২৭ সেপ্টেম্ব ১৯০২ তাদেঁরকে কোলকাতায় আনা হল। রোগতাপে বিভ্রান্ত রবীন্দ্রনাথ শমীকে তাঁর শিক্ষক সুবোধ মজুমদারের সঙ্গে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়েছেন।
মাত্র ছ'বছর বয়সে শমী মাতৃহারা হন। মায়ের পিসি রাজলক্ষ্মী দেবি তাদের দেখাশুনার দায়িত্ব নেন।
মায়ের মৃত্যুর ন'মাস পরেই মেজদিদি রেণুকার অকাল মৃত্যু হল।

এরপরে তিনি শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয়ে নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছেন। তাঁর সরল শান্ত হাস্যোজ্জ্বল মুখ, তাঁর নম্র-শিষ্ট আচরণ সকলকে আকৃষ্ট করত, মুগ্ধ করত। নামমাত্র বিলাসিতা ছিল না তার পোশাকে-আশাকে, ব্যবহারে-চালচলনে ছিল না বিন্দুমাত্র অহংকার। কেউ তাঁকে কখনো বিমর্ষ দেখেনি। 'আমার ছোট ছেলে শমী লোকজন এলে তাদের মোট ঘাড়ে করে আনত'- বলেছেন রবীন্দ্রনাথ। শমী বরাবরই দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন- তাই বড় ছেলেরা তাঁকে বেশি ভারী বোঝা বইতে দিতেন না, রেহাই দিতে চাইতেন তাঁরা। কিন্তু শমী তাতে ক্ষুণ্ন হতেন- দুঃখিত হতেন।

অধ্যাপক যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় কিংবা ভূপেশচন্দ্র রায়ের সঙ্গে প্রতি বিকেলে যেতেন শান্তি নিকেতনের প্রতিবেশি গ্রাম ভুবনডাঙায়- সঙ্গে থাকত হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাক্স। অসুস্থ-রোগার্তদের প্রয়োজন মতো সে-সব ওষুধ বিলিয়ে দিতেন- কখনও রোগীকে বিছানায় বসিয়ে স্বহস্তে ওষুধ খাওয়াতেন। রুগ্ন ছিলেন বলে খেলাধূলা করার সুযোগ পেতেন না- তাই বিকেলে খেলার মাঠের পরিবর্তে যেতেন গ্রামের পথে।

দাদা রথীন্দ্রনাথ শমীর চেয়ে আট বছরের বড়ো। দাদাই শমীর দেখাশুনা করতেন। কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য তিনি আমেরিকা চলে গেলেন। শমী তাঁকে তখন চিঠিতে আশ্রমের খবর দিতেন। লিখতেন তাঁর বন্ধুরা কে কী করছে, তাঁর নিজের পড়াশুনা কেমন চলছে- এ ছাড়া কখন কোন গাছে কী ফুল ফুটেছে, জ্যোৎস্নারাতে কোথায় বেড়াতে যাচ্ছেন তাঁরা, ছাত্রদের সভায় তিনি কোন কবিতা আবৃত্তি করেছেন ইত্যাদি বিচিত্র সব খবর।

বিদ্যালয-জীবনের ফাঁকে ফাঁকে শমীন্দ্রনাথ বাবা, দাদা ও ছোট দিদির সঙ্গে বেড়াতে গেছেন শিলাইদহের পদ্মাতীরে- কখনওবা বড়দিদি মাধুরীলতার স্বামী-গৃহ মজঃফরপুরে। কখনও আবার রাজলক্ষ্মী দিদিমার সঙ্গে গিরিডিতে। রবীন্দ্রনাথ ২৪ এপ্রিল ১৯০৭ চিঠিতে জানাচ্ছেন, শমী ঠাকুর সেদিন লাইব্রেরির বই গোছাতে অতিরিক্ত পরিশ্রম করাতে জ্বরে পড়েছে। জ্বরে পড়ে খুব গান ও কাব্যালোচনা করচে। আজকাল হঠাৎ তার গানের উৎসাহ অত্যন্ত বেড়ে উঠেছে। প্রায়ই 'এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ গেয়ে বেড়াচ্ছে।...'

প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, ''যাহাকে ঋতু উৎসব বলে তাহার প্রবর্তক হইতেছেন, রবীন্দ্রনাথের কনিষ্ঠপুত্র শমীন্দ্রনাথ। ১৩১৩ সালের শ্রীপঞ্চমীর দিন তাহার উদ্যোগে এই ঋতু উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। শমীন্দ্রনাথ এবং আরো দুইজন দুইজন ছাত্র বসন্ত সাজে, একজন সাজে বর্ষা; আর তিনজন হয় শরৎ। ...শমীন্দ্রনাথ এ উৎসবে ' এ কি লাবণ্যে পূর্ণ প্রাণ, প্রাণেশ হে' গানটি করেন। শান্তিনিকেতনে ঋতু উৎসবের ইহাই প্রথম অর্ঘ্য।'' এ ঘটনার সময়ে রবীন্দ্রনাথ শান্তি নিকেতনে ছিলেন না। ১৩১৫ সালে গ্রীষ্মাবকাশের পর রবীন্দ্রনাথ আনুষ্ঠানিকভাবে ঋতু উৎসবর উদ্বোধন করেন। তার আট মাস আগেই শমী চলে গেছেন অন্য কোনও জগতে- অন্য কোনও উৎসবে। কবি পুত্র শোককে রূপান্তরিত করেছেন প্রকৃতি-বন্দনায়। এই ঋতু উৎসব বাঙালির প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।

১৯০৭ সালের পূজার ছুটি। কনিষ্ঠা কন্যা মীরার অসুস্থতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশ বিব্রত। ছুটিতে শমীকে কোথায় রাখবেন সেই চিন্তায় ব্যাকুল। ভেবেছিলেন আশ্রমের শিক্ষক সুবোধচন্দ্র মজুমদারের সঙ্গে তাকেঁ দিল্লী পাঠাবেন।- কিন্তু সেখানে ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাবের কথা শুনে পিছিয়ে গেলেন। শরণ নিলেন বন্ধু শ্রীশচন্দ্র মজুমদারের। তাঁকে লিখলেন শমী কোলকাতা পছন্দ করে না, সেখানে যেতেও চায় না- অথচ ছুটিতে শান্তিনিকেতনে তাঁর একলা ঠেকে। তাই তিনি শমীকে শ্রীশচন্দ্রের শ্বশুরালয় মুঙ্গেরে পাঠাতে ইচ্ছুক- কেন না শ্রীশচন্দ্রের পরিবারবর্গ তখন সেখানেই। তা ছাড়া- 'শমী এত অল্প জায়গা জোড়ে এবং এত নিরুপদ্রব যে তার আগমনে তোমাদের মুঙ্গের সহরের শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা নেই।'

শেষ পর্যন্ত ১৬ অক্টোবর বিজয়াদশমীর দিন শমীন্দ্রনাথ বন্ধু ভোলার সঙ্গে তাঁর মামার বাড়ি মুঙ্গের যাত্রা করেন। ছুটি-শেষে বিদ্যালয় খোলার মুখে কলকাতায় রবীন্দ্রনাথের কাছে দুঃসংবাদ পৌঁছল শমীর কলেরা হয়েছে। তক্ষুণি (১৭ নভেম্বর) তিনি ডাক্তারসহ ছুটলেন মুঙ্গের- বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যাপক ভূপেন্দ্রনাথ সান্যালকে সেখানে যেতে অনুরোধ জানিয়ে টেলিগ্রামও পাঠালেন। সকলের প্রচেষ্টা নিষ্ফল করে ৭ অগ্রহায়ণ ( ২৪ নভেম্বর) মাত্র এগারো বৎসর ন'মাস বয়সে শমী শেষ নিঃশ্বাস ফেললেন। ঠিক পাঁচ বছর আগে এমনই এত সাতই অগ্রহায়ণ শমীর মা মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু ঘটেছিল। কী আশ্চর্য যোগ।

পুত্রশোকাতুর রবীন্দ্রনাথ রাত্রে ট্রেনে আসতে আসতে দেখলেন জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে, কোথা কিছু কম পড়েছে তার লক্ষণ নেই। তাঁর মন বললে, কম পড়েনি- সমস্তের মধ্যে সবই রয়ে গেছে, আমিও তারি মধ্যে। সমস্তর জন্যে আমার কাজও বাকি রইল। যতদিন আছি সেই কাজের ধারা চলতে থাকবে। সাহস যেন থাকে, অবসাদ যেন না আসে, কোনওখানে কোনও সূত্র যেন ছিন্ন হয়ে না যায়- যা ঘটেছে তাকে যেন সহজে স্বীকার করি, যা কিছু রয়ে গেল তাকেও যেন সম্পূর্ণ সহজ মনে স্বীকার করতে ত্রুটি না ঘটে।

এই সংকল্প নিয়ে শোকাহত শান্তি নিকেতনে পৌঁছলেন রবীন্দ্রনাথ। স্বাভাবিকভাবেই কথাবার্তা বলছেন আশ্রমিকদের সঙ্গে। তাঁর শান্ত সংযম ব্যবহারে সকলে স্তম্ভিত। কেবল তাঁর বড়দাদা দ্বিজেন্দ্রনাথ যখন দেখা করতে এলেন, রবীন্দ্রনাথের চোখে দেখা গেছে জলের রেখা। বড়দাদাও শোকবিমূঢ়, কেবল ছোটভাইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন আর বারবার অস্ফুট স্বরে বলছেন 'রবি! রবি!' এরই মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ডেকে পাঠালেন অধ্যাপক যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়কে- যাঁর সঙ্গে পার্শ্ববর্তী গ্রাম ভুবনডাঙায় বেড়াতে যেতেন বালক শমী। একটি পুঁটলি হাতে তুলে দিয়ে বললেন, শমীর এই কাপড়-জামাগুলো ভুবনডাঙার ছাত্রদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়ো।

রবীন্দ্র-রচনায় শমীন্দ্রনাথের সাদৃশ্য রয়েছে কোনও বালক চরিত্রের সঙ্গে। 'ডাকঘর' নাটকের চিররুগ্ণ-সৌন্দর্যমুগ্ধ ও কল্পনাপ্রবণ বালক অমলের মধ্যে শমীর প্রতিচ্ছায়া দেখেছেন কেউ কেউ। শমীর অন্য এক দোসর বৃক্ষ-প্রাণ 'বলাই'। আর, 'শিশু' কাব্যের নায়ক খোকা যে শমীন্দ্রনাথ তা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই স্বীকার করেছেন। তিনি লিখেছেন, ...'কবিতাগুলি যখন লিখছিলাম তখন শমী ও তার মায়ের জীবনটাই আমার সামনে ছিল।... খোকা এবং খোকার মার মধ্যে যে ঘনিষ্ঠমধুর সম্বন্ধ সেইটি আমার গৃহস্মৃতির শেষ মাধুরী- তখন খুকী ছিল না- মাতৃশয্যার সিংহাসনে খোকাই (শমীন্দ্র) তখন চক্রবর্তী সম্রাট ছিল। সেইজন্যে লিখতে গেলেই খোকা এবং খোকার মার ভাবটুকুই সূর্য্যাস্তের পরবর্তী মেঘের মত নানা রঙে রাঙিয়ে ওঠে- সেই অস্তমিত মাধুরীর সমস্ত কিরণ এবং বর্ণ আকর্ষণ করে আমার অশ্রুবাণ্প এইরকম খেলা খেলবে- তাকে রিবারণ করতে পারি নে।''

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার কনিষ্ঠা কন্যা মীরা দেবী

পিতা রবীন্দ্রনাথ





বিশ্বজোড়া যার খ্যাতি, ভুবন জুড়ে যার সুনামের ধজ্বা। সেই রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর নয়, পিতা রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর কে অনুসন্ধানকরব, তারই নিজের ভাষায়, অনুভুতিতে, যা বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেয়েছে।এখানে তাঁর কনিষ্ঠা কন্যা মীরা দেবী ও জামাতা নগেন্দ্রনাথের কিছু পত্রের উল্লেখ করব। যার প্রতিটি ছত্রে আমরা পিতা রবীন্দ্রনাথ কেই খুঁজে পাব।

৬ জুন, ১৯০৭ সালে রবিন্দ্রনাথের কনিষ্ঠা কন্যা মীরা দেবীর বিয়ে হয় বরিশালের ব্রাম্মসমাজের নিষ্ঠাবান ভক্ত বামনচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র নগেন্দ্রনাথের সঙ্গে।
উচ্চাভিলাষী নগেন্দ্রনাথের বিলাত যাবার একান্ত বাসনা, কিন্তু পারিবারিক অবস্থা সে ইচ্ছে পূ্রনের অনুকুল ছিলনা। বিলাত যাবার ব্যয় বহনে ইচ্ছুক এমন কন্যা দায়গ্রস্থ পিতাকে দায়মুক্ত করতেও তিনি রাজি। শ্বশুরের খরচে বিলাত গমনেচ্ছু পাত্র রবীন্দ্রনাথ পছন্দ করতেন না। বিয়ের নামে এই বিনিময় প্রথা তাঁর অপছন্দ ছিল। কিন্তু প্রিয়দর্শন, তেজস্বীযুবক নগেন্দ্রনাথ কে দেখে মত বদল করেন। নগেন্দ্রনাথ কে আমেরিকা পাঠাবার কড়ারে কন্যাদান করলেন।কবির ইচ্ছে অনুযায়ী নতুন জামাই নগেন্দ্রনাথ বিয়ের তিন সপ্তাহ পর ২৮ জুন, ১৯০৭ সালে আমেরিকা যাত্রা করেন। ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় হতে কৃষি বিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি উর্জন করে ১৯১০ সালে দেশে ফিরে আসেন।

কবির স্বপ্ন ছিল, পুত্র জামাতা মিলে তাঁর জমিদারি পরিচালনা, পত্রিকা সম্পাদনা, ব্যাঙ্ক ও ব্যবসার তদারকি, তদুপরি
শান্তিনিকেতনে তাঁর সাধনাকে সিদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। কিন্তু নগেন্দ্রনাথ কে নিয়ে কবির সকল আশা ভরসা অচিরেই বিলীন হয়ে গেল। শ্বশুর নির্ধারিত সকল কাজ-কর্ম থেকেনগেন্দ্রনাথ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। তিনি অন্যত্র চাকরী প্রয়াসী হলেন। নগেন্দ্রনাথ কে ভারমুক্ত করতে কবি তার পৈ্তৃক দেনা শোধ করলেন, তাঁর ভাইদের পড়াশুনার ভার গ্রহন করলেন, এ ছাড়াও রবিন্দ্রনাথ কন্যা-জামাতার ভরন পোষনের জন্য মাসোহারার ব্যবস্থা করলেন। নগেন্দ্রনাথের কোন নির্দিষ্ট কাজকর্ম নেই, আয় নেই, কোন বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকার মানসিকতা, সব বিষয়ে গা ছাড়া ভাব, অথচ বে-হিসেবী জীবনযাত্রা ইত্যাদি নিয়ে কবির সঙ্গে মতান্তর থেকে মনান্তর শুরু হল এবং তার অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়া ঘটল মীরা দেবীর উপর। যে সরল ওসুরুচিপুর্ন পরিমন্ডলে কবি-কন্যা লালিত পালিত হয়েছিলেন, জামাইএর পারিবারিক পরিবেশে মনে হয় তার কিছুটা ঘাটতি ছিল। শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে পৌছেছিল যে ১৯১৮ সাল নাগাদ কবি-কন্যা ও জামাতার মধ্যে এক দুস্তর ব্যবধান সৃষ্টি হয়ে গেল। বিলম্বে হলেও নগেন্দ্রনাথের একটা জীবিকার ব্যবস্থা হল, কিন্তু এদিকে কন্যা-জামাতার জীবন বীনার ছেঁড়া তারে জ়োড়া লাগার কোন লক্ষন দেখা গেল না। কন্যার প্রতি মমত্ববোধ, আর জামাইএর প্রতি কর্তব্যবোধে কবির দিক থেকে কোনো ঘাটতি না থাকলেও উভয়ের মানসিকতায় যে যোজন পরিমান ফারাক সৃষ্টি হয়েছে তার প্রতিবিধান কবির সাধ্যাতীত। ফলে মীরা দেবী স্বামীর ঘর করতে কলকাতা যেতেই অনিচ্ছুক। নগেন্দ্রনাথের ইচ্ছে, কবি তাঁকে জোর করে স্বামীর কাছে পাঠান। সেখানেই কবির আপত্তি। তিনি লিখেছেন......... “ মীরার সঙ্গে তোমার লেশমাত্র বিচ্ছেদ হয়, এ আমার কিছুতেই ইচ্ছাসম্মত নয়। এর দায়িত্ব ও আমার পক্ষে কঠিন। তবু আমাকে পরম দুঃখে এটা স্বীকার করতে হচ্ছে। এবার মাদ্রাজে যখন দেখলুম মীরা তোমাকে ভয় করে, তোমার হাত থেকে প্রকাশ্য অপমানের সংকচে একান্ত সংকুচিত হয়, তখন স্পষ্ট দেখতে পেলুম তোমাদের দুজনের প্রকৃতির মুল সুরে মিল নেই। ( চিঠি, ৮ ভাদ্র, ১৩২৬ )।সুতরাং মীরা দেবী পুত্র-কন্যা নিয়ে রয়ে গেলেন শান্তিনিকেতনে, কখনো বা পিতার সাথে জ়োড়াসাঁকোয়, আর নগেন্দ্রনাথ কলকাতায়। নগেন্দ্রনাথ বার বার চেষ্টা করেছেন স্ত্রী কে নিজের কাছে আনতে, কিন্তু মীরা দেবী রাজি হন নি। কারন কবিই তাঁর জামাইএর স্বভাব-চরিত্র বিশ্লেষন করে বলেছেন......... “ তোমার অধৈয অসহিষ্ণুতা, তোমার আত্মসম্বরনে অসাধ্যতা, তোমার দুর্দান্ত ক্রোধ, এবং আঘাত করিবার হিংস্র ইচ্ছা, সাংসারিক দিক থেকে আমাকে অনেক সময়ে কঠীণ পীড়া
দিয়েছে।( চিঠি,১১ অগ্রহায়ন,১৩২৬ )। এমন পরিবেশে কন্যা স্বামী গৃহে যেতে না চাইলে কবি তাকে জোর করে পাঠাবেন না। অন্য একটি চিঠিতেও কবি লিখেছেন......... “ মীরা যে প্রশান্ত গাম্ভির্যের সঙ্গে নিঃশব্দে আপন দুঃখবহন করে, তাতে ওর মুখের দিকে তাকালে আমার চোখে জল আসে। ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ওকে কোনও জীবনযাত্রা বহন করতে যদি প্রস্তত হতে হয়, তবে সে চিন্তা আমার জন্য দুর্বিষহ। এখন সে শুধু আমার কন্যা নয়, সে যে আমার আশ্রয়ে আছে, আমি যদি তাকে বলি তার এখানে থাকা হবেনা, তাহলে তাকে চলে যেতেই হবে----জানি, সে কখনো আভাসেও অসম্মতি জানাবেনা। কিন্তু কোনমতেই আমার দ্বারা এমন নির্মম কাজ হবেনা। মীরা যখনি ইচ্ছে করবে, যখনি সে আমাকে বলবে আমি যাব, তখনি আমি তাকে যেতেবলব”।(চিঠি, ২০ ফাল্গুন,১৩২৬)
ব্যথাহত রবীন্দ্রনাথ এক পত্রে নগেন্দ্রনাথ কে লিখেছেন,......... “ তোমাদের দুইজনেরই ভাগ্য তোমাদের নিজেদের হাতে। আমি জোর করে তার গতি পরিব্ররতন করতে পারিনে, এ সকল দুর্ঘটনার মুল অন্তরের মধ্যে। তোমাদের পরস্পরের মধ্যে যে বিচ্ছেদ ঘটেছে সে তো বাইরের জিনিস নয়। বাইরে থেকে জোর করে, শাসন করে, ভয় দেখিয়ে জোড়া দেবার যে চেষ্টা সে আমার দ্বারা কিছুতেই হতে পারেনা। কারন, তার মতো নীচতা ও নিষ্ঠূরতা আর কিছুই নেই।
তুমি এ সম্নধে আদালতে নালিশ করতে চাও, মীরা যদি সেই আঘাতও সহ্য করতে সম্মত থাকে, তাহলে আমি কি
করতে পারি? তুমি এ সম্মন্ধে তাকেই বরঞ্চ ভয় দেখিয়ে চিঠি লিখো। যদি ভয় পেয়ে সে হার মানে তাহলে তাই হোক।
চিঠি, ২৫মাঘ,১৩২৬) মীরা দেবী স্বামীর ঘরে না থেকে বাবার কাছে থাকলে লোকনিন্দার আশঙ্কা প্রকাশ করে নগেন্দ্রনাথ কবি কে লিখলে
তিনি জবাবে লিখেছেন............ “ মীরা যদি তোমার কাছ থেকে দূরে থাকলে তোমার সম্মন্ধে লোকনিন্দার আশঙ্কা
আছে বলে তুমি কল্পনা করছ। মীরা নিজের সম্মন্ধে লোকনিন্দা কে গ্রাহ্য করেনা তোমাকে লিখেছে শুনে খুশী হলুম।
জীবনে সব মানুষের ভাগ্যে সুখ থাকেনা--- তা নাই বা থাকল----কিন্তু স্বাধীনতা যদি না থাকে তবে তার চেয়ে দুর্গতি
কিছু হতে পারেনা। মীরা এখানে আপন মনে একটি কোনে থাকে—বেশী কিছুই চায়না,-- একটু খানি শান্তি এখানে পায়,
আর যানে আমি ওকে কত স্নেহ করি। লোকনিন্দার ভয়ে মীরার এই অধিকার টুকুকে নষ্ট হতে দেখলে আমার আর দুঃখের
অন্ত থাকবেনা।(চিঠি,মাঘ-ফাল্গুন,১৩২৯)বিদেশ থেকে কবি মীরা দেবী কে লিখেছিলেন,...... “ তোর দুঃখ আমার হৃদয় ভরে আছে, আমি একদিন ও ভুলতেপারিনে। এ দুঃখ দূর করি এমন শক্তি আমার নেই,--- তোদের নিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে সুখী হব ঈশ্বর আমাকে সেঅবকাশ দেবেন না......... সুখের আশা রাখিসনে মীরু, দুঃখ কে ভয় করিসনে---তুই যে কোনো শাসনের ভয়ে, পীড়নেরদায়ে নিজের সত্ত্যকে বিকোতে চাসনে এতে আমি সুখী। (চিঠি,১৯২১) কিছুদিন পর নগেন্দ্রনাথ কে এক চিঠিতে লিখলেন............ “ এই দুঃখ রয়ে গেল যে, তোমাদের দুজনের কাউকেই আমি সুখী করতে পারিনি,-- তার শাস্তি নিয়ত অন্তরের মধ্যে ভোগ করছি, অতএব আমাকে ক্ষমা কোর। (চিঠি,২১ আশ্বিন১৩২৯)। তার কয়েক মাস পর আর একটি চিঠিতে......... “ তোমাকে শান্তি ও সান্তনা দেবার কোন ক্ষমতা আমার হাতে যদি থাকত তাহলে আমি চেষ্টার ত্রুটি করতুম না। (৬ফাল্গুন,১৩২৯)

আর গভীর দুঃখ ও মর্মবেদনায় কবি পুত্র রথিন্দ্রনাথ কে এক চিঠিতে লিখেছেন............”” মীরা যখন নাবার ঘরে
ঢুকেছিলো তখন একটা গোখরো সাপ ফস করে ফনা ধরে উঠেছিল, আজ আমার মনে হয় সে সাপ যদি তখনি তাকে
কাটত, তাহলে ও পরিত্রান পেত।“” বিশাল বিচিত্রমুখী রবিন্দ্র সাহিত্যের কোন চ্চরিত্রের মুখে এমন নিষ্ঠূর নিষ্করুন সংলাপক্তি শোনা যায়নি। কি গভীর মনস্তাপে রবিন্দ্রনাথের মতো স্নেহশীল পিতা ও সংবেদনশীল কবির কলমে এমন নির্মম, নির্দয় উক্তি বেরোতে পারে তা অনুভব করা যায়, বোঝান যায় না।

সুত্রঃ রবিন্দ্রনাথ, নগেন্দ্রনাথ, ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়
দীনেশ্চন্দ্র সিংহ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও তার কনিষ্ঠা কন্যা মীরা দেবী

0 মন্তব্য(সমূহ):

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

জোড়াসাঁকোর সেই নারীরা

গোলাম রসূল মারুফ


এক পশলা বৃষ্টির পর স্নিগ্ধ হয়ে উঠা ঠাকুরবাড়ির দিকে তাকাতেই যেনো মনে পড়ে যায় রবীন্দ্রনাথের গানের কথা, “দূরে কোথায় দূরে দূরে/ আমার মন বেড়ায় গো ঘুরে ঘুরে.. .. ..। মনে পড়ে যায় একদিন শঙ্খমালার সুরে মুখরিত ছিলো এ ঠাকুরবাড়ি, নিক্কন ধ্বনির কল্লোলমুখরতায় মূর্ত হয়ে উঠেছিলো সৃষ্টির প্রেরণা। ফলে সময়ের বিবর্তনে আর রবীন্দ্রনাথের অমিত সৃষ্টিসম্ভারের আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ানো পাঠকের কাছে এ ঠাকুরবাড়ির নারীরা হয়ে উঠেছে চাঁদের আলোয় আলোকিত চন্দ্রমল্লিকার মতো, কতো রবীন্দ্রপ্রেমী হৃদয়ে-মননে এসেছে কামরাঙা কবিতার মতো। আবার জোড়াসাঁকোর কর্কশ হট্টগোলের মাঝে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট একটা গলির শেষে যে সেকেলে মস্ত বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, বাইরে থেকে তাকে বিশেষত্বহীন মনে হলেও বাঙলার নবযুগের বিকাশ হয়েছিলো এ বাড়ি থেকেই। এ বাড়ির নারীরাই একদিন ঝিমিয়ে পড়া সমাজের বুকে একটার পর একটা আঘাত হেনে তার জড়তা ঘোচাতে চেষ্টা করেছিলেন।

ঠাকুরবাড়ির নারীদের মধ্যে স্বর্ণকুমারী ও জ্ঞানদাননন্দিনীর নাম বহুশ্রুত, তবে তাঁদের প্রপিতামহী অলকাসুন্দরী ও পিতামহী দিগম্বরীও ছিলো ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দ্বারকানাথ মাত্র তেরো বছর বয়সে পিতৃহীন হন। অলকাসুন্দরীকে তখন শক্তহাতে সংসারের হাল ধরতে হয়। ধর্মে অলকাসুন্দরীর অত্যন্ত নিষ্ঠা ছিলো, তবে এ নিষ্ঠা কখনোই তাঁর ব্যক্তিস্বাধীনতার চৌকাঠ পেরোতে পারেনি। কাত্যায়নী দেবী ছিলেন তাঁর দীক্ষাগুরু। অলকাসুন্দরী মৃত্যুর সময়ও তাঁর স্বাধীন চিন্তাকে ব্যক্ত করেছিলেন, গঙ্গায় অন্তর্জলি যাত্রায় সম্মতি দেননি। সে যুগে কেউ তাঁর কথা শোনেনি, তবে তাঁর প্রতিবাদ সে যুগের ক্যানভাসেও ছিলো অতুলনীয় তৈলচিত্র। অন্যদিকে দিগম্বরীর ধর্মনিষ্ঠা ও নির্ভীক তেজস্বীতার মধ্যেও ঠাকুরবাড়ির নিষ্ঠা ও দৃঢ়তার ছাপটুকু চোখে পড়ে। সেই সময়ে তিনি যে মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা নিঃসন্দেহে নারী জাগরণের ইতিহাসে এক আশিসবাণী।

যোগমায়া ছিলেন গিরীন্দ্রনাথের স্ত্রী আর সারদা ছিলেন দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রী। তাঁরা কিছু লেখাপড়া শিখেছিলেন। সারদা অবসর সময়ে প্রায়ই একটা না একটা বই খুলে বসতেন। সংস্কৃত ‘রামায়ণম্ব, ‘মহাভারতম্ব পড়ে শোনাবার জন্য কখনো কখনো ডাক পড়তো ছেলেদের। হাতের কাছে কোনো বই না থাকলে অভিধানই খুলে বসতেন। চাণক্যশ্লোক তাঁর অত্যন্ত প্রিয় ছিলো। যোগমায়াও নানাধরনের বই পড়তেন। মালিনী আসতো বটতলায় ছাপা বইয়ের পসরা নিয়ে। সেখান থেকে বেছে বেছে বই কিনতেন ঠাকুরবাড়ির নারীরা। এ বাড়ির আরো দুই নারী সৌদামিনী ও সুকুমারী। তাঁদের বোন স্বর্ণকুমারী বাঙলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক লেখিকা। সে সবদিক থেকেই ছিলো বিরল ব্যতিক্রমী। ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখলেও, তাঁর বিশেষ নাম ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক উপন্যাস লিখে। তাঁর আলোকছটায় ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল আলোকিত। তবে তাঁর এ সাফল্য ও কৃতিত্বের সঙ্গে আরো একজন জড়িয়ে আছেন, যাঁর নাম জ্ঞানদাননন্দিনী, যিনি এ বাড়ির নন, বিবাহসূত্রে এসেছেন ঠাকুরবাড়ির অঙ্গনে। সত্যি বলতে, তিনিই প্রথম ঠাকুরবাড়ির নারী, যিনি সমস্ত বাধা-নিষেধ অতিক্রম করে নারীদের জন্য এক অনবদ্য মুক্তির আর্কেস্ট্রা তৈরি করেন।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর এক লেখায় লিখেছেন, “আমার বিয়ের কোনো গল্প নেই.. ..ঃ। তবে রবীন্দ্রনাথের বিয়ে হয়েছিলো জোড়াসাঁকোতেই। ঠাকুর স্টেটের কর্মচারী বেণীমাধব রায়ের বড়ো মেয়ে ভবতারিণীর সঙ্গেই বিয়ে হলো রবীন্দ্রনাথের। তবে বিয়ের পরই ভবতারিণী মৃণালিনী হবার দীক্ষা গ্রহণ শুরু করে। প্রথমে মহর্ষির নির্দেশে তিনি ঠাকুরবাড়ির প্রচলিত আদব-কায়দা-বাচনভঙ্গি শেখার ঘরোয়া তালিম নেন নীপময়ীর কাছে। পরে নীপময়ীর অন্য নারীদের সঙ্গে ‘মৃণালিনীম্ব পড়তে গেলেন লোরেটো হাউসে। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা ও রাণীম্বর প্রথম অভিনয়ে মৃণালিনী সেজেছিলেন ‘নারায়ণীম্ব আর ‘দেবদত্তম্ব-এর ভূমিকায় ছিলেন তাঁর মেজো ভাশুর সত্যেন্দ্রনাথ। ঘরোয় অভিনয় নয়, বেশ বড়ো মাপের আয়োজন হয়েছিলো সেদিন। মৃণালিনী এ অভিনয়ের মাধ্যমে বেশ জনপ্রিয় ও প্রিয়শ্রুত নাম হয়ে উঠে।

স্ত্রীর কাছে রবীন্দ্রনাথ কী প্রত্যাশা করেছিলেন? তাঁর এক চিঠি থেকে জানা যায়, “আমাকে সুখী করবার জন্য তুমি বেশি কোনো চেষ্টা করো না- আন্তরিক ভালোবাসাই যথেষ্টঃ। তবে একথা সত্য, তাঁর প্রত্যাশার প্রায় সবটুকুই পূরণ করেছিলো মৃণালিনী। জীবনের সবক্ষেত্রে এমনকি শন্তিনিকেতনে আদর্শ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বাসনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সেখানে গেলে মৃণালিনীও তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন।

সময় যতো এগুতে লাগলো ঠাকুরবাড়ির শিল্প-সাহিত্য কেন্দ্রীক সংস্কৃতির একটা নিজস্ব ছাপ পড়তে শুরু করলো সমাজের বুকে। বস্তুত ১৮৭৫ থেকে ১৯২৫- এ পঞ্চাশ বছরটাকে যদি এক ঝলকে, এক পলকে দেখে নেয়া যেতো, তাহলে ঠাকুরবাড়ির সোনালি-উজ্জ্বল দিনগুলোকে একসঙ্গে দেখা যেতো। বাঙলার নারী সমাজেও এ সময়ে এসেছে পরিবর্তন। ঠাকুরবাড়ির হৃদমহলেও জ্ঞানদাননন্দিনী-স্বর্ণকুমারী-মৃণালিনী-সৌদামিনীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন প্রতিভা-ইন্দিরা-সরলা-সুষমা-শোভনারা। সময় ও সমাজকে তাঁরা যা কিছু দিয়েছেন, তাতে উপকৃত হয়েছে পুরো নারী সমাজ এবং এতে উঠে এসেছে তৎকালীন বিপরীত কালস্রোতেও ঠাকুরবাড়ির ভেতরে প্রবহিত প্রগতিশীলতার কথা। এ যেনো নারী জাগরণের ইতিহাস পর্যালোচনার এক মূর্ত প্রচ্ছদপট।