মুক্তমনায় প্রকাশিত লিংক
http://www.mukto-mona.com/personalities/ahmed_sofa/tribute_2007.htm
Showing posts with label আহমদ ছফা বিষয়ক. Show all posts
Showing posts with label আহমদ ছফা বিষয়ক. Show all posts
Thursday, October 21, 2010
ছফাগিরি। কিস্তি তিন।
লিখেছেন শুভাশীষ দাশ (তারিখ: সোম, ২০০৯-১১-৩০ ০১:১৯)
মূল রেখাটির লিংক-- http://www.sachalayatan.com/subasish/28904
আমি ছফাগিরির কিস্তি দুইয়ে লিখেছিলাম, উনিশশো একানব্বই সালের সেই ট্রমা থেকে আমি এখনো বেরিয়ে আসতে পারি নি। ধর্ম কিভাবে মানুষে মানুষে আকাশ-পাতাল ফারাক তৈরি করে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আর সাম্প্রদায়িক মনোভাব জন্মানোর ইতিহাস বুঝে নিতে আমি পড়া শুরু করি নানানজনের লেখা। ছাপার অক্ষরে যা থাকে তার মাঝে কতো মিথ্যা থাকে, আস্তে আস্তে আমার কাছে পরিষ্কার হয়। এরও অনেকদিন বাদে আমার হাতে আহমদ ছফার লেখা আসে। ছফার লেখা সাথে সাথে ছফাকে নিয়ে প্রায় সব লেখা যোগাড় করে পড়তে থাকি। ছফার জীবনধারণ, কথাবার্তা, লেখালেখি এই সবের মধ্যে আমি বুঝে নেই- এই লোক যথেষ্ট কামেল । কারণ এঁর কথাবার্তায় পুরানো বুলির চর্বিত চর্বণ নাই। আনকোরা প্যাঁচছাড়া লেখা। আর সত্যভাষণ। এবং সাথে সাথে দুর্বিনীত সাহস। আগের কিস্তিতে ছফার আঙ্গিকে বঙ্কিমের রাষ্ট্রবেত্তা চরিত্র নিয়ে আলোচনা করেছি। শতবর্ষের ফেরারিঃ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়- ছফা এই প্রবন্ধের এক জায়গায় লিখেছেন-
বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যেভাবে মুসলমান বিজেতাদের আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাঁদের পররাজ্য লোভী তস্কর, প্রজাপীড়ক, পর ধর্মবিদ্বেষী এবং লুন্ঠনকারী বলে অভিযুক্ত করেছেন, তেমনটি অন্য কোন লেখক করেননি। তথাপি তিনি বিজেতাদের সামরিক শ্রেষ্ঠতার প্রশংসা করেছেন। সুলতান মাহমুদ যে একজন দক্ষ সেনাপতি এবং বিচক্ষণ রণপন্ডিত ছিলেন মেনে নিতে কোন রকম কুন্ঠাবোধ করেননি। আক্রমণকারী মুসলমান রাজাদের সামরিক শক্তির দিক দিয়ে ভারতীয় হিন্দু রাজন্যবর্গ অপেক্ষাকৃত হীনবল ছিলেন এবং তাঁদের সামরিক সংগঠন দুর্বল ছিল, ওগুলো বঙ্কিম অম্লানবদলে কবুল করে নিয়েছেন।১
বঙ্কিমের ব্যক্তিমানসের সাথে তাঁর শিল্পীমানসের দ্বন্দ্ব ছফার চোখ এড়ায়নি-
চাকুরি জীবনে বঙ্কিমের লাঞ্ছনা, পারিবারিক দুর্যোগ, একমাত্র কন্যার অকাল মৃত্যু বঙ্কিমের ব্যক্তিগত জীবনকে হতাশার এমন এক চূড়ান্ত পর্যাতে ঠেলে দিয়েছিলো; একমাত্র ধর্মের মধ্যেই সান্ত্বনা সন্ধান করতে হয়েছিলো। তরুণ বয়সের সাধনা বলে বঙ্কিম চিন্তা করার যে অপূর্ব ক্ষমতা আয়ত্ব করেছিলেন, সেই জিনিশটিকে উল্টোদিকে প্রবাহিত করতে বাধ্য হলেন, বঙ্কিমের জীবনচরিত পাঠক তাঁর বিরুদ্ধে কঠিন অভিযোগ উত্থাপন করার পরও দুঃখবোধ না করে পারবেন না। আহ্! কি আশ্চর্য মানুষ। কি করতে পারতেন , আর কি করলেন।২
বঙ্কিমকে নিয়ে ছফার প্রবন্ধটির হালকা নির্যাস আমার লেখা থেকে কিছুটা পাবেন। মূল লেখাটা পড়লে ছফার চিন্তার পুরো মোকাবিলা সম্ভব।
এবার আসি দ্বিতীয় প্রবন্ধে। বাঙালী(১৯৭৭ সালে প্রকাশিত এই লেখায় বাঙালি বানান করা হয়েছে ঈ-কার করে।ছফার লেখা থেকে করা কোটে ঈ-কার বানানটা অনুসরণ করা হলো) মুসলমানের মন।‘শহীদে কারবালা’ পুঁথির কথা দিয়ে লেখা আরম্ভ করেছেন আহমদ ছফা। সাথে বিবেচনা করেছেন অন্যান্য পুঁথি আর সেগুলোর ভাষ্য নিয়ে। যদ্যপি আমার গুরুতে বঙ্কিমের লেখার সাথে পুঁথির তুলনা করেছেন প্রফেসর রাজ্জাক-
পার্থ চট্টোপাধ্যায় একটা মূল্যবান বই লিখেছিলেন। নামটা জানি কী। তিনি দেখাইছেন, যে সময়ে বঙ্কিমের উপন্যাসগুলো প্রকাশ পাইবার লাগছিল, একই সময়ে বটতলার মুসলমানি পুঁথিগুলাও মুদ্রণযন্ত্রে ছাপা অইয়া বাইর অইতে আছিল। বঙ্কিমের উপন্যাস দুইশ আড়াইশর বেশি ছাপা অইত না। কারণ আধুনিক সাহিত্য পড়ার পাঠক আছিল খুব সীমিত। কিন্তু বইটা পড়লে দেখতে পাইবেন মুসলমানি পুঁথি ছাপা অইতেছিল হাজারে হাজারে। বঙ্কিমের বিষয়বস্তুর সঙ্গে পুঁথির বিষয়বস্তুর তুলনা করলে ডিফারেন্সটা সহজে বুঝতে পারবেন।৩
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সেই বইয়ের নাম ‘ন্যাশনালিস্ট থট এন্ড দা কলোনিয়াল ওয়ার্ল্ডঃ আ ডেরিভেটিভ ডিসকোর্স’। বইটির অধ্যায় তিন লেখা হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে। এক জায়গা থেকে কিছুটা অনুবাদ করে দিচ্ছি-
সংস্কৃতির সম্পূর্ণ ধারক, মতবাদের তত্ত্বীয় দিক কি বাস্তবজীবনের বুনিয়াদ সব দিক মিলিয়ে হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বঙ্কিমের মনে যে দৃঢ়বিশ্বাস দানা বেঁধেছিল সেটা আধুনিক এয়ুরোপের খাঁটি বস্তুতান্ত্রিক আদর্শের চেয়ে বেশি এথ্নিক ছিল। সময়স্রোতের জঞ্জাল সরিয়ে সংশোধিত, বিকশিত আদর্শবাদী হিন্দুত্বের কথা বলতে চেয়েছেন তিনি।৪ … বঙ্কিম তাঁর শেষের দিকের লেখাগুলোতে আধুনিক ভারতের জাতীয় ধর্মের প্রতিষ্ঠার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। আধ্যাত্মিকতার দখলদারি মনোভাব থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষমতার সাথে একটা যুক্তিযুক্ত তত্ত্বের উপর যা খাড়া ছিল।ভারতের সংখ্যাগুরুদেরকে একটা একক জাতীয় সংস্কৃতির তলে একত্রীভূত করতে এই তত্ত্বের আদর্শ কাজ করছিল। আর এই জিনিসের আবিষ্কার করতে গিয়ে বঙ্কিমের চেতনাপ্রবাহে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার মুখোশ পরে আর চাপা থাকেনি। বঙ্কিম ইসলামের ক্ষমতা ও মহিমার দিকে পশ্চাদ্ধাবনকে ঠিকমতো বুঝে নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই ধর্মকে তিনি ভেবে নিলেন আধ্যাত্মিক কি এথ্নিক গুণশুন্য।তাঁর আদর্শের বিপরীত ঠাউরে এই ধর্মকে ধরে নিলেন অযৌক্তিক, গোঁড়ামিপূর্ণ, সর্পিল, ভোগবিলাসী আর অনৈতিক।৫
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এই লেখা থেকে আরো কিছু অংশের অনুবাদ পরের কিস্তিতে দিবো। সংখ্যাগুরু সমাজের বিশ্লেষণকারী হিসেবে লেখালেখির সাথে সাথে আহমদ ছফা বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিয়েও লিখেছেন। তাঁর প্রবন্ধ ‘বঙ্গভূমি আন্দোলন, রাষ্ট্রধর্ম, মুক্তিযুদ্ধঃ বাংলাদেশের হিন্দু ইত্যাকার প্রসঙ্গ’ পড়লে কিছুটা আন্দাজ হবে।পরের কিস্তিতে এই প্রবন্ধের উল্লেখ থাকবে। ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ নিয়ে আলোচনা পরের কিস্তিতেও এগোবে।
আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমানের স্বরূপ সন্ধানে সেই কালের লেখকদের বিচার করতে চেয়েছেন। ফলে পুঁথিলেখকদের মনোজগৎ বুঝে নেয়া তাঁর জন্য জরুরী হয়ে ওঠে। ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক ধারার প্রভাব তাঁদের লেখায় এসে গেছে অগোচরে। সেইসব লেখকদের পঠনব্যাপ্তি ছিল খুবই সীমিত। ইসলামের নামে এক পাঁচমিশালী ধারণার বশবর্তী হয়ে তাঁরা লিখে গেছেন। পুঁথিলেখকদের অনেকেরই আরবী ফার্সী জ্ঞান ছিল না, ইসলাম শাস্ত্রে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। তাঁদের লেখায় ঐতিহাসিক তথ্যের যেমন ঘাটতি ছিল, তেমনি সমাজব্যবস্থার প্রচলিত দিক ও উঠে আসেনি। ছফার মুখে শুনি-
হিন্দুদের দেব-দেবী এবং কাব্যোক্ত নায়ক-নায়িকাদের প্রতি মনে মনে একটি বিদ্বেষের দূরস্মৃতিও সক্রিয় ছিলো। কেননা এই দেব-দেবীর পূজারীদের অত্যাচার এবং ঘৃণা থেকে অব্যাহতি পাবার আশায় তাঁদের পূর্বপুরুষেরা প্রথমে বৌদ্ধ ধর্ম এবং পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাই মুসলমান পুঁথিলেখকেরা তাঁদের রচনায় যখনই সুযোগ পেয়েছেন, এই দেব-দেবীর প্রতি তাচ্ছিল্য এবং ঘৃণা প্রকাশ করতে কুন্ঠাবোধ করেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও হিন্দু সমাজের দেব-দেবী, নায়ক-নায়িকার প্রভাব থেকে তাঁদের মন মুক্ত হতে পারেনি। তাই তাঁরা সচেতনভাবে এই দেব-দেবীদের প্রতিস্পর্ধী নায়ক এবং চরিত্র যখন খাড়া করেছেন, এই সৃষ্ট চরিত্র সমূহের মধ্যেই দেব-দেবী নতুনভাবে প্রাণ পেয়েছে। হযরত মুহম্মদ, হযরত আলী, আমীর হামজা, মুহম্মদ হানিফা, বিবি ফাতেমা, জৈগুন বিবি এই চরিত্রসমূহ বিশ্বাসে এবং আচরণে, স্বভাবে চরিত্রে যতো দূর আরব দেশীয়, তার চাইতে বেশি এদেশীয়।তাঁদের মধ্যে যে বুদ্ধিমত্তা এবং হৃদয়াবেগ কাব্যলেখক চাপিয়ে দিয়েছেন তা একান্তভাবেই বঙ্গদেশে প্রচলিত দেব-দেবীর অনুরূপ। বাইরের দিক থেকে দেখলে হয়তো অতোটা মনে হবে না। কিন্তু গভীর দৃষ্টিক্ষেপ করলে তা ধরা না পড়ে যায় না। বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতা সাহিত্যের দুই মুখ্য উপাদান। বিশ্বাস অভিজ্ঞতার নবরূপায়নে সাহায্য করে। আলোকিত বিশ্বাস আলোকিত রূপায়ন ঘটায় এবং অন্ধবিশ্বাস অন্ধরূপায়ন। মুসলমান পুঁথিলেখকদের বিশ্বাসের যে শক্তি তা অনেকটা অন্ধবিশ্বাস, ইসলামী জীবনবোধসমৃদ্ধ বিমূর্ত কোনো ধারণা তাঁদের অনেকের ছিলো না। তাই তাঁদের শিল্পকর্ম অতোটা অকেলাসিত। প্রতি পদে কল্পনা হোঁচট খেয়েছে বলে তাঁদের রচনার শক্তি নেই।আলাওল দৌলত উজীর প্রমুখ মুসলমান কবি উৎকৃষ্ট কাব্যরচনা করতে পেরেছেন। তার কারণ তাঁদের কতিপয় সুযোগ ছিলো।৬
অনগ্রসর জনসমাজ ইসলামের নামে যেসব কথা শুনতে চাইতো পুঁথিলেখকরা সেই অনুসারে লিখতেন। ছফা বিশদ করেছেন এভাবে-
বাঙালী মুসলমান রচিত পুঁথিসাহিত্যে উদ্ভট রসের অতি বেশি ছড়াছড়ি। হিন্দু মহাকাব্য এবং পুরাণসমূহের বীর-বীরাঙ্গনাদের চরিত্রের অপভ্রংশ মুসলিম কবিদের সৃষ্ট বীরদের মধ্যে নতুন করে জীবনলাভ করেছে। তাই পুঁথিসাহিত্যে অগ্রসরমানতার চাইতে প্রতিক্রিয়ার জের অধিক। মনের হীনমন্যতাবোধ থেকেই এই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি।এর পেছনে একগুচ্ছ ঐতিহাসিক কারণ বর্তমান। মুসলমান পুঁথিলেখকরা সচেতনভাবে এক সামাজিক আদর্শ থেকে বেরিয়ে এসে আরেকটি সামাজিক আদর্শ, একটি শিল্পাদর্শের বদলে আরেকটি শিল্পাদর্শ নির্মাণের প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নতুন শিল্পাদর্শটির চেহারা কি রকম হবে, জীবনের কোন মূল্যচেতনার বাহন হবে, অতীতের কতোদূর গ্রহণ করবে, কতোদূর বর্জন করবে, সে সম্বন্ধে তাঁদের মনে কোন পরিচ্ছন্ন ধারণা ছিলো না। তাই তাঁরা অনেক সময়ে বহিরঙ্গের দিক দিয়ে নতুন সৃষ্টি করলেও, আসলে তা ছিলো গলিত অতীতেরই রকমফের। উপলব্ধির বদলে বিক্ষোভ, পরিচ্ছন্ন চিন্তার বদলে ভাবাবেগই তাঁদের শিল্পদৃষ্টিকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে।এক সময়ে এই মুসলমানের পূর্ব পুরুষেরা যে উঁচু বর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলেন, এই অপমানজনক দূরস্মৃতি বাইবেলের ‘অরিজিনাল সীন’ বা আদি পাপের ধারণার মতো তাঁদের মনে নিরন্তর জাগরূক থেকেছে। মুসলমান রচিত পুঁথিসাহিত্যের প্রতিক্রিয়াশীলতা আসলে সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতারই সাহিত্যিক রূপায়ন। সে বিষয়টির স্মরণে রাখার প্রয়োজন আছে। মুসলিম শাসনের অবসানের পর এই সামাজিক প্রতিক্রিয়া আরো গভীর এবং অন্তর্মুখী রূপ পরিগ্রহ করে। এই প্রতিক্রিয়ার জের বাঙালী মুসলমান সমাজে এতো সুদূরপ্রসারী হয়েছে যে উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী গদ্য লেখক মীর মশাররফ হোসেনের সুবিখ্যাত ‘বিষাদ সিন্ধু’ গ্রন্থটিতে ও ‘শহীদে কারবালা’ পুঁথির ব্রাহ্মণ আজরকে একই চেহারার, একই পোষাকে, একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সময়ের পালাবদলের পালা ব্যাপারটি এই অত্যন্ত শক্তিধর লেখকের মনে সামান্যতম আঁচড়ও কাটতে পারেনি।৭
প্রতিক্রিয়াশীলতার জন্ম কিভাবে হয় ছফা তার ইতিহাস বুঝে নিতে চেয়েছেন। ছফা কী কখনো ভেবেছিলেন তাঁর গায়েও প্রতিক্রিয়াশীলতার তকমা সাঁটবে কেউ কেউ। যদ্যপি আমার গুরু বইয়ের শুরুতে ছফা লেখেছিলেন-“ যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়ি বাড়ি যায় / তথাপি তাহার নাম নিত্যানন্দ রায়”। মাঝে মাঝে বোধহয় ইশারাই কাফি।
পুঁথিলেখকরা যেভাবে অজানা বিষয়ের দিকে অন্ধভাবে ধাবিত হয়েছিল। হিন্দু লেখকদের কিন্তু তা করতে হয় নি। সামাজিক অভিজ্ঞতাকে তাঁরা লেখায় ঠিকমতো আনতে পেরেছিলেন। আত্মপ্রত্যয়ের সাথেই। ইসলামের আসল স্বরূপ, তার দার্শনিক অবলোকন পুঁথিওয়ালারা করেছে লোকশ্রুতি কি দূরকল্পনা থেকে … নবদীক্ষিত মুসলমানদের বেশীর ভাগই ছিল নিম্নবর্ণের হিন্দু, তাই আর্য সংস্কৃতিরও যে বিশ্বদৃষ্টি এবং জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে যে একটা প্রসারিত বোধ ছিলো, বর্ণাশ্রম ধর্মের কড়াকড়ির দরুণ ইসলাম কিংবা বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণের পূর্বে সে সম্বন্ধেও তাঁদের মনে কোনো ধারণা জন্মাতে পারেনি। পাশাপাশি ইসলামও যে একটা উন্নততরো দীপ্ত ধারার সভ্যতা এবং মহীয়ান সংস্কৃতির বাহন হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে একটা সামাজিক বিপ্লব সাধন করেছিলো, বাঙালী মুসলমানের মনে তার কোনো গভীরাশ্রয়ী প্রভাবও পড়েনি বললেই চলে।৮ … এয়ুরোপীয় রেনেসাঁয় মুসলমানদের যে অবদান তার ছোঁয়া ভারতবর্ষের মুসলমানদের উপর একবারেই লাগেনি। ইসলামের প্রকৃত ব্যাখ্যার ছিঁটেফোটা বাঙাল মুলুকে লাগে নি বলে ছফা রায় দিয়েছেন … নতুন ধর্ম গ্রহণ করার পরে স্থানীয় মুসলমানরা ইংরেজ আমলের দিশী খ্রিষ্টানদের মতো একটা উন্মত্ত গর্ববোধ ছাড়া ইসলামী কিংবা আর্য সংস্কৃতির কিছুই লাভ করতে পারেননি।৯… আরবী, ফার্সি কি উর্দুর প্রতি টান ছিল পুঁথিপত্রের লেখকদের। কিন্তু এই ভাষাগুলোকে পূর্ণরূপে রপ্ত করার মতো আর্থিক এবং সামাজিক বুনিয়াদ তাঁদের ছিলো না। ফলে বাংলা ভাষার সাথে এসব ভাষা মিশিয়ে মিশেল এক ধরণের কাব্য রচনায় তাঁরা মাতলেন … সুযোগ পেলে তাঁরা আরবীতে লিখতেন, নইলে ফার্সীতে, নিদেন পক্ষে উর্দুতে। কিন্তু যখন দেখা গেলো এর একটাও সামাজিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব নয় তখন বাধ্য হয়েই বাংলা লিখতে এসেছে। কেউ কেউ সন্দ্বীপের আবদুল হাকিমের সেই ‘ যে জন বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী/ সেজন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’ পংক্তিগুলো আউরে বলে থাকেন যে নিজেদের ভাষার প্রতি পুঁথিলেখকদের অপরিসীম দরদ ছিলো। কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। আবদুল হাকিমের এই উক্তির মধ্যে একটা প্রচন্ড ক্ষোভ এবং মর্মবেদনা লক্ষ্য করা যায়। নিশ্চয়ই সে সময়ে এমন লোক ছিলেন যাঁরা সত্যি সত্যি বাংলা ভাষাকে ঘৃণা করতেন। আবদুল হাকিম নিজে সে শ্রেণীভুক্ত নন, তাই সে উঁচু ভাষাতে তাঁর অধিকারও নেই। তাই তিনি তাঁর একমাত্র আদি এবং অকৃত্রিম ভাষাতেই লিখতে প্রবৃত্ত হয়েছেন।১০
সরদার ফজলুল করিম একটি বই লিখেছিলেন প্রফেসর রাজ্জাককে নিয়ে।‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজঃ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক-এর আলাপচারিতা’। সেখানে বাঙালি মুসলমানদের পিছিয়ে পড়ার পেছনে ইংরেজদের ঘাড়ে পুরা দোষ চাপিয়ে মুক্তি খোঁজার ব্যাপারটা রাজ্জাক সাহেব খানিকটা ব্যাখ্যা করেছেন। … ১৮৫৭ –এর পরে ইংরেজরা মুসলমানদের প্রতি সন্দেহপরায়ণ হয়ে তাদের সমস্ত ক্ষেত্র থেকে বাদ দিয়ে দিল আর সে কারণেই মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ল, একথা ঠিক নয়। শিক্ষিত মুসলমানরা বৃটিশ সরকার ও শাসনের সঙ্গে নন কো-অপারেশন করেছিল, একথাও ঠিক নয়।১১ … ১৮১৪ সালে কোলকাতার উকিলদের যে তালিকা আমরা দেখি তাতে দেখা যায় ১৬ জন উকিলের মধ্যে ১৪ জন মুসলমান। ১৮৬৫ সালেও ৫০% উকিল মুসলমান, কিন্তু তারপর থেকে একেবারে শেষ হয়ে যাওয়া শুরু হলো। এর প্রধান কারণ , ইংরেজি শিক্ষার দিকে এই শিক্ষিত মুসলমানরা একেবারেই ঝুঁকলো না।১২ …
মুসলমান সমাজের যে অধঃপতন শুরু হয়েছিল তার প্রকৃত কারণ কী সেই দিকে ছফা তাকালেন গভীরভাবে। পলাশীর যুদ্ধের পর বাঙালি মুসলমানদের নেতৃশ্রেণী কোন সঠিক পথে এগোতে পারেনি। কিন্তু উত্তর ভারতে ঘটেছে তার উল্টো ঘটনা। প্রথমদিকে নেতৃশুন্য থাকলেও পরে স্যার সৈয়দ আহমেদের নেতৃত্বে সেখানকার মুসলমানেরা একটা দৃঢ় অবস্থানে পৌঁছায়। কিন্তু বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে সেটা ঘটে নাই। … প্রায়শঃ হালের একগুঁয়ে ইতিহাস ব্যাখ্যাকারদের মধ্যে একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা বলে থাকেন, বৃটিশ শাসনের আমলে বাংলার মুসলমান সমাজ অধঃপতনের গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। এটা পুরো সত্য তো নয়ই, সিকি পরিমাণ সত্যও এর মধ্যে আছে কিনা সন্দেহ। সত্য বটে, মুসলিম শাসনের অবসানের পর শাসক নেতৃশ্রেণীটির দুর্দশার অন্ত ছিল না। কিন্তু তাদের সঙ্গে সাধারণ বাঙালী মুসলমান জনগণের একমাত্র ধর্ম ছাড়া আর কোন যোগসূত্র ছিলো কি? নবাবী আমলেও এ দেশীয় ফার্সী জানা যে সকল কর্মচারী নিয়োগ করা হতো, তাঁদের মধ্যে স্থানীয় হিন্দু কতোজন ছিলেন এবং কতোজন ছিলেন স্থানীয় মুসলমান, এ সকল বিষয় বিচার করে দেখেন না বলেই অতি সহজে অপবাদের বোঝাটি ইংরেজের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তাঁরা দায়িত্বমুক্ত মনে করেন। উত্তর ভারতে মুসলিম শাসক নেতৃশ্রণী একইভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলেন, অধিকন্তু তাঁদের অনেকেই সিপাহী বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তারপরেও তাঁরা কি করে এগিয়ে আসতে পারলেন এবং তাঁদের মধ্যে সৃষ্টি হলো স্যার সৈয়দ আহমদের মতো একজন মানুষ? বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে তেমন একজন মানুষ জন্মালেন না কেনো? এই সকল বিষয়ের সদুত্তর সন্ধান করলেই বাঙালী মুসলমানের যে মৌলিক সমস্যা তার মূলে যাওয়া যাবে।১৩
কিন্তু কেন? কেন সেই সময়কার বাঙালি মুসলমানরা এক পা এগিয়ে আসতে গিয়ে তিন পা পিছিয়ে যেত? ছফা আমাদেরকে সেগুলো প্রশ্নের আকারে দেন। আর কিয়দাংশে উত্তর ও করেন।
সূত্রবঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যেভাবে মুসলমান বিজেতাদের আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে তাঁদের পররাজ্য লোভী তস্কর, প্রজাপীড়ক, পর ধর্মবিদ্বেষী এবং লুন্ঠনকারী বলে অভিযুক্ত করেছেন, তেমনটি অন্য কোন লেখক করেননি। তথাপি তিনি বিজেতাদের সামরিক শ্রেষ্ঠতার প্রশংসা করেছেন। সুলতান মাহমুদ যে একজন দক্ষ সেনাপতি এবং বিচক্ষণ রণপন্ডিত ছিলেন মেনে নিতে কোন রকম কুন্ঠাবোধ করেননি। আক্রমণকারী মুসলমান রাজাদের সামরিক শক্তির দিক দিয়ে ভারতীয় হিন্দু রাজন্যবর্গ অপেক্ষাকৃত হীনবল ছিলেন এবং তাঁদের সামরিক সংগঠন দুর্বল ছিল, ওগুলো বঙ্কিম অম্লানবদলে কবুল করে নিয়েছেন।১
বঙ্কিমের ব্যক্তিমানসের সাথে তাঁর শিল্পীমানসের দ্বন্দ্ব ছফার চোখ এড়ায়নি-
চাকুরি জীবনে বঙ্কিমের লাঞ্ছনা, পারিবারিক দুর্যোগ, একমাত্র কন্যার অকাল মৃত্যু বঙ্কিমের ব্যক্তিগত জীবনকে হতাশার এমন এক চূড়ান্ত পর্যাতে ঠেলে দিয়েছিলো; একমাত্র ধর্মের মধ্যেই সান্ত্বনা সন্ধান করতে হয়েছিলো। তরুণ বয়সের সাধনা বলে বঙ্কিম চিন্তা করার যে অপূর্ব ক্ষমতা আয়ত্ব করেছিলেন, সেই জিনিশটিকে উল্টোদিকে প্রবাহিত করতে বাধ্য হলেন, বঙ্কিমের জীবনচরিত পাঠক তাঁর বিরুদ্ধে কঠিন অভিযোগ উত্থাপন করার পরও দুঃখবোধ না করে পারবেন না। আহ্! কি আশ্চর্য মানুষ। কি করতে পারতেন , আর কি করলেন।২
বঙ্কিমকে নিয়ে ছফার প্রবন্ধটির হালকা নির্যাস আমার লেখা থেকে কিছুটা পাবেন। মূল লেখাটা পড়লে ছফার চিন্তার পুরো মোকাবিলা সম্ভব।
এবার আসি দ্বিতীয় প্রবন্ধে। বাঙালী(১৯৭৭ সালে প্রকাশিত এই লেখায় বাঙালি বানান করা হয়েছে ঈ-কার করে।ছফার লেখা থেকে করা কোটে ঈ-কার বানানটা অনুসরণ করা হলো) মুসলমানের মন।‘শহীদে কারবালা’ পুঁথির কথা দিয়ে লেখা আরম্ভ করেছেন আহমদ ছফা। সাথে বিবেচনা করেছেন অন্যান্য পুঁথি আর সেগুলোর ভাষ্য নিয়ে। যদ্যপি আমার গুরুতে বঙ্কিমের লেখার সাথে পুঁথির তুলনা করেছেন প্রফেসর রাজ্জাক-
পার্থ চট্টোপাধ্যায় একটা মূল্যবান বই লিখেছিলেন। নামটা জানি কী। তিনি দেখাইছেন, যে সময়ে বঙ্কিমের উপন্যাসগুলো প্রকাশ পাইবার লাগছিল, একই সময়ে বটতলার মুসলমানি পুঁথিগুলাও মুদ্রণযন্ত্রে ছাপা অইয়া বাইর অইতে আছিল। বঙ্কিমের উপন্যাস দুইশ আড়াইশর বেশি ছাপা অইত না। কারণ আধুনিক সাহিত্য পড়ার পাঠক আছিল খুব সীমিত। কিন্তু বইটা পড়লে দেখতে পাইবেন মুসলমানি পুঁথি ছাপা অইতেছিল হাজারে হাজারে। বঙ্কিমের বিষয়বস্তুর সঙ্গে পুঁথির বিষয়বস্তুর তুলনা করলে ডিফারেন্সটা সহজে বুঝতে পারবেন।৩
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের সেই বইয়ের নাম ‘ন্যাশনালিস্ট থট এন্ড দা কলোনিয়াল ওয়ার্ল্ডঃ আ ডেরিভেটিভ ডিসকোর্স’। বইটির অধ্যায় তিন লেখা হয়েছে বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে। এক জায়গা থেকে কিছুটা অনুবাদ করে দিচ্ছি-
সংস্কৃতির সম্পূর্ণ ধারক, মতবাদের তত্ত্বীয় দিক কি বাস্তবজীবনের বুনিয়াদ সব দিক মিলিয়ে হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বঙ্কিমের মনে যে দৃঢ়বিশ্বাস দানা বেঁধেছিল সেটা আধুনিক এয়ুরোপের খাঁটি বস্তুতান্ত্রিক আদর্শের চেয়ে বেশি এথ্নিক ছিল। সময়স্রোতের জঞ্জাল সরিয়ে সংশোধিত, বিকশিত আদর্শবাদী হিন্দুত্বের কথা বলতে চেয়েছেন তিনি।৪ … বঙ্কিম তাঁর শেষের দিকের লেখাগুলোতে আধুনিক ভারতের জাতীয় ধর্মের প্রতিষ্ঠার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। আধ্যাত্মিকতার দখলদারি মনোভাব থেকে মুক্ত হয়ে ক্ষমতার সাথে একটা যুক্তিযুক্ত তত্ত্বের উপর যা খাড়া ছিল।ভারতের সংখ্যাগুরুদেরকে একটা একক জাতীয় সংস্কৃতির তলে একত্রীভূত করতে এই তত্ত্বের আদর্শ কাজ করছিল। আর এই জিনিসের আবিষ্কার করতে গিয়ে বঙ্কিমের চেতনাপ্রবাহে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণার মুখোশ পরে আর চাপা থাকেনি। বঙ্কিম ইসলামের ক্ষমতা ও মহিমার দিকে পশ্চাদ্ধাবনকে ঠিকমতো বুঝে নিতে পেরেছিলেন। কিন্তু এই ধর্মকে তিনি ভেবে নিলেন আধ্যাত্মিক কি এথ্নিক গুণশুন্য।তাঁর আদর্শের বিপরীত ঠাউরে এই ধর্মকে ধরে নিলেন অযৌক্তিক, গোঁড়ামিপূর্ণ, সর্পিল, ভোগবিলাসী আর অনৈতিক।৫
পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের এই লেখা থেকে আরো কিছু অংশের অনুবাদ পরের কিস্তিতে দিবো। সংখ্যাগুরু সমাজের বিশ্লেষণকারী হিসেবে লেখালেখির সাথে সাথে আহমদ ছফা বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের নিয়েও লিখেছেন। তাঁর প্রবন্ধ ‘বঙ্গভূমি আন্দোলন, রাষ্ট্রধর্ম, মুক্তিযুদ্ধঃ বাংলাদেশের হিন্দু ইত্যাকার প্রসঙ্গ’ পড়লে কিছুটা আন্দাজ হবে।পরের কিস্তিতে এই প্রবন্ধের উল্লেখ থাকবে। ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ নিয়ে আলোচনা পরের কিস্তিতেও এগোবে।
আহমদ ছফা বাঙালি মুসলমানের স্বরূপ সন্ধানে সেই কালের লেখকদের বিচার করতে চেয়েছেন। ফলে পুঁথিলেখকদের মনোজগৎ বুঝে নেয়া তাঁর জন্য জরুরী হয়ে ওঠে। ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক ধারার প্রভাব তাঁদের লেখায় এসে গেছে অগোচরে। সেইসব লেখকদের পঠনব্যাপ্তি ছিল খুবই সীমিত। ইসলামের নামে এক পাঁচমিশালী ধারণার বশবর্তী হয়ে তাঁরা লিখে গেছেন। পুঁথিলেখকদের অনেকেরই আরবী ফার্সী জ্ঞান ছিল না, ইসলাম শাস্ত্রে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। তাঁদের লেখায় ঐতিহাসিক তথ্যের যেমন ঘাটতি ছিল, তেমনি সমাজব্যবস্থার প্রচলিত দিক ও উঠে আসেনি। ছফার মুখে শুনি-
হিন্দুদের দেব-দেবী এবং কাব্যোক্ত নায়ক-নায়িকাদের প্রতি মনে মনে একটি বিদ্বেষের দূরস্মৃতিও সক্রিয় ছিলো। কেননা এই দেব-দেবীর পূজারীদের অত্যাচার এবং ঘৃণা থেকে অব্যাহতি পাবার আশায় তাঁদের পূর্বপুরুষেরা প্রথমে বৌদ্ধ ধর্ম এবং পরে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তাই মুসলমান পুঁথিলেখকেরা তাঁদের রচনায় যখনই সুযোগ পেয়েছেন, এই দেব-দেবীর প্রতি তাচ্ছিল্য এবং ঘৃণা প্রকাশ করতে কুন্ঠাবোধ করেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও হিন্দু সমাজের দেব-দেবী, নায়ক-নায়িকার প্রভাব থেকে তাঁদের মন মুক্ত হতে পারেনি। তাই তাঁরা সচেতনভাবে এই দেব-দেবীদের প্রতিস্পর্ধী নায়ক এবং চরিত্র যখন খাড়া করেছেন, এই সৃষ্ট চরিত্র সমূহের মধ্যেই দেব-দেবী নতুনভাবে প্রাণ পেয়েছে। হযরত মুহম্মদ, হযরত আলী, আমীর হামজা, মুহম্মদ হানিফা, বিবি ফাতেমা, জৈগুন বিবি এই চরিত্রসমূহ বিশ্বাসে এবং আচরণে, স্বভাবে চরিত্রে যতো দূর আরব দেশীয়, তার চাইতে বেশি এদেশীয়।তাঁদের মধ্যে যে বুদ্ধিমত্তা এবং হৃদয়াবেগ কাব্যলেখক চাপিয়ে দিয়েছেন তা একান্তভাবেই বঙ্গদেশে প্রচলিত দেব-দেবীর অনুরূপ। বাইরের দিক থেকে দেখলে হয়তো অতোটা মনে হবে না। কিন্তু গভীর দৃষ্টিক্ষেপ করলে তা ধরা না পড়ে যায় না। বিশ্বাস এবং অভিজ্ঞতা সাহিত্যের দুই মুখ্য উপাদান। বিশ্বাস অভিজ্ঞতার নবরূপায়নে সাহায্য করে। আলোকিত বিশ্বাস আলোকিত রূপায়ন ঘটায় এবং অন্ধবিশ্বাস অন্ধরূপায়ন। মুসলমান পুঁথিলেখকদের বিশ্বাসের যে শক্তি তা অনেকটা অন্ধবিশ্বাস, ইসলামী জীবনবোধসমৃদ্ধ বিমূর্ত কোনো ধারণা তাঁদের অনেকের ছিলো না। তাই তাঁদের শিল্পকর্ম অতোটা অকেলাসিত। প্রতি পদে কল্পনা হোঁচট খেয়েছে বলে তাঁদের রচনার শক্তি নেই।আলাওল দৌলত উজীর প্রমুখ মুসলমান কবি উৎকৃষ্ট কাব্যরচনা করতে পেরেছেন। তার কারণ তাঁদের কতিপয় সুযোগ ছিলো।৬
অনগ্রসর জনসমাজ ইসলামের নামে যেসব কথা শুনতে চাইতো পুঁথিলেখকরা সেই অনুসারে লিখতেন। ছফা বিশদ করেছেন এভাবে-
বাঙালী মুসলমান রচিত পুঁথিসাহিত্যে উদ্ভট রসের অতি বেশি ছড়াছড়ি। হিন্দু মহাকাব্য এবং পুরাণসমূহের বীর-বীরাঙ্গনাদের চরিত্রের অপভ্রংশ মুসলিম কবিদের সৃষ্ট বীরদের মধ্যে নতুন করে জীবনলাভ করেছে। তাই পুঁথিসাহিত্যে অগ্রসরমানতার চাইতে প্রতিক্রিয়ার জের অধিক। মনের হীনমন্যতাবোধ থেকেই এই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি।এর পেছনে একগুচ্ছ ঐতিহাসিক কারণ বর্তমান। মুসলমান পুঁথিলেখকরা সচেতনভাবে এক সামাজিক আদর্শ থেকে বেরিয়ে এসে আরেকটি সামাজিক আদর্শ, একটি শিল্পাদর্শের বদলে আরেকটি শিল্পাদর্শ নির্মাণের প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু নতুন শিল্পাদর্শটির চেহারা কি রকম হবে, জীবনের কোন মূল্যচেতনার বাহন হবে, অতীতের কতোদূর গ্রহণ করবে, কতোদূর বর্জন করবে, সে সম্বন্ধে তাঁদের মনে কোন পরিচ্ছন্ন ধারণা ছিলো না। তাই তাঁরা অনেক সময়ে বহিরঙ্গের দিক দিয়ে নতুন সৃষ্টি করলেও, আসলে তা ছিলো গলিত অতীতেরই রকমফের। উপলব্ধির বদলে বিক্ষোভ, পরিচ্ছন্ন চিন্তার বদলে ভাবাবেগই তাঁদের শিল্পদৃষ্টিকে কুয়াশাচ্ছন্ন করে রেখেছে।এক সময়ে এই মুসলমানের পূর্ব পুরুষেরা যে উঁচু বর্ণের হিন্দুদের দ্বারা নির্যাতিত হয়েছিলেন, এই অপমানজনক দূরস্মৃতি বাইবেলের ‘অরিজিনাল সীন’ বা আদি পাপের ধারণার মতো তাঁদের মনে নিরন্তর জাগরূক থেকেছে। মুসলমান রচিত পুঁথিসাহিত্যের প্রতিক্রিয়াশীলতা আসলে সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতারই সাহিত্যিক রূপায়ন। সে বিষয়টির স্মরণে রাখার প্রয়োজন আছে। মুসলিম শাসনের অবসানের পর এই সামাজিক প্রতিক্রিয়া আরো গভীর এবং অন্তর্মুখী রূপ পরিগ্রহ করে। এই প্রতিক্রিয়ার জের বাঙালী মুসলমান সমাজে এতো সুদূরপ্রসারী হয়েছে যে উনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী গদ্য লেখক মীর মশাররফ হোসেনের সুবিখ্যাত ‘বিষাদ সিন্ধু’ গ্রন্থটিতে ও ‘শহীদে কারবালা’ পুঁথির ব্রাহ্মণ আজরকে একই চেহারার, একই পোষাকে, একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। সময়ের পালাবদলের পালা ব্যাপারটি এই অত্যন্ত শক্তিধর লেখকের মনে সামান্যতম আঁচড়ও কাটতে পারেনি।৭
প্রতিক্রিয়াশীলতার জন্ম কিভাবে হয় ছফা তার ইতিহাস বুঝে নিতে চেয়েছেন। ছফা কী কখনো ভেবেছিলেন তাঁর গায়েও প্রতিক্রিয়াশীলতার তকমা সাঁটবে কেউ কেউ। যদ্যপি আমার গুরু বইয়ের শুরুতে ছফা লেখেছিলেন-“ যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়ি বাড়ি যায় / তথাপি তাহার নাম নিত্যানন্দ রায়”। মাঝে মাঝে বোধহয় ইশারাই কাফি।
পুঁথিলেখকরা যেভাবে অজানা বিষয়ের দিকে অন্ধভাবে ধাবিত হয়েছিল। হিন্দু লেখকদের কিন্তু তা করতে হয় নি। সামাজিক অভিজ্ঞতাকে তাঁরা লেখায় ঠিকমতো আনতে পেরেছিলেন। আত্মপ্রত্যয়ের সাথেই। ইসলামের আসল স্বরূপ, তার দার্শনিক অবলোকন পুঁথিওয়ালারা করেছে লোকশ্রুতি কি দূরকল্পনা থেকে … নবদীক্ষিত মুসলমানদের বেশীর ভাগই ছিল নিম্নবর্ণের হিন্দু, তাই আর্য সংস্কৃতিরও যে বিশ্বদৃষ্টি এবং জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে যে একটা প্রসারিত বোধ ছিলো, বর্ণাশ্রম ধর্মের কড়াকড়ির দরুণ ইসলাম কিংবা বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণের পূর্বে সে সম্বন্ধেও তাঁদের মনে কোনো ধারণা জন্মাতে পারেনি। পাশাপাশি ইসলামও যে একটা উন্নততরো দীপ্ত ধারার সভ্যতা এবং মহীয়ান সংস্কৃতির বাহন হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে একটা সামাজিক বিপ্লব সাধন করেছিলো, বাঙালী মুসলমানের মনে তার কোনো গভীরাশ্রয়ী প্রভাবও পড়েনি বললেই চলে।৮ … এয়ুরোপীয় রেনেসাঁয় মুসলমানদের যে অবদান তার ছোঁয়া ভারতবর্ষের মুসলমানদের উপর একবারেই লাগেনি। ইসলামের প্রকৃত ব্যাখ্যার ছিঁটেফোটা বাঙাল মুলুকে লাগে নি বলে ছফা রায় দিয়েছেন … নতুন ধর্ম গ্রহণ করার পরে স্থানীয় মুসলমানরা ইংরেজ আমলের দিশী খ্রিষ্টানদের মতো একটা উন্মত্ত গর্ববোধ ছাড়া ইসলামী কিংবা আর্য সংস্কৃতির কিছুই লাভ করতে পারেননি।৯… আরবী, ফার্সি কি উর্দুর প্রতি টান ছিল পুঁথিপত্রের লেখকদের। কিন্তু এই ভাষাগুলোকে পূর্ণরূপে রপ্ত করার মতো আর্থিক এবং সামাজিক বুনিয়াদ তাঁদের ছিলো না। ফলে বাংলা ভাষার সাথে এসব ভাষা মিশিয়ে মিশেল এক ধরণের কাব্য রচনায় তাঁরা মাতলেন … সুযোগ পেলে তাঁরা আরবীতে লিখতেন, নইলে ফার্সীতে, নিদেন পক্ষে উর্দুতে। কিন্তু যখন দেখা গেলো এর একটাও সামাজিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব নয় তখন বাধ্য হয়েই বাংলা লিখতে এসেছে। কেউ কেউ সন্দ্বীপের আবদুল হাকিমের সেই ‘ যে জন বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী/ সেজন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’ পংক্তিগুলো আউরে বলে থাকেন যে নিজেদের ভাষার প্রতি পুঁথিলেখকদের অপরিসীম দরদ ছিলো। কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। আবদুল হাকিমের এই উক্তির মধ্যে একটা প্রচন্ড ক্ষোভ এবং মর্মবেদনা লক্ষ্য করা যায়। নিশ্চয়ই সে সময়ে এমন লোক ছিলেন যাঁরা সত্যি সত্যি বাংলা ভাষাকে ঘৃণা করতেন। আবদুল হাকিম নিজে সে শ্রেণীভুক্ত নন, তাই সে উঁচু ভাষাতে তাঁর অধিকারও নেই। তাই তিনি তাঁর একমাত্র আদি এবং অকৃত্রিম ভাষাতেই লিখতে প্রবৃত্ত হয়েছেন।১০
সরদার ফজলুল করিম একটি বই লিখেছিলেন প্রফেসর রাজ্জাককে নিয়ে।‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজঃ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক-এর আলাপচারিতা’। সেখানে বাঙালি মুসলমানদের পিছিয়ে পড়ার পেছনে ইংরেজদের ঘাড়ে পুরা দোষ চাপিয়ে মুক্তি খোঁজার ব্যাপারটা রাজ্জাক সাহেব খানিকটা ব্যাখ্যা করেছেন। … ১৮৫৭ –এর পরে ইংরেজরা মুসলমানদের প্রতি সন্দেহপরায়ণ হয়ে তাদের সমস্ত ক্ষেত্র থেকে বাদ দিয়ে দিল আর সে কারণেই মুসলমানরা পিছিয়ে পড়ল, একথা ঠিক নয়। শিক্ষিত মুসলমানরা বৃটিশ সরকার ও শাসনের সঙ্গে নন কো-অপারেশন করেছিল, একথাও ঠিক নয়।১১ … ১৮১৪ সালে কোলকাতার উকিলদের যে তালিকা আমরা দেখি তাতে দেখা যায় ১৬ জন উকিলের মধ্যে ১৪ জন মুসলমান। ১৮৬৫ সালেও ৫০% উকিল মুসলমান, কিন্তু তারপর থেকে একেবারে শেষ হয়ে যাওয়া শুরু হলো। এর প্রধান কারণ , ইংরেজি শিক্ষার দিকে এই শিক্ষিত মুসলমানরা একেবারেই ঝুঁকলো না।১২ …
মুসলমান সমাজের যে অধঃপতন শুরু হয়েছিল তার প্রকৃত কারণ কী সেই দিকে ছফা তাকালেন গভীরভাবে। পলাশীর যুদ্ধের পর বাঙালি মুসলমানদের নেতৃশ্রেণী কোন সঠিক পথে এগোতে পারেনি। কিন্তু উত্তর ভারতে ঘটেছে তার উল্টো ঘটনা। প্রথমদিকে নেতৃশুন্য থাকলেও পরে স্যার সৈয়দ আহমেদের নেতৃত্বে সেখানকার মুসলমানেরা একটা দৃঢ় অবস্থানে পৌঁছায়। কিন্তু বাঙালি মুসলমানদের ক্ষেত্রে সেটা ঘটে নাই। … প্রায়শঃ হালের একগুঁয়ে ইতিহাস ব্যাখ্যাকারদের মধ্যে একটা প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাঁরা বলে থাকেন, বৃটিশ শাসনের আমলে বাংলার মুসলমান সমাজ অধঃপতনের গভীর পঙ্কে নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। এটা পুরো সত্য তো নয়ই, সিকি পরিমাণ সত্যও এর মধ্যে আছে কিনা সন্দেহ। সত্য বটে, মুসলিম শাসনের অবসানের পর শাসক নেতৃশ্রেণীটির দুর্দশার অন্ত ছিল না। কিন্তু তাদের সঙ্গে সাধারণ বাঙালী মুসলমান জনগণের একমাত্র ধর্ম ছাড়া আর কোন যোগসূত্র ছিলো কি? নবাবী আমলেও এ দেশীয় ফার্সী জানা যে সকল কর্মচারী নিয়োগ করা হতো, তাঁদের মধ্যে স্থানীয় হিন্দু কতোজন ছিলেন এবং কতোজন ছিলেন স্থানীয় মুসলমান, এ সকল বিষয় বিচার করে দেখেন না বলেই অতি সহজে অপবাদের বোঝাটি ইংরেজের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে তাঁরা দায়িত্বমুক্ত মনে করেন। উত্তর ভারতে মুসলিম শাসক নেতৃশ্রণী একইভাবে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছিলেন, অধিকন্তু তাঁদের অনেকেই সিপাহী বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তারপরেও তাঁরা কি করে এগিয়ে আসতে পারলেন এবং তাঁদের মধ্যে সৃষ্টি হলো স্যার সৈয়দ আহমদের মতো একজন মানুষ? বাংলাদেশের মুসলমানদের মধ্যে তেমন একজন মানুষ জন্মালেন না কেনো? এই সকল বিষয়ের সদুত্তর সন্ধান করলেই বাঙালী মুসলমানের যে মৌলিক সমস্যা তার মূলে যাওয়া যাবে।১৩
কিন্তু কেন? কেন সেই সময়কার বাঙালি মুসলমানরা এক পা এগিয়ে আসতে গিয়ে তিন পা পিছিয়ে যেত? ছফা আমাদেরকে সেগুলো প্রশ্নের আকারে দেন। আর কিয়দাংশে উত্তর ও করেন।
১। আহমদ ছফার প্রবন্ধ – (ষ্টুডেণ্ট ওয়েজ , জানুয়ারী ২০০০) [পৃষ্ঠা ৪১]
২। [পৃষ্ঠা ৪২]
৩। যদ্যপি আমার গুরু – আহমদ ছফা (মাওলা ব্রাদার্স , মে ২০০০) [পৃষ্ঠা ৫৯]
৪। Nationalist Thought and The Colonial World, Partha Chatterjee (London, ZED Books Ltd., 1986 ) [Page 77]
৫। [Page 77]
৬। আহমদ ছফার প্রবন্ধ – (ষ্টুডেণ্ট ওয়েজ , জানুয়ারী ২০০০) [পৃষ্ঠা ৫৬]
৭। [পৃষ্ঠা ৫৭-৫৮] ৮। [পৃষ্ঠা ৫৮] ৯।[পৃষ্ঠা ৫৯] ১০। [পৃষ্ঠা ৬১]
১১। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজঃ অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক-এর আলাপচারিতা –
সরদার ফজলুল করিম (সাহিত্য প্রকাশ, জুন ২০০০) [পৃষ্ঠা ১৮]
১২। [পৃষ্ঠা ১৯]
১৩। আহমদ ছফার প্রবন্ধ – (ষ্টুডেণ্ট ওয়েজ , জানুয়ারী ২০০০) [পৃষ্ঠা ৬১]
গড় রেটিং
(৫ ভোট)
লিখেছেন শুভাশীষ দাশ (তারিখ: সোম, ২০০৯-১১-৩০ ০১:১৯)
উদ্ধৃতি | শুভাশীষ দাশ এর ব্লগ | ৪৩টি মন্তব্য | ৯৮১বার পঠিত
শেয়ার
উদ্ধৃতি | শুভাশীষ দাশ এর ব্লগ | ৪৩টি মন্তব্য | ৯৮১বার পঠিত
শেয়ার
প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, সচলায়তন কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনভাবেই দায়ী নন।
লেখকের এবং মন্তব্যকারীর লেখায় অথবা প্রোফাইলে পরিষ্কারভাবে লাইসেন্স প্রসঙ্গে কোন উল্লেখ না থাকলে স্ব-স্ব লেখার এবং মন্তব্যের সর্বস্বত্ব সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের বা মন্তব্যকারী কর্তৃক সংরক্ষিত থাকবে। লেখকের বা মন্তব্যকারীর অনুমতি ব্যতিরেকে লেখার বা মন্তব্যের আংশিক বা পূর্ণ অংশ কোন ধরনের মিডিয়ায় পুনঃপ্রকাশ করা যাবে না।
১
লেখা খুবই ভালো হচ্ছে। আপনার লেখার মাধ্যমে ছফাগিরিকে অনেক দূর পর্যন্ত আপনাকে টানতে হবে।
উদ্ধৃতি | জবাব | -
৩
লিখতে থাকুন । বেশ ভালো একটা এ্যাকাডেমিক ধাঁচের সিরিজ পাচ্ছি । পরবর্তী পর্বের অপেক্ষায় থাকলাম ।
৪
হাসিব ভাইয়ের সাথে একমত ।
নুরুজ্জামান মানিক
*******************************************
বলে এক আর করে আর এক যারা
তারাই প্রচণ্ড বাঁচা বেঁচে আছে দাপটে হরষে
এই প্রতারক কালে (মুজিব মেহদী)
নুরুজ্জামান মানিক
*******************************************
বলে এক আর করে আর এক যারা
তারাই প্রচণ্ড বাঁচা বেঁচে আছে দাপটে হরষে
এই প্রতারক কালে (মুজিব মেহদী)
৫
হাসিব ভাই,
থ্যাংকস।
মানিক ভাই,
থ্যাংকস।
মানিক ভাই,
একটা হেল্প দরকার। মাসিক চিন্তার ছফাকে নিয়ে সংখ্যাটা দরকার। স্ক্যান করে পাঠানোর কোন উপায় কি আছে?
মন্তব্যের জন্য থ্যাংকস। ১০
পড়ছি। ভালো লাগছে। সে সঙ্গে জানতে পারছি অনেক নতুন কিছু। ধন্যবাদ।
.
____________________________________
ব্যাকুল প্রত্যাশা উর্ধমুখী; হয়তো বা কেটে যাবে মেঘ।
দূর হবে শকুনের ছাঁয়া। কাটাবে আঁধার আমাদের ঘোলা চোখ
আলোকের উদ্ভাসনে; হবে পুন: পল্লবীত বিশুষ্ক বৃক্ষের ডাল।
.
____________________________________
ব্যাকুল প্রত্যাশা উর্ধমুখী; হয়তো বা কেটে যাবে মেঘ।
দূর হবে শকুনের ছাঁয়া। কাটাবে আঁধার আমাদের ঘোলা চোখ
আলোকের উদ্ভাসনে; হবে পুন: পল্লবীত বিশুষ্ক বৃক্ষের ডাল।
১২
আলোচনায় শামিল হবার সামর্থ না থাকলেও পড়ছি আপনার চমৎকার লেখাগুলো।

________________________________
তবু ধুলোর সাথে মিশে যাওয়া মানা
________________________________
তবু ধুলোর সাথে মিশে যাওয়া মানা
১৩
ছফাসমগ্র কিনে পড়া ধরেন। আলোচনায় আসতে পারবেন ইজিলি।
১৪
আপনার লেখা নিরাশ করছে না, নানা কিছু জানছি। ছফার উপর আপনার দখল আছে। লিখে যেতে থাকেন ছফাকে নিয়ে, একদম থামবেন না। আমি, আমরা আপনার লেখার জন্য সচলায়তনে ঢুঁ মারছি প্রতিদিন। আরো লেখা নামানোর জন্য আগেভাগে ধন্যবাদ দিয়ে রাখছি।
১৮
ছফাকে নিয়ে এতো কম আলোচনা হয়, সেই পরিপ্রেক্ষিতে জোস হচ্ছে। সেই সাথে আপনার এনালাইসিস। আবার প্রিয়তে নিলাম। বইগুলো বড্ড মিস করছি।
********************************************************
আমার লেখায় বানান এবং বিরাম চিহ্নের সন্নিবেশনের ভুল থাকলে দয়া করে ধরিয়ে দিন।
********************************************************
আমার লেখায় বানান এবং বিরাম চিহ্নের সন্নিবেশনের ভুল থাকলে দয়া করে ধরিয়ে দিন।
১৯
আমি মনে করতাম বাংলাদেশের নয়া জেনারেশন ছফার লেখার সাথে পরিচিত। সচলে ছফাগিরি ছাপানোর পর মন্তব্যের বহর দেখে বুঝলাম , ছফা কেউ পড়েই নাই। এটা অনেক ডিসটার্বিং একটা বিষয়। লোকজন বাংলা ভাষায় লিখে লিখে পাতা ভরিয়ে ফেলছে, কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর ইনটিগ্রিটিওয়ালা লেখকের লেখা পড়ছে না- এটা মানা কষ্টকর।
২০
ঠিক বলেছেন। আমার মনে আছে আমি ছফার বই প্রথম পড়েছি ; 'গাভীবৃন্তান্ত'---বুয়েটের ২য় বর্ষের পি এল এ। আমার মনে আছে বইটি শেষ করে অনেকক্ষণ
বসেছিলাম। মনে হইছিলো মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পর আরেক জন মনে হয় বাংলা শিত্যে এলেন যে মনোস্তাত্তিক বিশ্লেষণের সাথে কোনো গল্পের প্লটের গাঁথুনি তৈরি করতে পারেন। আর বইএর ঘটনাগুলো এতো নির্মম ভাবে সত্যি ছিলো----আমার খুব হাসি পেয়েছিলো চরিত্র গুলোর সাথে পরিচিত আংকেল আন্টির মিল পেয়েছিলাম।
********************************************************
আমার লেখায় বানান এবং বিরাম চিহ্নের সন্নিবেশনের ভুল থাকলে দয়া করে ধরিয়ে দিন।
বসেছিলাম। মনে হইছিলো মানিক বন্দোপাধ্যায়ের পর আরেক জন মনে হয় বাংলা শিত্যে এলেন যে মনোস্তাত্তিক বিশ্লেষণের সাথে কোনো গল্পের প্লটের গাঁথুনি তৈরি করতে পারেন। আর বইএর ঘটনাগুলো এতো নির্মম ভাবে সত্যি ছিলো----আমার খুব হাসি পেয়েছিলো চরিত্র গুলোর সাথে পরিচিত আংকেল আন্টির মিল পেয়েছিলাম।
********************************************************
আমার লেখায় বানান এবং বিরাম চিহ্নের সন্নিবেশনের ভুল থাকলে দয়া করে ধরিয়ে দিন।
২৩
খুবই দারুণ। নিজেরে একা মনে কইরেন না, লগে আছি।
২৪
আপনি লগে আছেন দেইখা ভালা লাগলো। মন্তব্যে অংশ নেন। একা একা সবাইরে জবাব দেওন তো টাফ। আর সব বইও লগে নাই।
২৭
এই তৃতীয় পর্বে এসে আপনার লেখাটা জমতে শুরু করেছে। এগুতে থাক....
গত বইমেলাতে খান ব্রাদার্স এন্ড কোম্পনি-এর প্রকাশনায় প্রথম সমগ্র আহমদ ছফা রচনাবলী (৮ খণ্ডে সমগ্র) চোখে পড়তেই চোখ বন্ধ করে নিয়ে এসেছিলাম নিবিড় পাঠ করার নিভৃত ইচ্ছা নিয়ে। আগে ছুটকা-ছাটকা দুয়েকটা ছফা পড়েছিলাম অবশ্য। সেটা কোন বিবেচনায়ই যথেষ্ট নয়। তাই গোটা সমগ্র নিয়ে লেগে পড়বো পড়বো করেও এখনো বইয়ের কড়কড়ে গন্ধ তেমনি রয়ে গেছে। বুকসেলফ আলো করে রাখা খণ্ডগুলো এখন চোখ টাটাচ্ছে অদ্ভুতভাবে। মনে হচ্ছে এবার শুরু করে দিতে হবে অন্য সব বাদ দিয়ে। সে পর্যন্ত কোন মন্তব্য করার সাহস পাচ্ছি না। তবে কৌতুহলী পাঠক হিসেবে আপনাকে অনুসরণ করে যাচ্ছি এবং ধুন্ধুমার মন্তব্যগুলোর চমৎকারিত্বও উপভোগ করছি, এটা এই পর্বে এসে জানান দিয়ে রাখলাম।
খুব সংবেদনশীল বিষয়-চর্চা হাতে তুলে নিয়েছেন। আশা করছি প্রয়োজনীয় মনোনিবেশ ও সতর্কতায় ঘাটতি হবে না। আর লেখাকে জোর করে ছেটে দিয়ে ছোট করারও দরকার নেই। বরং এসব লেখার দীর্ঘতায়ই রস জমে ভালো। স্বতঃস্ফূর্তভাবে যেভাবে আগায় আগাতে থাক। চলুক না, দেখা যাক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় !
অনেক ধন্যবাদ।
-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’
গত বইমেলাতে খান ব্রাদার্স এন্ড কোম্পনি-এর প্রকাশনায় প্রথম সমগ্র আহমদ ছফা রচনাবলী (৮ খণ্ডে সমগ্র) চোখে পড়তেই চোখ বন্ধ করে নিয়ে এসেছিলাম নিবিড় পাঠ করার নিভৃত ইচ্ছা নিয়ে। আগে ছুটকা-ছাটকা দুয়েকটা ছফা পড়েছিলাম অবশ্য। সেটা কোন বিবেচনায়ই যথেষ্ট নয়। তাই গোটা সমগ্র নিয়ে লেগে পড়বো পড়বো করেও এখনো বইয়ের কড়কড়ে গন্ধ তেমনি রয়ে গেছে। বুকসেলফ আলো করে রাখা খণ্ডগুলো এখন চোখ টাটাচ্ছে অদ্ভুতভাবে। মনে হচ্ছে এবার শুরু করে দিতে হবে অন্য সব বাদ দিয়ে। সে পর্যন্ত কোন মন্তব্য করার সাহস পাচ্ছি না। তবে কৌতুহলী পাঠক হিসেবে আপনাকে অনুসরণ করে যাচ্ছি এবং ধুন্ধুমার মন্তব্যগুলোর চমৎকারিত্বও উপভোগ করছি, এটা এই পর্বে এসে জানান দিয়ে রাখলাম।
খুব সংবেদনশীল বিষয়-চর্চা হাতে তুলে নিয়েছেন। আশা করছি প্রয়োজনীয় মনোনিবেশ ও সতর্কতায় ঘাটতি হবে না। আর লেখাকে জোর করে ছেটে দিয়ে ছোট করারও দরকার নেই। বরং এসব লেখার দীর্ঘতায়ই রস জমে ভালো। স্বতঃস্ফূর্তভাবে যেভাবে আগায় আগাতে থাক। চলুক না, দেখা যাক কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় !
অনেক ধন্যবাদ।
-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’
২৯
বস,
আপনার লেখা দুর্দান্ত ভালো হচ্ছে। নিয়মিত ছফাগিরি নিয়ে লেখা নামান।
আপনার লেখা দুর্দান্ত ভালো হচ্ছে। নিয়মিত ছফাগিরি নিয়ে লেখা নামান।
৩১
ছফা পড়তে পড়তে আমরা একটা ঝাঁপসা (কিংবা নিজের মতো পরিষ্কার) ধারণা হয়েছিল যে বর্তমান বাংলাদেশের চিন্তাস্রোতকে একমাত্র ছফাই স্কেচ করতে করতে পেরেছেন সরাসরিভাবে (গ্রহণীয় হোক কিংবা বর্জনীয়)
কিন্তু ধারণাটাকে কোনোদিন সমীকরণ করা হয়নি
আপনার এই সিরিজি আমার ধারণা সেই সমীকরণটাই করছে
কিন্তু ধারণাটাকে কোনোদিন সমীকরণ করা হয়নি
আপনার এই সিরিজি আমার ধারণা সেই সমীকরণটাই করছে
৩২
লীলেন ভাই,
মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। ঠিক বলছেন, ছফাই পারে ঠিকঠাক স্কেচ করতে। ছফার মতো বড় মাপের কাউকে ধরার জন্য আমি তথ্যসূত্র দিতে পারি, এর বেশী কিছু না। তাঁর চিন্তাধারাকে সমীকরণে ফেলার যোগ্যতা আমার নেই।
৩৩
মোরশেদ শফিউল হাসানের একটা বই পড়লাম সম্প্রতি- "ছফা ভাই- আমার দেখা আমার চেনা"...। সেই বর্ণনা এবং আপনার সিরিজের থেকে সে সময়ের পটে একজন মৌলিক মানুষের রুপ বেরিয়ে আসছে।
... চলুক।
_________________________________________
সেরিওজা
... চলুক।
_________________________________________
সেরিওজা
৩৪
শফিউল সাহেবের বইটা পড়ছিলাম। চলে। আমি এখানে উছিলা ছাড়া আর কিছু না। পারলে টাকা জমিয়ে ছফাসমগ্র কিনে পড়েন। ছফাকে বুঝতে চাইলে তাঁর নিজের জবানে পড়তে হবে।
৩৫
এই সিরিজটা অনেক মনোযোগ দাবী করে।
আপনার কল্যানে ছফা পুনঃপাঠের সুযোগ হলো।
কৃতজ্ঞতা। চলুক।
-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।
আপনার কল্যানে ছফা পুনঃপাঠের সুযোগ হলো।
কৃতজ্ঞতা। চলুক।
-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।
৩৭
পড়ছি, ভালো লাগছে।
৩৯
উদ্ধৃতি
এই "কেউ কেউ" দের ছফা বিরোধীতার মূলে আছে রাজনীতি যে রাজনীতি ছফার লাশ কবরস্থ করা নিয়ে করেছে ইতরামি । প্রতিক্রিয়াশীলতার জন্ম কিভাবে হয় ছফা তার ইতিহাস বুঝে নিতে চেয়েছেন। ছফা কী কখনো ভেবেছিলেন তাঁর গায়েও প্রতিক্রিয়াশীলতার তকমা সাঁটবে কেউ কেউ। যদ্যপি আমার গুরু বইয়ের শুরুতে ছফা লেখেছিলেন-“ যদ্যপি আমার গুরু শুঁড়ি বাড়ি যায় / তথাপি তাহার নাম নিত্যানন্দ রায়”। মাঝে মাঝে বোধহয় ইশারাই কাফি।
আপনার সিরিজ শেষ হলে আপনার লেখা আর সচলদের মন্তব্য- প্রতিমন্তব্যে যে বিষয়গুলি উঠে এসেছে সে ব্যাপারে আমার বক্তব্য প্রকাশ করবো পাঠ প্রতিক্রিয়া হিসেবে । আমি নিয়মিত সিরিজে নজর রাখছি কিন্তু ব্যক্তিগত কারনে এখন বিশদে যাবার উপায় নেই ।
আপাতত স্বাধীন বাংলার প্রথম পতাকার নকঁশাকার শিবনারায়ন দাশের দুই লাইন নিচে দিলামঃ
উদ্ধৃতি
নুরুজ্জামান মানিক"আমি নিজে প্রগতিশীল বাম রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত সেই ছাত্রজীবন থেকে । কিন্তু অসাম্প্রদায়িক বা প্রগতিশীল মানুষ শুধু বক্তৃতার মঞ্চে বা টিভি স্ক্রিনে পেয়েছি । প্রতিদিনের জীবন চর্চায় আমি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল মানুষ আমার জীবনে দু’জনকে পেয়েছিলামঃ এক ) আমার রাজনৈতিক গুরু শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত , দুই, আহমদ ছফা । "
*******************************************
বলে এক আর করে আর এক যারা
তারাই প্রচণ্ড বাঁচা বেঁচে আছে দাপটে হরষে
এই প্রতারক কালে (মুজিব মেহদী)
৪০
মানিক ভাই,
অনেক ধন্যবাদ আপনার মন্তব্যের জন্য। ব্যক্তি ছফা লেখক ছফাকে বুঝে নেয়ার জন্য আস্তে আস্তে এগোনো ভালো। কিস্তিটা কতোদূর টানবো বুঝতে পারছি না। আপনি সময় করে মন্তব্য করে যাবেন এই আশা রাখছি। এবং বিশদে।
শিবনারায়ন দাশের কথাটা উল্লেখ করার জন্য ধন্যবাদ।
মাসিক চিন্তার ছফা সংখ্যাটা খুব দরকার। কিছু কি করা যায়?
শিবনারায়ন দাশের কথাটা উল্লেখ করার জন্য ধন্যবাদ।
মাসিক চিন্তার ছফা সংখ্যাটা খুব দরকার। কিছু কি করা যায়?
৪১
সচলে আসতে পারি না অনেকদিন ! একটা লেখাও ঠিক মতো পড়া যাচ্ছে না। দৌড় না তো পুরো ম্যারাথনের উপরে আছি । তবু, তবু শুভাশীষ, আপনার এই সিরিজের সব ক'টি পর্বই পড়া হয়েছে ক য়ে ক বার করে !!!
সচলে তো বটেই, এমনিতেও এমন মনোযোগ দিয়ে কোন লেখা পড়া হয় নি বহু বহুদিন !
মানিক ভাইর কথা কোট করেই বলি, 'আপনার সিরিজ শেষ হলে আপনার লেখা আর সচলদের মন্তব্য- প্রতিমন্তব্যে যে বিষয়গুলি উঠে এসেছে সে ব্যাপারে আমার বক্তব্য প্রকাশ করবো পাঠ প্রতিক্রিয়া হিসেবে '
তবু একটা গল্প মনে পড়লো । পাড়ার ক্রিকেটে এক বড় ভাই বেদম ছক্কা মারতো । ডিপ স্কয়ার লেগ কি, লং অফে ফিল্ডিং করার কালে যখন মাথার উপর দিয়ে বল বাইরে গেলো, শুধু আমি কেন প্রায় সবাই বলতাম , ছক্কা হইছে ঠিক, কিন্তু তোমার এই শট কিন্তু ঠিক হয় নাই ! মাঠ ছোট বলে বাইচ্চ্যা গেলা ।
কিন্তু মনে মনে জানতাম, এই মাঠ কেন ওয়ন্ডারার্স হলেও এটা ছক্কাই হতো। মুখে বলতাম না, ('আসলে মাথার উপর দিয়া গেছে তো ! " )
আহমদ ছফা মনে হয় আমাদের সেই বুজুর্গ ছক্কা পেঠানো লেখক, যার বলগুলো ক্রমশই মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে আমাদের !
তাকে মাটিতে নামিয়ে আনার হিম্মতওয়ালা ফিল্ডার যে আমরা এখনো হই নি ___ সেটা আমাদের মনেই থাকে না !
আপনাকে ধন্যবাদ ,শুভাশীষ ।
---------------------------------------------------------
তুমি এসো অন্যদিন,অন্য লোক লিখবে সব
আমি তো সংসারবদ্ধ, আমি তো জীবিকাবদ্ধ শব !
সচলে তো বটেই, এমনিতেও এমন মনোযোগ দিয়ে কোন লেখা পড়া হয় নি বহু বহুদিন !
মানিক ভাইর কথা কোট করেই বলি, 'আপনার সিরিজ শেষ হলে আপনার লেখা আর সচলদের মন্তব্য- প্রতিমন্তব্যে যে বিষয়গুলি উঠে এসেছে সে ব্যাপারে আমার বক্তব্য প্রকাশ করবো পাঠ প্রতিক্রিয়া হিসেবে '
তবু একটা গল্প মনে পড়লো । পাড়ার ক্রিকেটে এক বড় ভাই বেদম ছক্কা মারতো । ডিপ স্কয়ার লেগ কি, লং অফে ফিল্ডিং করার কালে যখন মাথার উপর দিয়ে বল বাইরে গেলো, শুধু আমি কেন প্রায় সবাই বলতাম , ছক্কা হইছে ঠিক, কিন্তু তোমার এই শট কিন্তু ঠিক হয় নাই ! মাঠ ছোট বলে বাইচ্চ্যা গেলা ।
কিন্তু মনে মনে জানতাম, এই মাঠ কেন ওয়ন্ডারার্স হলেও এটা ছক্কাই হতো। মুখে বলতাম না, ('আসলে মাথার উপর দিয়া গেছে তো ! " )
আহমদ ছফা মনে হয় আমাদের সেই বুজুর্গ ছক্কা পেঠানো লেখক, যার বলগুলো ক্রমশই মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে আমাদের !
তাকে মাটিতে নামিয়ে আনার হিম্মতওয়ালা ফিল্ডার যে আমরা এখনো হই নি ___ সেটা আমাদের মনেই থাকে না !
আপনাকে ধন্যবাদ ,শুভাশীষ ।
---------------------------------------------------------
তুমি এসো অন্যদিন,অন্য লোক লিখবে সব
আমি তো সংসারবদ্ধ, আমি তো জীবিকাবদ্ধ শব !
৪২
আপনার মন্তব্যের প্রতি-মন্তব্য কি হতে পারে সেটা অনেকক্ষণ ভাবলাম। কোন কিনারা হলো না। অনেক কয়বার পড়ছেন সেটা শুনেই মন ভরে গেল। ছফাকে সহজ করে দাঁড় করানোর এলেম আমার নেই। আমি যা লিখছি সেটা আদতে ছফাগিরি না, বলা যায় ছফাগিরি বোঝার প্রচেষ্টা।
ভালো থাকবেন। ৪৩
ছফাগিরি। কিস্তি চার।
লিখেছেন শুভাশীষ দাশ (তারিখ: বিষ্যুদ, ২০০৯-১২-১০ ২১:২২)
লেখাটির মুল লিংক--http://www.sachalayatan.com/subasish/29158
আগের কিস্তিগুলোর পরিচয় সংক্ষেপে একটু দিয়ে নিই। প্রথম কিস্তিতে প্রফেসর রাজ্জাকের সাথে আহমদ ছফার মনীষার কান্তি বোঝাতে বিস্তর বইয়ের লিস্টি দিয়েছি। সেই কালে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাক আরো অনেকের মতোই মুসলিম লীগকে সমর্থন করেছিলেন। স্বাধীনতার পরে অনেকেই বেমালুম অস্বীকার করে গেলেন তাঁদের মুসলিম লীগকে সমর্থন করার বিষয়কে। প্রফেসর রাজ্জাক সেটা করেননি। পশ্চিম পাকিস্তানের ফ্যাসিস্ট আচরণ দেখে রাজ্জাক সাহেব তাঁর বিশ্বাস থেকে সরে এসেছিলেন এটা প্রমাণ করার জন্য কোন প্রামাণ্যচিত্রের প্রয়োজন পড়ে না। প্রফেসর রাজ্জাকের মতোন ব্যক্তিত্ব তাঁর ঋজুতা দিয়ে এই ব্যাখ্যা সারেন। সাথে যোগ হয় আপাদমস্তক সেক্যুলার আহমদ ছফার রাজ্জাকগিরি। তাই ছফার রায়ে আবদুর রাজ্জাককে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা বলাকে তথ্য হিসেবে যোগ করেছি আমাদের ভাবাগোনাকে একটু ভালো করে তাকানোর খায়েশে। দ্বিতীয় কিস্তিতে ছফার দুটো প্রবন্ধ নিয়ে ব্যাখ্যা এসেছে বিশদে। একটি বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে। অন্যটি ‘বাঙালী মুসলমানের মন’। আহমদ ছফার দৃষ্টিকোণ থেকে রাষ্ট্রবেত্তা হিসেবে বঙ্কিমের সাম্প্রদায়িক আচরণের ব্যাখ্যা করেছি। আর কেনই বা ছফা মুসলমান সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে খাড়া করেছেন নিজেকে তার ব্যাখ্যা করেছি ছফার ভাষ্যেই। এরপর কিস্তি তিন। আগের প্রবন্ধ দুটি আবারো আলোচনায় এসে গেছে এই কিস্তিতে। ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ নিয়ে মূল আলোচনা এগিয়েছে। সাথে পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের বঙ্কিম বিষয়ে ব্যাখ্যা কিছুটা তুলে ধরা হয়েছে। এই কিস্তিতে আবারো থাকছে ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ নিয়ে এনালাইসিস। সাথে একটি অন্য প্রবন্ধ। কথা হলো কারা এই বাঙালি মুসলমান? ছফা তাঁর ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ প্রবন্ধে এই প্রশ্নের উত্তর করেছেন - যাঁরা বাঙালী এবং একই সঙ্গে মুসলমান- তাঁরাই বাঙালী মুসলমান। এঁদের ছাড়াও সুদূর অতীত থেকেই এই বাংলাদেশের অধিবাসী অনেক মুসলমান ছিলেন- যাঁরা ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক এবং নৃতাত্ত্বিক ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যানুসারে ঠিক বাঙালী ছিলেন না। আর্থিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক সুযোগ সুবিধাগুলো তাঁদের হাতে ছিলো বলেই বাঙালী মুসলমানের সঙ্গে সংস্কৃতিগত ভেদরেখা সমূহ অনেক দিন পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, এই প্রভুত্বশীল অংশের রুচি,জীবনদৃষ্টি, মনন এবং চিন্তন পদ্ধতি অনেকদিন পর্যন্ত বাঙালী মুসলমানদের দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিলো। বাঙালী মুসলমানদের যে ক্ষুদ্রতম অংশ কোনো ফাঁক-ফোকর গলে যখন সামাজিক প্রভুত্ব এবং প্রতাপের অধিকারী হতেন, তখনই বাঙালী মুসলমানের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক চুকে যেতো এবং উঁচু শ্রেণীর অভ্যাস, রুচি, জীবনদৃষ্টির এমনকি ভ্রমাত্মক প্রবণতা সমূহও কর্ষণে ঘর্ষণে নিজেদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের অঙ্গীভূত করে নিতেন।১
এই প্রবন্ধ নিয়ে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের মতামত জানতে চেয়েছিলেন আহমদ ছফা। রাজ্জাক সাহেব উত্তরে বলেছেন, ‘আপনের লেখাটাও পড়েছি। উনিশ’শ তিরিশ সালের দিকে প্রকাশিত শরৎচন্দ্রের বর্তমান ‘হিন্দু মুসলমান সমস্যা’র পর এতো প্রভোক্যাটিভ রচনা আমি বাংলা ভাষায় আর পড়ি নাই।’ ২ … প্রবন্ধটি আর প্রকাশ পাবার পর সৃষ্ট হুজ্জত নিয়ে কিছু কথা জানা যায় ‘যদ্যপি আমার গুরু’ তে … খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার পর রোমের পেট্রিসিয়ানদের নতুন এক বিভাজন-রেখার সৃষ্টি করেছিল। এই ধরণের একতা প্রায় অলঙ্ঘনীয় বিভাজন-রেখা বেঙ্গলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ক্রিয়াশীল রয়েছে। স্যারের এই কথার মধ্যে আমি একটা গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পেয়ে যাই। আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করি। সেই সময়ে জিয়াউর রহমান দেশের প্রেসিডেন্ট। আবুল ফজল ছিলেন জিয়া সাহেবের শিক্ষা এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি আমাদের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন এবং আমরা তাঁকে মান্য করতাম। একদিন সকালবেলা দেখতে পেলাম আবুল ফজল সাহেব মাথায় টুপি দিয়ে অপর এক উপদেষ্টা এম এ জি তাওয়াবের সঙ্গে রমনা ময়দানের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আমি সালাম দিয়ে ফজল সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছেন? তিনি জানালেন, তাওয়াব সাহেবের সঙ্গে সিরাতের মজলিসে যাবেন। আমি ভীষণ একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। আবুল ফজল সাহেব নাস্তিকতা প্রচার করতেন। ক্ষমতার কাছাকাছি এসে দেখছি তিনিও নবীভক্ত হয়ে পড়েছেন। এই ঘটনাটি আমাকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করে। রাজ্জাক সাহেব রোমের প্লিবিয়ান খ্রিস্টানদের মনন মানসিকতার বিষয়ে যে ইঙ্গিত করেছিলেন, আমার মনে হল, সেই দোলাচল মনোবৃত্তিটা বাঙালি মুসলমানের মনেও কাজ করে যাচ্ছে। মুসলিম রচিত পুঁথিসমূহের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বাঙালি মুসলমানের চৈতন্যের একটি দিক আমি উদ্ঘাটন করতে চেষ্টা করেছিলাম। আমার রচনাটির শিরোনাম ছিল ‘বাঙালি মুসলমানের মন’। লেখাটি মাসিক সমকালে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই একটা তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। আমি বাঙালি মুসলমানদের বেশিরভাগকেই নিম্নবর্ণের হিন্দুদের বংশধর বলে মস্ত অপরাধ করেছি, এ অভিযোগ করে নানা পত্রপত্রিকায় প্রতিবাদ ছাপা হতে থাকে। আমাদের দেশে এক শীর্ষস্থানীয় কবি ছদ্মনামে তিনটি প্রবন্ধ আমাকে গালাগাল করে লেখেন। প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় আমার বিরুদ্ধে পুরো ছয় মাস ধরে গালমন্দ করে নিবন্ধ লিখতে থাকেন। ওই নিবন্ধগুলো পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে সর্বত্র বিলি করতে আরম্ভ করেন। শুক্রবারে জুম্মার নামাজের পর সমবেত মুসল্লিদের মধ্যে তাঁর পুস্তিকাটি বিনামূল্যে বিতরণ করে জনমতকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকেন। আজাদ সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও তাঁর পুস্তিকাটি বিতরণ করেছিলেন।৩ …
লেখাটার ছাপানোর পর অনেক লোক ছফাকে সমর্থন করেছেন। আবার বিরোধী শিবিরের লোকজনও কম ছিল না। ছফাগিরিতে প্রবন্ধটি নিয়ে বিস্তারিত লেখা উদ্দেশ্য হচ্ছে আহমদ ছফা ঠিক কি কারণে পুঁথি সাহিত্যের বিষয়ের কথা বলে মুসলমান সমাজের পালস্ ঠিক করে বুঝে নিতে চেয়েছেন তার আন্দাজ করা। প্রবন্ধটিতে ফিরে যাই।… মূলতঃ বাঙালী মুসলমানেরা ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত একটি জনগোষ্ঠী।এই অঞ্চলে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার পরে সেই যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবর্তিত হলো, এঁদের হতে হয়েছিল তার অসহায় শিকার। যদিও তাঁরা ছিলেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তথাপি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রণয়নের প্রশ্নে তাঁদের কোনো মতামত বা বক্তব্য ছিলো না। একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলার মৃত্তিকার সাক্ষাৎ সন্তানদের এই সামাজিক অনুশাসন মেনে নিতে হয়েছিল। যেমন কল্পনা করা হয়, অতো সহজে এই বাংলাদেশে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হতে পারেনি। বাংলার আদিম কৌম সমাজের মানুষেরা সর্বপ্রকারে যে ওই বিদেশী উন্নততরো শক্তিকে বাধা দিয়েছিলেন- ছড়াতে, খেলার বোলে অজস্র প্রমাণ ছড়ানো রয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষদের বাগে আনতে অহংপুষ্ঠ আর্য শক্তিকেও যে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার তাঁর বিশ্ব বিশ্রুত ‘ভারতের ধর্মসমূহ’ গ্রন্থে একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন। আর্য বা ব্রাহ্মণ্য শক্তি যে সকল জনগোষ্ঠীকে পদদলিত করে এদেশে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁদেরকে একেবারে চিরতরে জন্ম-জন্মান্তরের দাস বলে চিহ্নিত করেছেন। আর যে সকল শক্তি ওই আর্য শক্তিকে পরাস্ত করে ভারতে শাসন ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন, তাঁদের সকলকেই মর্যাদার আসন দিতে কোনো প্রকারের দ্বিধা বা কুণ্ঠা বোধ করেননি। শক, হুন, মোগল, পাঠান, ইংরেজ যাঁরাই এসেছেন এদেশে তাঁদের সহায়তা করতে পেছপা হননি। কিন্তু নিজেরা বাহুবলে যাঁদের পরাজিত করেছিলেন, তাঁরাও যে মানুষ একথা স্বীকার করার প্রয়োজনীয়তা খুব অল্পই অনুভব করেছেন। তবু ভারতবর্ষে এমনকি বাংলাদেশেও যে, কোনো কোনো নীচু শ্রেণীর লোক নানা বৃত্তি এবং পেশাকে অবলম্বন করে ধীরে ধীরে ওপরের শ্রেণীতে উঠে আসতে পেরেছেন তা অন্যত্র আলোচনার বিষয়।৪ …
যাঁদেরকে এভাবে পদদলিত করা হয়েছিল, পরাজয়ের শোধ নিতে তাঁরা বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেয়। কিন্তু আর্যদের জ্বালায় সুখ আদৌ আসলো না। মুসলমান রাজ্যের প্রতিষ্ঠা লাভের সাথে সাথে ধর্মান্তরিত এসব বৌদ্ধরা দলে দলে ইসলাম ধর্মের আশ্রয় লাভ করেন। এতে তাঁদের সামাজিক প্রভুত্ব লাভের কিছুটা দিশা হলেও জাগতিক সব কষ্টের সুরাহা মিলেনি। হিন্দুদের বর্ণাশ্রম এই উপমাহাদেশের সাম্প্রদায়িকতার আদিমতম উৎস বলে রায় দিয়েছেন আহমদ ছফা। … বাঙালী মুসলমানদের অধিকাংশই বাংলার আদিম কৃষিভিত্তিক কৌম সমাজের লোক। তাঁদের মানসিকতার মধ্যে আদিম সমাজের চিন্তন পদ্ধতির লক্ষণ সমূহ সুপ্রকট। বার বার ধর্ম পরিবর্তন করার পরেও বাইরের দিক ছাড়া তাঁদের বিশ্বাস এবং মানসিকতার মৌলবস্তুর মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দিনের পর দিন গিয়েছে , নতুন ভাবাদর্শে এদেশে তরঙ্গ তুলেছে, নতুন রাজশক্তি এদেশে নতুন শাসনপদ্ধতি চালু করেছে, কিন্তু তাঁরা মনের দিক দিয়ে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মতোই বারবার বিচ্ছিন্ন থেকে গিয়েছেন। মুসলমান সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই ছিলেন বাঙালী মুসলমান এবং মুসলমান রাজত্বের সময়ে তাঁদেরই মানসে যে একটি বলবন্ত সামাজিক আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছিলো তাঁদেরই রচিত পুঁথিসাহিত্য সমূহের মধ্যে তার প্রমাণ মেলে। কাব্য সাহিত্যের নন্দনতাত্ত্বিক বিচার অনুসারে হয়তো এসকল পুঁথির বিশেষ মূল্য নাই। কিন্তু বাঙালী মুসলমান সমাজের নৃতাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় এসবের মূল্য যে অপরিসীম সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।৫ … প্রতিটা জাতির মধ্যের সুপ্ত সামাজিক আবেগ প্রকাশ পায় যখন কোন সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক মুক্তির সুযোগ ঘটে। আর সাহিত্য সেক্ষেত্রে মূল মানদণ্ড হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়ে। তবে ঠিকমতো জাতীয় আকাঙ্ক্ষার সাথে যুক্ত হতে না পারলে ভালো কিছু সেখান থেকে আশা করা যায় না। মুসলমানদের পুঁথি সাহিত্য মহৎ পরিণতির দিকে যেতে পারেনি। … প্রতিবন্ধকতা সমূহ সামাজিক সংগঠনের মধ্যেই বিরাজমান ছিলো। সমাজ সংগঠন ভেঙ্গে ফেলে নব রূপায়ন তাঁরা ঘটাতে পারেননি। কারণ মুসলিম শাসকেরাও স্থানীয় জনগণের মধ্যে থেকে এ নেতৃশ্রেণী সংগ্রহ করেছিলেন, তাদের মধ্যে বাঙালী মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব একেবারে ছিলো বা বললেই চলে। অন্যদিকে ভাষাগত, সংস্কৃতিগত, রুচি এবং আচারগত দূরত্বের দরুণ শাসকশ্রেণীর অভ্যাস, মনন রপ্ত করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বাঙালী মুসলমান।৬ …
আহমদ ছফার প্রবন্ধটিতে কিছু কথার পুনরুক্তি হয়ে গেছে অনেক জায়গায়। প্রথমবার পাঠে মনে হতে পারে ঠিকমতো সম্পাদনার অভাবে এটা হয়েছে। কিন্তু কয়েক বার পড়লে বুঝতে পারা যায় ব্যাপারটা তিনি ইচ্ছে করে করেছেন। সত্যভাষ্যকে দশ জায়গায় বলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছেন ছফা। সত্যের খাতিরেই। জাতীয় সমাজের চেহারা বুঝে নিতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মানসগঠন বুঝে নেয়া তাঁর জন্য জরুরী হয়ে পড়েছিল। এখানে ছফার অন্য একটি প্রবন্ধ নিয়ে কথা বলবো। ‘বঙ্গভূমি আন্দোলন, রাষ্ট্রধর্ম, মুক্তিযুদ্ধঃ বাংলাদেশের হিন্দু ইত্যাকার প্রসঙ্গ’। ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ নিয়ে লেখা আরো কিছুটা এগোবে। পরের কিস্তিতে।পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ন্যাশনালিস্ট থট এন্ড দা কলোনিয়াল ওয়ার্ল্ডঃ আ ডেরিভেটিভ ডিসকোর্স’ বইয়ের বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে আলোচনা পরের কোন কিস্তিতে বিশদে আনার চেষ্টা করবো। সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত ‘বেহাত বিপ্লব ১৯৭১’, ছফার প্রবন্ধ ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ নিয়ে কথাবার্তা আসবে সামনের কিস্তিগুলোতে।
একটি রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের মনোবেদনা বুঝে নিতে ছফা প্রবন্ধটি লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুর সংখ্যা কত ছিল? প্রায় এক কোটির উপরে। জেনারেল ইয়াহিয়া ধারণা করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে এই হিন্দুগুলোকে মেরে কেটে ভাগিয়ে ভারত পাঠিয়ে দিতে পারলে শান্তি নেমে আসবে। এসব হিন্দুর সম্পত্তি মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করে দিতে পারলে গরীব পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানেরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে। যুদ্ধ করার বাসনা তাদের তখন মিটে যাবে। এ কারণেই একাত্তরের যুদ্ধের প্রথম টার্গেট ঠিক করা ছিল হিন্দুরা। ইয়াহিয়ার থিয়োরি যুদ্ধে কাজ করেনি। ফলে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হলো। এদিকে স্বাধীনতার পরে দেশের হিন্দুরা একটা ডিমোরালাইজেশোনের মধ্যে গিয়ে পড়লো। তারা বাংলাদেশে বাস করা নিরাপদ মনে করতে অক্ষম হলো। ছফার প্রবন্ধের শুরু এই জায়গা থেকে। … দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে উনিশশো সাতচল্লিশে একবার ভারত উপমাহাদেশকে ভাগ করা হয়েছিল। মোটামুটি ব্যবস্থাটা ছিলো এরকম। হিন্দুরা ভারত চলে যাবে এবং মুসলমানেরা পাকিস্তান চলে আসবে। বাস্তবে তা কার্যকরও হয়েছিলো। ভারত-পাকিস্তান ভাগাভাগির পর যে পরিমাণ মানুষ এক দেশ থেকে থেকে আরেক দেশে চলে গিয়েছিলো তার পরিমাণ এতো বিপুল ছিলো যে ইতিহাসে তার কোনো তুলনা মেলে না। অনেক হিন্দু ভারতে এলো, অনেক মুসলমান পাকিস্তানে এলো। তারপরেও যাওয়া-আসার পালা সাঙ্গ হলো না। কোটি কোটি মুসলমান ভারতে এবং প্রায় কোটি খানেক হিন্দু পাকিস্তানে থেকে যেতে বাধ্য হলেন। ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করে মুসলমানদের সেখানে থাকার আইনগত স্বীকৃতি দিলো।৭ … ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হলো, হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত হলেন। পাকিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহ একরকম বাধ্য হয়েই এই অবস্থাটা মেনে নিলেন।৮ … পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনের মূল কারণ ছিল ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতি অস্বীকৃতি। হিন্দুরা এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে। … এই যুদ্ধের কাছ থেকে তাঁদের প্রত্যাশার পরিমাণ ছিলো অনেক বেশি। তাঁদের জানমালের ওপর যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে একক সম্প্রদায় হিসেবে অন্য কারো সঙ্গে তার তুলনা চলতে পারেনা। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ক্র্যাক ডাউনের প্রাথমিক পর্যায়ে বেছে বেছে হিন্দুদের বাড়িঘর মহল্লা এবং গ্রামে আগুন লাগিয়ে হিন্দু নর-নারীদের অবলীলায় খুন করে যাচ্ছিলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রাথমিক যে রোষ তা হিন্দু সম্প্রদায়কেই সর্বাপেক্ষা অধিক সহ্য করতে হয়েছে।৯ … ছফা আবেগতাড়িত না হয়ে নির্লিপ্ত চোখে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর ‘একাত্তরঃ মহাসিন্ধুর কল্লোল’ প্রবন্ধটি উল্লেখ করার মতো। তাঁর ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ বইটির কথাও বলতে হবে যেটির প্রথম প্রকাশকাল ছিল ২৮ জুলাই ১৯৭১; প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা থেকে। সাথে নিতে হবে উপন্যাস ‘অলাতচক্র’। একাত্তরের যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশ কোন ভবিষ্যতের দিকে দৌড়াবে- এই উপন্যাসের চরিত্র দানিয়েল ভেবে নেয় … বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উনিশশো আটচল্লিশ থেকেই সংগ্রাম করে এসেছে। আসন্ন ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধটিই কি বাঙালি জাতির বিগত বাইশ বছরের রক্তাক্ত সংগ্রামের একমাত্র ফলাফল। এই যুদ্ধে হয়তো ভারত জয়লাভ করবে এবং ভারতের সহায়তায় আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হবো। আমাদের জাতীয় সংগ্রামের এই পরিণতি। এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম? কি জানি, ইতিহাস কোন দিকে মোড় নিচ্ছে? আমাদের বাবারা পাকিস্তান তৈরি করতে চেয়েছিলেন, আর আমরা পাকিস্তান ভাঙ্গছি। এই যুদ্ধ সংঘাত রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আমদের জাতীয় ইতিহাস কোন ভবিষ্যতের পানে পাড়ি দিচ্ছে? কে জানে!১০ …
যাই হোক জাতীয় ইতিহাস কোন দিকে মোড় নিয়েছে তা আমরা দেখেছি। যুদ্ধের পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতার ভেক ধরলেও পরে ধর্মের আবরণে গা ঢাকে। একাত্তরের পর যেসব হিন্দু ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁদের কিছু অংশ দেশে ফিরে দেখে তাঁদের সবকিছু বেহাত হয়ে গেছে। তাও কোন মতে তাঁরা থেকে যেতে শুরু করলেন। ধরে নিলেন কাঠামো যখন পরিবর্তিত হয়েছে অধিকার তাঁরা আস্তে আস্তে ফিরে পাবেন। সেটা আর হয় নি। ইতিহাসের পাতা একটু তাড়াতাড়ি উল্টে যাই। … মওদুদ আহমদ সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আজ এই দিনে পবিত্র ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে এমন একটি জাতীয় দায়িত্ব পালন করলাম, ভবিষ্যৎ বংশধরেরা এই মহৎ কর্মের জন্য আমাদের কথা কৃতার্থ অন্তরে স্মরণ করবে।’১১ … এই ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবে কিছু আন্দোলন হয়েছে। মিটিং-মিছিল চলেছে। এইটুকুই। বাংলাদেশের মৌলবাদ মাথাচাড়া দেবার পেছনে এই ধর্মীয় মোড়ক বিশাল প্রভাব ফেলেছে বলে আমি মনে করি। ঠিক কোন কারণে বাংলাদেশের সেক্যুলারিজমকে (ধরি সেক্যুলারিজমের বাংলা ‘ধর্ম-স্বাধীনতা’) বাদ দিয়ে ধর্মের লেবাসে নিজেকে ঢেকে ফেলার দরকার হলো- এই ইতিহাস জানা খুব জরুরি।
সূত্রএই প্রবন্ধ নিয়ে প্রফেসর আবদুর রাজ্জাকের মতামত জানতে চেয়েছিলেন আহমদ ছফা। রাজ্জাক সাহেব উত্তরে বলেছেন, ‘আপনের লেখাটাও পড়েছি। উনিশ’শ তিরিশ সালের দিকে প্রকাশিত শরৎচন্দ্রের বর্তমান ‘হিন্দু মুসলমান সমস্যা’র পর এতো প্রভোক্যাটিভ রচনা আমি বাংলা ভাষায় আর পড়ি নাই।’ ২ … প্রবন্ধটি আর প্রকাশ পাবার পর সৃষ্ট হুজ্জত নিয়ে কিছু কথা জানা যায় ‘যদ্যপি আমার গুরু’ তে … খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করার পর রোমের পেট্রিসিয়ানদের নতুন এক বিভাজন-রেখার সৃষ্টি করেছিল। এই ধরণের একতা প্রায় অলঙ্ঘনীয় বিভাজন-রেখা বেঙ্গলের মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যেও ক্রিয়াশীল রয়েছে। স্যারের এই কথার মধ্যে আমি একটা গভীর অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পেয়ে যাই। আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করি। সেই সময়ে জিয়াউর রহমান দেশের প্রেসিডেন্ট। আবুল ফজল ছিলেন জিয়া সাহেবের শিক্ষা এবং সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি আমাদের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন এবং আমরা তাঁকে মান্য করতাম। একদিন সকালবেলা দেখতে পেলাম আবুল ফজল সাহেব মাথায় টুপি দিয়ে অপর এক উপদেষ্টা এম এ জি তাওয়াবের সঙ্গে রমনা ময়দানের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। আমি সালাম দিয়ে ফজল সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, কোথায় যাচ্ছেন? তিনি জানালেন, তাওয়াব সাহেবের সঙ্গে সিরাতের মজলিসে যাবেন। আমি ভীষণ একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। আবুল ফজল সাহেব নাস্তিকতা প্রচার করতেন। ক্ষমতার কাছাকাছি এসে দেখছি তিনিও নবীভক্ত হয়ে পড়েছেন। এই ঘটনাটি আমাকে প্রচণ্ডভাবে আলোড়িত করে। রাজ্জাক সাহেব রোমের প্লিবিয়ান খ্রিস্টানদের মনন মানসিকতার বিষয়ে যে ইঙ্গিত করেছিলেন, আমার মনে হল, সেই দোলাচল মনোবৃত্তিটা বাঙালি মুসলমানের মনেও কাজ করে যাচ্ছে। মুসলিম রচিত পুঁথিসমূহের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে বাঙালি মুসলমানের চৈতন্যের একটি দিক আমি উদ্ঘাটন করতে চেষ্টা করেছিলাম। আমার রচনাটির শিরোনাম ছিল ‘বাঙালি মুসলমানের মন’। লেখাটি মাসিক সমকালে প্রকাশিত হয়েছিল। লেখাটি প্রকাশিত হওয়ার পরপরই একটা তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। আমি বাঙালি মুসলমানদের বেশিরভাগকেই নিম্নবর্ণের হিন্দুদের বংশধর বলে মস্ত অপরাধ করেছি, এ অভিযোগ করে নানা পত্রপত্রিকায় প্রতিবাদ ছাপা হতে থাকে। আমাদের দেশে এক শীর্ষস্থানীয় কবি ছদ্মনামে তিনটি প্রবন্ধ আমাকে গালাগাল করে লেখেন। প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির তৎকালীন সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ সাপ্তাহিক ইত্তেহাদ পত্রিকায় আমার বিরুদ্ধে পুরো ছয় মাস ধরে গালমন্দ করে নিবন্ধ লিখতে থাকেন। ওই নিবন্ধগুলো পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করে সর্বত্র বিলি করতে আরম্ভ করেন। শুক্রবারে জুম্মার নামাজের পর সমবেত মুসল্লিদের মধ্যে তাঁর পুস্তিকাটি বিনামূল্যে বিতরণ করে জনমতকে খেপিয়ে তোলার চেষ্টা করতে থাকেন। আজাদ সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যেও তাঁর পুস্তিকাটি বিতরণ করেছিলেন।৩ …
লেখাটার ছাপানোর পর অনেক লোক ছফাকে সমর্থন করেছেন। আবার বিরোধী শিবিরের লোকজনও কম ছিল না। ছফাগিরিতে প্রবন্ধটি নিয়ে বিস্তারিত লেখা উদ্দেশ্য হচ্ছে আহমদ ছফা ঠিক কি কারণে পুঁথি সাহিত্যের বিষয়ের কথা বলে মুসলমান সমাজের পালস্ ঠিক করে বুঝে নিতে চেয়েছেন তার আন্দাজ করা। প্রবন্ধটিতে ফিরে যাই।… মূলতঃ বাঙালী মুসলমানেরা ইতিহাসের আদি থেকেই নির্যাতিত একটি জনগোষ্ঠী।এই অঞ্চলে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হওয়ার পরে সেই যে বর্ণাশ্রম প্রথা প্রবর্তিত হলো, এঁদের হতে হয়েছিল তার অসহায় শিকার। যদিও তাঁরা ছিলেন সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, তথাপি সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত প্রণয়নের প্রশ্নে তাঁদের কোনো মতামত বা বক্তব্য ছিলো না। একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলার মৃত্তিকার সাক্ষাৎ সন্তানদের এই সামাজিক অনুশাসন মেনে নিতে হয়েছিল। যেমন কল্পনা করা হয়, অতো সহজে এই বাংলাদেশে আর্য প্রভাব বিস্তৃত হতে পারেনি। বাংলার আদিম কৌম সমাজের মানুষেরা সর্বপ্রকারে যে ওই বিদেশী উন্নততরো শক্তিকে বাধা দিয়েছিলেন- ছড়াতে, খেলার বোলে অজস্র প্রমাণ ছড়ানো রয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষদের বাগে আনতে অহংপুষ্ঠ আর্য শক্তিকেও যে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়, তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার তাঁর বিশ্ব বিশ্রুত ‘ভারতের ধর্মসমূহ’ গ্রন্থে একটি চমৎকার মন্তব্য করেছেন। আর্য বা ব্রাহ্মণ্য শক্তি যে সকল জনগোষ্ঠীকে পদদলিত করে এদেশে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছেন, তাঁদেরকে একেবারে চিরতরে জন্ম-জন্মান্তরের দাস বলে চিহ্নিত করেছেন। আর যে সকল শক্তি ওই আর্য শক্তিকে পরাস্ত করে ভারতে শাসন ক্ষমতার অধিকারী হয়েছেন, তাঁদের সকলকেই মর্যাদার আসন দিতে কোনো প্রকারের দ্বিধা বা কুণ্ঠা বোধ করেননি। শক, হুন, মোগল, পাঠান, ইংরেজ যাঁরাই এসেছেন এদেশে তাঁদের সহায়তা করতে পেছপা হননি। কিন্তু নিজেরা বাহুবলে যাঁদের পরাজিত করেছিলেন, তাঁরাও যে মানুষ একথা স্বীকার করার প্রয়োজনীয়তা খুব অল্পই অনুভব করেছেন। তবু ভারতবর্ষে এমনকি বাংলাদেশেও যে, কোনো কোনো নীচু শ্রেণীর লোক নানা বৃত্তি এবং পেশাকে অবলম্বন করে ধীরে ধীরে ওপরের শ্রেণীতে উঠে আসতে পেরেছেন তা অন্যত্র আলোচনার বিষয়।৪ …
যাঁদেরকে এভাবে পদদলিত করা হয়েছিল, পরাজয়ের শোধ নিতে তাঁরা বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেয়। কিন্তু আর্যদের জ্বালায় সুখ আদৌ আসলো না। মুসলমান রাজ্যের প্রতিষ্ঠা লাভের সাথে সাথে ধর্মান্তরিত এসব বৌদ্ধরা দলে দলে ইসলাম ধর্মের আশ্রয় লাভ করেন। এতে তাঁদের সামাজিক প্রভুত্ব লাভের কিছুটা দিশা হলেও জাগতিক সব কষ্টের সুরাহা মিলেনি। হিন্দুদের বর্ণাশ্রম এই উপমাহাদেশের সাম্প্রদায়িকতার আদিমতম উৎস বলে রায় দিয়েছেন আহমদ ছফা। … বাঙালী মুসলমানদের অধিকাংশই বাংলার আদিম কৃষিভিত্তিক কৌম সমাজের লোক। তাঁদের মানসিকতার মধ্যে আদিম সমাজের চিন্তন পদ্ধতির লক্ষণ সমূহ সুপ্রকট। বার বার ধর্ম পরিবর্তন করার পরেও বাইরের দিক ছাড়া তাঁদের বিশ্বাস এবং মানসিকতার মৌলবস্তুর মধ্যে কোনো পরিবর্তন আসেনি। দিনের পর দিন গিয়েছে , নতুন ভাবাদর্শে এদেশে তরঙ্গ তুলেছে, নতুন রাজশক্তি এদেশে নতুন শাসনপদ্ধতি চালু করেছে, কিন্তু তাঁরা মনের দিক দিয়ে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের মতোই বারবার বিচ্ছিন্ন থেকে গিয়েছেন। মুসলমান সম্প্রদায়ের বেশিরভাগই ছিলেন বাঙালী মুসলমান এবং মুসলমান রাজত্বের সময়ে তাঁদেরই মানসে যে একটি বলবন্ত সামাজিক আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হয়েছিলো তাঁদেরই রচিত পুঁথিসাহিত্য সমূহের মধ্যে তার প্রমাণ মেলে। কাব্য সাহিত্যের নন্দনতাত্ত্বিক বিচার অনুসারে হয়তো এসকল পুঁথির বিশেষ মূল্য নাই। কিন্তু বাঙালী মুসলমান সমাজের নৃতাত্ত্বিক এবং সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় এসবের মূল্য যে অপরিসীম সে কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।৫ … প্রতিটা জাতির মধ্যের সুপ্ত সামাজিক আবেগ প্রকাশ পায় যখন কোন সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক মুক্তির সুযোগ ঘটে। আর সাহিত্য সেক্ষেত্রে মূল মানদণ্ড হিসেবে দাঁড়িয়ে পড়ে। তবে ঠিকমতো জাতীয় আকাঙ্ক্ষার সাথে যুক্ত হতে না পারলে ভালো কিছু সেখান থেকে আশা করা যায় না। মুসলমানদের পুঁথি সাহিত্য মহৎ পরিণতির দিকে যেতে পারেনি। … প্রতিবন্ধকতা সমূহ সামাজিক সংগঠনের মধ্যেই বিরাজমান ছিলো। সমাজ সংগঠন ভেঙ্গে ফেলে নব রূপায়ন তাঁরা ঘটাতে পারেননি। কারণ মুসলিম শাসকেরাও স্থানীয় জনগণের মধ্যে থেকে এ নেতৃশ্রেণী সংগ্রহ করেছিলেন, তাদের মধ্যে বাঙালী মুসলমানের প্রতিনিধিত্ব একেবারে ছিলো বা বললেই চলে। অন্যদিকে ভাষাগত, সংস্কৃতিগত, রুচি এবং আচারগত দূরত্বের দরুণ শাসকশ্রেণীর অভ্যাস, মনন রপ্ত করতে গিয়ে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বাঙালী মুসলমান।৬ …
আহমদ ছফার প্রবন্ধটিতে কিছু কথার পুনরুক্তি হয়ে গেছে অনেক জায়গায়। প্রথমবার পাঠে মনে হতে পারে ঠিকমতো সম্পাদনার অভাবে এটা হয়েছে। কিন্তু কয়েক বার পড়লে বুঝতে পারা যায় ব্যাপারটা তিনি ইচ্ছে করে করেছেন। সত্যভাষ্যকে দশ জায়গায় বলার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছেন ছফা। সত্যের খাতিরেই। জাতীয় সমাজের চেহারা বুঝে নিতে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মানসগঠন বুঝে নেয়া তাঁর জন্য জরুরী হয়ে পড়েছিল। এখানে ছফার অন্য একটি প্রবন্ধ নিয়ে কথা বলবো। ‘বঙ্গভূমি আন্দোলন, রাষ্ট্রধর্ম, মুক্তিযুদ্ধঃ বাংলাদেশের হিন্দু ইত্যাকার প্রসঙ্গ’। ‘বাঙালী মুসলমানের মন’ নিয়ে লেখা আরো কিছুটা এগোবে। পরের কিস্তিতে।পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের ‘ন্যাশনালিস্ট থট এন্ড দা কলোনিয়াল ওয়ার্ল্ডঃ আ ডেরিভেটিভ ডিসকোর্স’ বইয়ের বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে আলোচনা পরের কোন কিস্তিতে বিশদে আনার চেষ্টা করবো। সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত ‘বেহাত বিপ্লব ১৯৭১’, ছফার প্রবন্ধ ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ নিয়ে কথাবার্তা আসবে সামনের কিস্তিগুলোতে।
একটি রাষ্ট্রে সংখ্যালঘুদের মনোবেদনা বুঝে নিতে ছফা প্রবন্ধটি লিখেছেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে পূর্ব পাকিস্তানে হিন্দুর সংখ্যা কত ছিল? প্রায় এক কোটির উপরে। জেনারেল ইয়াহিয়া ধারণা করেছিলেন পূর্ব পাকিস্তান থেকে এই হিন্দুগুলোকে মেরে কেটে ভাগিয়ে ভারত পাঠিয়ে দিতে পারলে শান্তি নেমে আসবে। এসব হিন্দুর সম্পত্তি মুসলমানদের মধ্যে বিতরণ করে দিতে পারলে গরীব পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমানেরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে। যুদ্ধ করার বাসনা তাদের তখন মিটে যাবে। এ কারণেই একাত্তরের যুদ্ধের প্রথম টার্গেট ঠিক করা ছিল হিন্দুরা। ইয়াহিয়ার থিয়োরি যুদ্ধে কাজ করেনি। ফলে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হলো। এদিকে স্বাধীনতার পরে দেশের হিন্দুরা একটা ডিমোরালাইজেশোনের মধ্যে গিয়ে পড়লো। তারা বাংলাদেশে বাস করা নিরাপদ মনে করতে অক্ষম হলো। ছফার প্রবন্ধের শুরু এই জায়গা থেকে। … দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে উনিশশো সাতচল্লিশে একবার ভারত উপমাহাদেশকে ভাগ করা হয়েছিল। মোটামুটি ব্যবস্থাটা ছিলো এরকম। হিন্দুরা ভারত চলে যাবে এবং মুসলমানেরা পাকিস্তান চলে আসবে। বাস্তবে তা কার্যকরও হয়েছিলো। ভারত-পাকিস্তান ভাগাভাগির পর যে পরিমাণ মানুষ এক দেশ থেকে থেকে আরেক দেশে চলে গিয়েছিলো তার পরিমাণ এতো বিপুল ছিলো যে ইতিহাসে তার কোনো তুলনা মেলে না। অনেক হিন্দু ভারতে এলো, অনেক মুসলমান পাকিস্তানে এলো। তারপরেও যাওয়া-আসার পালা সাঙ্গ হলো না। কোটি কোটি মুসলমান ভারতে এবং প্রায় কোটি খানেক হিন্দু পাকিস্তানে থেকে যেতে বাধ্য হলেন। ভারতবর্ষ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র ঘোষণা করে মুসলমানদের সেখানে থাকার আইনগত স্বীকৃতি দিলো।৭ … ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠা হলো, হিন্দু এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকেরা দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত হলেন। পাকিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সমূহ একরকম বাধ্য হয়েই এই অবস্থাটা মেনে নিলেন।৮ … পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনের মূল কারণ ছিল ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতি অস্বীকৃতি। হিন্দুরা এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে। … এই যুদ্ধের কাছ থেকে তাঁদের প্রত্যাশার পরিমাণ ছিলো অনেক বেশি। তাঁদের জানমালের ওপর যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে একক সম্প্রদায় হিসেবে অন্য কারো সঙ্গে তার তুলনা চলতে পারেনা। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ক্র্যাক ডাউনের প্রাথমিক পর্যায়ে বেছে বেছে হিন্দুদের বাড়িঘর মহল্লা এবং গ্রামে আগুন লাগিয়ে হিন্দু নর-নারীদের অবলীলায় খুন করে যাচ্ছিলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রাথমিক যে রোষ তা হিন্দু সম্প্রদায়কেই সর্বাপেক্ষা অধিক সহ্য করতে হয়েছে।৯ … ছফা আবেগতাড়িত না হয়ে নির্লিপ্ত চোখে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁর ‘একাত্তরঃ মহাসিন্ধুর কল্লোল’ প্রবন্ধটি উল্লেখ করার মতো। তাঁর ‘জাগ্রত বাংলাদেশ’ বইটির কথাও বলতে হবে যেটির প্রথম প্রকাশকাল ছিল ২৮ জুলাই ১৯৭১; প্রকাশিত হয়েছিল কলকাতা থেকে। সাথে নিতে হবে উপন্যাস ‘অলাতচক্র’। একাত্তরের যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন বাংলাদেশ কোন ভবিষ্যতের দিকে দৌড়াবে- এই উপন্যাসের চরিত্র দানিয়েল ভেবে নেয় … বাংলাদেশ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে উনিশশো আটচল্লিশ থেকেই সংগ্রাম করে এসেছে। আসন্ন ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধটিই কি বাঙালি জাতির বিগত বাইশ বছরের রক্তাক্ত সংগ্রামের একমাত্র ফলাফল। এই যুদ্ধে হয়তো ভারত জয়লাভ করবে এবং ভারতের সহায়তায় আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হবো। আমাদের জাতীয় সংগ্রামের এই পরিণতি। এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম? কি জানি, ইতিহাস কোন দিকে মোড় নিচ্ছে? আমাদের বাবারা পাকিস্তান তৈরি করতে চেয়েছিলেন, আর আমরা পাকিস্তান ভাঙ্গছি। এই যুদ্ধ সংঘাত রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আমদের জাতীয় ইতিহাস কোন ভবিষ্যতের পানে পাড়ি দিচ্ছে? কে জানে!১০ …
যাই হোক জাতীয় ইতিহাস কোন দিকে মোড় নিয়েছে তা আমরা দেখেছি। যুদ্ধের পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষতার ভেক ধরলেও পরে ধর্মের আবরণে গা ঢাকে। একাত্তরের পর যেসব হিন্দু ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তাঁদের কিছু অংশ দেশে ফিরে দেখে তাঁদের সবকিছু বেহাত হয়ে গেছে। তাও কোন মতে তাঁরা থেকে যেতে শুরু করলেন। ধরে নিলেন কাঠামো যখন পরিবর্তিত হয়েছে অধিকার তাঁরা আস্তে আস্তে ফিরে পাবেন। সেটা আর হয় নি। ইতিহাসের পাতা একটু তাড়াতাড়ি উল্টে যাই। … মওদুদ আহমদ সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আজ এই দিনে পবিত্র ইসলামকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করে এমন একটি জাতীয় দায়িত্ব পালন করলাম, ভবিষ্যৎ বংশধরেরা এই মহৎ কর্মের জন্য আমাদের কথা কৃতার্থ অন্তরে স্মরণ করবে।’১১ … এই ঘোষণার পর স্বাভাবিকভাবে কিছু আন্দোলন হয়েছে। মিটিং-মিছিল চলেছে। এইটুকুই। বাংলাদেশের মৌলবাদ মাথাচাড়া দেবার পেছনে এই ধর্মীয় মোড়ক বিশাল প্রভাব ফেলেছে বলে আমি মনে করি। ঠিক কোন কারণে বাংলাদেশের সেক্যুলারিজমকে (ধরি সেক্যুলারিজমের বাংলা ‘ধর্ম-স্বাধীনতা’) বাদ দিয়ে ধর্মের লেবাসে নিজেকে ঢেকে ফেলার দরকার হলো- এই ইতিহাস জানা খুব জরুরি।
১। আহমদ ছফার প্রবন্ধ – (ষ্টুডেণ্ট ওয়েজ , জানুয়ারী ২০০০) [পৃষ্ঠা ৬৩]
২। যদ্যপি আমার গুরু – আহমদ ছফা (মাওলা ব্রাদার্স , মে ২০০০) [পৃষ্ঠা ৫৬]
৩। [পৃষ্ঠা ৫৫-৫৬]
৪। আহমদ ছফার প্রবন্ধ – (ষ্টুডেণ্ট ওয়েজ , জানুয়ারী ২০০০) [পৃষ্ঠা ৬৩-৬৪]
৫। [পৃষ্ঠা ৬৪] ৬। [পৃষ্ঠা ৬৫]
৭। রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক প্রবন্ধ- আহমদ ছফা ( জাগৃতি প্রকাশনী, জুন ২০০০)
[পৃষ্ঠা ৯৯]
৮। [পৃষ্ঠা ৯৯] ৯। [পৃষ্ঠা ১০০]
১০। অলাতচক্র- আহমদ ছফা ( শ্রীপ্রকাশ, জুন ২০০০) [পৃষ্ঠা ১৩৩]
১১। রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক প্রবন্ধ- আহমদ ছফা (জাগৃতি প্রকাশনী, জুন ২০০০)
[পৃষ্ঠা ১০৪]
গড় রেটিং
(৬ ভোট)
লিখেছেন শুভাশীষ দাশ (তারিখ: বিষ্যুদ, ২০০৯-১২-১০ ২১:২২)
উদ্ধৃতি | শুভাশীষ দাশ এর ব্লগ | ৩৮টি মন্তব্য | ৯৮৬বার পঠিত
শেয়ার
উদ্ধৃতি | শুভাশীষ দাশ এর ব্লগ | ৩৮টি মন্তব্য | ৯৮৬বার পঠিত
শেয়ার
প্রকাশিত লেখা ও মন্তব্যের দায় একান্তই সংশ্লিষ্ট লেখক বা মন্তব্যকারীর, সচলায়তন কর্তৃপক্ষ এজন্য কোনভাবেই দায়ী নন।
লেখকের এবং মন্তব্যকারীর লেখায় অথবা প্রোফাইলে পরিষ্কারভাবে লাইসেন্স প্রসঙ্গে কোন উল্লেখ না থাকলে স্ব-স্ব লেখার এবং মন্তব্যের সর্বস্বত্ব সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের বা মন্তব্যকারী কর্তৃক সংরক্ষিত থাকবে। লেখকের বা মন্তব্যকারীর অনুমতি ব্যতিরেকে লেখার বা মন্তব্যের আংশিক বা পূর্ণ অংশ কোন ধরনের মিডিয়ায় পুনঃপ্রকাশ করা যাবে না।
১
২
ভালো হচ্ছে লেখাটা। চলতে থাকুক.....
-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’
-------------------------------------------
‘চিন্তারাজিকে লুকিয়ে রাখার মধ্যে কোন মাহাত্ম্য নেই।’
৪
ছফা কখনো পড়িনি; তবে এ সিরিজের মতো আরো দু'এক জায়গায় ছফা সম্পর্কে পড়েছি। আপনার লেখার সার্থকতা এখানেই যে ছফাপাঠে আগ্রহ জাগিয়েছেন।
ছফাগিরি চলতে থাকুক
ছফাগিরি চলতে থাকুক
৫
আপনি মনে হয় এই প্রথম আমার লেখায় কমেন্ট করলেন। প্রথম কিস্তিতে যদ্যপি আমার গুরুর পিডিয়েফের লিঙ্ক আছে। পড়ে নিতে পারেন।
৬
ছফাকে এতো সহজে বুঝিয়ে দেবার জন্য আপনার উদ্যোগ প্রশংসার দাবী রাখে। আরো নিয়মিত ছফাগিরি লিখুন।
৯
একটা বিজ্ঞপ্তি
কাহারো হস্তে মাসিক চিন্তার ছফা সংখ্যাখানা থাকিলে কষ্ট করিয়া স্ক্যান করিয়া নিম্নোক্ত ই-ঠিকানায় পাঠাইলে মহোদয়ের নিকট চির বাধিত থাকিব।
subasishdas@hotmail.com
কাহারো হস্তে মাসিক চিন্তার ছফা সংখ্যাখানা থাকিলে কষ্ট করিয়া স্ক্যান করিয়া নিম্নোক্ত ই-ঠিকানায় পাঠাইলে মহোদয়ের নিকট চির বাধিত থাকিব।
subasishdas@hotmail.com
১০
আহমদ ছফার কোনো লেখাই পড়তে পাইনি। আপনার লেখার মাধ্যমে জানতে বুঝতে চেষ্টা করছি। কাজেই বুঝতে পারছেন আশা করি যে, আমার প্রত্যাশা কতখানি!
.
____________________________________
ব্যাকুল প্রত্যাশা উর্ধমুখী; হয়তো বা কেটে যাবে মেঘ।
দূর হবে শকুনের ছাঁয়া। কাটাবে আঁধার আমাদের ঘোলা চোখ
আলোকের উদ্ভাসনে; হবে পুন: পল্লবীত বিশুষ্ক বৃক্ষের ডাল।
.
____________________________________
ব্যাকুল প্রত্যাশা উর্ধমুখী; হয়তো বা কেটে যাবে মেঘ।
দূর হবে শকুনের ছাঁয়া। কাটাবে আঁধার আমাদের ঘোলা চোখ
আলোকের উদ্ভাসনে; হবে পুন: পল্লবীত বিশুষ্ক বৃক্ষের ডাল।
১২
ছফা। গুরু। সে এক বিশাল মানব। বিশাল ভাল্ডার। ধন্যবাদ তাঁকে উপস্থাপনের জন্য।
শেখ নজরুল
শেখ নজরুল
১৪
লেখা ভাল হচ্ছে, চলুক।
মনে হয় প্রথম কিস্তিতে যদ্যপি আমার গুরুর লিংটি ছিল। পড়লাম। কেন যেন আপনার মত মুগ্ধ হতে পারলাম না। অবশ্য বইটা ছফাকে বিচারের জন্য পড়া ঠিক নয়।
ভারতের মুসলমানরা নীচু জাতের হিন্দু ছিল, কথাটা কি করে যেন ছফার প্রবন্ধ পড়ার আগেই মনে হতো। ওনার মত এত গভীর ভাবে ভাবিনি কখনো।
শরৎবাবুর প্রবন্ধটার লিংক দিতে পারলে ভাল হতো।
পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম।
**********************
ছায়া বাজে পুতুল রুপে বানাইয়া মানুষ
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কি দোষ!
!কাঁশ বনের বাঘ!
মনে হয় প্রথম কিস্তিতে যদ্যপি আমার গুরুর লিংটি ছিল। পড়লাম। কেন যেন আপনার মত মুগ্ধ হতে পারলাম না। অবশ্য বইটা ছফাকে বিচারের জন্য পড়া ঠিক নয়।
ভারতের মুসলমানরা নীচু জাতের হিন্দু ছিল, কথাটা কি করে যেন ছফার প্রবন্ধ পড়ার আগেই মনে হতো। ওনার মত এত গভীর ভাবে ভাবিনি কখনো।
শরৎবাবুর প্রবন্ধটার লিংক দিতে পারলে ভাল হতো।
পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম।
**********************
ছায়া বাজে পুতুল রুপে বানাইয়া মানুষ
যেমনি নাচাও তেমনি নাচি, পুতুলের কি দোষ!
!কাঁশ বনের বাঘ!
১৫
ভারতের কিংবা সেই কালের ভারতবর্ষের সকল মুসলমানদের সাথে বাঙালি মুসলমানদের গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। কিস্তি তিনে কিছু কথা আছে এই প্রসঙ্গে। ছফার চোখে বাঙালি মুসলমানের মনের ব্যাখ্যা এখানে করা হয়েছে। শরৎচন্দ্রের ‘বর্তমান হিন্দু মুসলমান সমস্যা’ আমার কাছে এই মুহূর্তে নেই। অনলাইনে ও পাই নি।
আরো কিছু কথা আছে। মন্তব্যে পরে লিখে জানাবো।
আরো কিছু কথা আছে। মন্তব্যে পরে লিখে জানাবো।
১৬
‘বাঙালী মুসলমানের মন’ পড়েছি দেশের বাইরে আসার অনেক পর, নিজের মুসলমানিত্ব নিয়ে সচেতন হবার পর। অসম্ভব অন্তরদৃষ্টিসম্পন্ন লেখা । আপনার লেখায় ছফার উদ্ধৃতি পড়ে সে কথাই আবার মনে হল।
(সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েই বলছি) আমার প্রায়ই মনে হয় বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীর আকাল চলছে । চারিদিকেই শ্লোগান । ছফার মতো এরকম নির্লিপ্ত একাডেমিক মানুষ কোথায় ?
আপনার লেখার "একাডেমিক টোন" ভাল লাগলো। যদি কিছু মনে না করেন, আপনি কি করেন?
(সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিয়েই বলছি) আমার প্রায়ই মনে হয় বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীর আকাল চলছে । চারিদিকেই শ্লোগান । ছফার মতো এরকম নির্লিপ্ত একাডেমিক মানুষ কোথায় ?
আপনার লেখার "একাডেমিক টোন" ভাল লাগলো। যদি কিছু মনে না করেন, আপনি কি করেন?
১৭
১৮
অনেকদিন পর আপনার ছফাগিরি পড়তেই ক'দিন নিয়মিত সচলে ঢুকছি।
লেখা ভাল লাগছে ---- তবে যেহেতু এটা ছফা-পাঠ বা ছফা-সমালোচনা --- একটু বিতর্ক জমে উঠলে ভাল হত --- যেমনটা প্রথম পর্বে হয়েওছিল। আরো ভিন্নমত আসবে আশাকরি।
এই জাতির মনস্তত্ত্ব বুঝতে বাঙালি মুসলমানের মনস্তত্ত্ব বোঝাটা জরুরী--- ছফা সে জায়গাতে ভাল একটা আলোড়ন তুলেছেন --- এজাতীয় বিশ্লেষণ আরো হওয়া প্রয়োজন।
যাহোক, চলুক ছফাগিরি, সাথে আছি।
লেখা ভাল লাগছে ---- তবে যেহেতু এটা ছফা-পাঠ বা ছফা-সমালোচনা --- একটু বিতর্ক জমে উঠলে ভাল হত --- যেমনটা প্রথম পর্বে হয়েওছিল। আরো ভিন্নমত আসবে আশাকরি।
এই জাতির মনস্তত্ত্ব বুঝতে বাঙালি মুসলমানের মনস্তত্ত্ব বোঝাটা জরুরী--- ছফা সে জায়গাতে ভাল একটা আলোড়ন তুলেছেন --- এজাতীয় বিশ্লেষণ আরো হওয়া প্রয়োজন।
যাহোক, চলুক ছফাগিরি, সাথে আছি।
১৯
কেউ কিছু কয় না। বিতর্ক তো অনেক দূরের ব্যাপার। ক্যামনে কী।
২০
আসলে ছফা নামটার সাথে সবাই-কম বেশি পরিচিত, তবে আপনার মত করে সবাই হয়তো তাকে পড়ে নি। আপনার প্রথম কিস্তি পড়ে আমি গুগলে সার্চ দিয়ে বিডিনিইজ২৪ কিছু পেলাম। লেখা চালিয়ে যাবেন । আশা করি আপনার মাধ্যমে কিছু জানতে পারবো।
স্বপ্নদ্রোহ
স্বপ্নদ্রোহ
২১
আপনি যদি দেশে থাকেন আজিজ সুপার মার্কেটে গিয়ে উনার বই কিনে ফেলেন। আগে ছফাকে ছফার ভাষায় পড়ে নেন। তাহলে বুঝতে সুবিধা হবে।
আপনার নাম কি দিশা? আরো একজন দিশা___ এসেছেন। আবার পাণ্ডবদার দিশা ও আছেন। খুব দিশাহারা লাগছে।
আপনার নাম কি দিশা? আরো একজন দিশা___ এসেছেন। আবার পাণ্ডবদার দিশা ও আছেন। খুব দিশাহারা লাগছে।
২২
খুব খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছি। অনেক পর্ব পর্যন্ত আগাক এই আশা রাখছি আপনার কাছে। ছফাকে সবার কাছে নিয়ে সহজবোধ্য করে নিয়ে আসার জন্য আপনাকে অভিবাদন।
২৪
আপনার পুরো সিরিজটা পড়তে হবে, এটা পড়ে বেশ ভালো লাগলো ... পরের পর্বটার জন্য খুব আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করছি... যেহেতু আমি ছফা পড়িনি তেমন (দু'টা উপন্যাস পড়েছি মনে হয়, অনেস্টলি, পড়ে ভালো লাগেনি, হয়তো আমিই নিন্মমানের পাঠক
)
যাই হোক, দেখা যাক ছফার চিন্তার সাথে একমত হওয়া যায় কিনা
প্রফেসর রাজ্জাকের ব্যাপারে আপনার বক্তব্যটুকু খুব একটা ক্লিয়ার হলোনা ...আরেকটু বিস্তারিত বলা যায় কি?
========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে
যাই হোক, দেখা যাক ছফার চিন্তার সাথে একমত হওয়া যায় কিনা
প্রফেসর রাজ্জাকের ব্যাপারে আপনার বক্তব্যটুকু খুব একটা ক্লিয়ার হলোনা ...আরেকটু বিস্তারিত বলা যায় কি?
========================
যার ঘড়ি সে তৈয়ার করে,ঘড়ির ভিতর লুকাইছে
২৫
কোন দুইটা?
প্রফেসর রাজ্জাক কিস্তি এক থেকে চার প্রতিটাতে এসেছেন। সব কিস্তি পড়লে কিছুটা ধারণা পাবেন আশা রাখি।
আর সচলে কম ঢোকেন নাকি? ব্যস্ততা?
প্রফেসর রাজ্জাক কিস্তি এক থেকে চার প্রতিটাতে এসেছেন। সব কিস্তি পড়লে কিছুটা ধারণা পাবেন আশা রাখি।
আর সচলে কম ঢোকেন নাকি? ব্যস্ততা?
২৮
ছফা পাঠের একটা অনন্য শিক্ষা মনে হয় নির্মোহ স্বগোত্র-সমালোচনা। যেমন ধরুন, ছফা নিজে বাঙালী মুসলমান হয়েই কিন্তু বাঙালী-মুসলমানের মন-বিশ্লেষণ করেছেন। এই স্বগোত্র-সমালোচনার আজ বড় অভাব আমাদের সমাজে। আমি যদি সেকুলার মধ্যবিত্ত কিম্বা ধর্মধারী মধ্যবিত্ত হই, তাহলে আমার শ্রেণীর মানস-চরিত্র আমারই বেশি জানার কথা। তার দোষ-গুন নিয়ে সমালোচনার দায় তাই আমারই সবচে বেশি। আর সমালোচনা দিয়ে যদি কোন কিছুকে প্রভাবিত করা যায়, সেটার সম্ভাবনা নিজ গোত্রেই বেশি, অন্যকোথাও নয়।
২৯
আপনার মন্তব্যের জবাব দিতে একটু দেরি হলো। নিচের মন্তব্য প্রতিমন্তব্যগুলো দেখতে পারেন।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
৩০
অসাধারণ লাগছে এই সিরিজ; চালিয়ে যান ভাইয়া। লগে আছি।
৩২
"পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধিকার আন্দোলনের মূল কারণ ছিল ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতি অস্বীকৃতি। হিন্দুরা এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখে। …"
এ কথা কী করে বলতে পারলেন ছফা? সকলেরই জানার কথা, সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পাকিস্তান সরকারের প্রবল বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল এবং সে সংগ্রামই পরে রূপ নেয় স্বাধীনতাযুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধে। এই বৈষম্য যে কত বেশি ছিল তা নিয়েও অনেক লেখা হয়েছে। আমিও বিদেশী সাংবাদিকের লেখা উদ্ধৃত করে লিখেছিলাম আমার প্রথম আলো-র নিয়মিত লেখাটিতে। শুভশীষ, তুমি সেটি পড়ে থাকবে। হিন্দুমুসলিম নির্বিশেষে সকল দেশপ্রেমিক আন্দোলনে জড়িয়েছিল এ অঞ্চলকে বৈষম্যমুক্ত করতে, পরে যা রূপ নেয় স্বাধীনতাযুদ্ধে। স্বাধীনতার পর প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে যোগ করেন। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যও ছিল তাই।
ধর্মনিরপেক্ষতা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু এ আকাঙ্ক্ষায় স্বাধিকার আন্দোলন হয়েছে বলা সত্যের অপলাপ এবং বিভ্রান্তিকর। অআরও অআছে।
"পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ক্র্যাক ডাউনের প্রাথমিক পর্যায়ে বেছে বেছে হিন্দুদের বাড়িঘর মহল্লা এবং গ্রামে আগুন লাগিয়ে হিন্দু নর-নারীদের অবলীলায় খুন করে যাচ্ছিলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রাথমিক যে রোষ তা হিন্দু সম্প্রদায়কেই সর্বাপেক্ষা অধিক সহ্য করতে হয়েছে।"৯ …
বলা হলো, "প্রাথমিক পর্যায়ে বেছে বেছে হিন্দুদের......প্রাথমিক যে রোষ তা হিন্দু সম্প্রদায়কেই..."
এখানে 'প্রাথমিক' বলাটা ভুল, বড়ো রকমের ভুল। দখলদারির সারা সময়টা জুড়ে তারা হিন্দুনিধনে তৎপর থেকেছে, তাঁদের বাড়িঘর ধ্বংস করেছে, নারী, শিশু কাউকে রেহাই দেয়নি। এসব নিয়ে অনেক বই আছে, দলিলাদি আছে, যা আমার কথার সাক্ষ্য দেবে। আমিও এসব প্রত্যক্ষ করেছি।
"এই যুদ্ধে হয়তো ভারত জয়লাভ করবে এবং ভারতের সহায়তায় আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হবো। আমাদের জাতীয় সংগ্রামের এই পরিণতি। এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম? কি জানি, ইতিহাস কোন দিকে মোড় নিচ্ছে? আমাদের বাবারা পাকিস্তান তৈরি করতে চেয়েছিলেন, আর আমরা পাকিস্তান ভাঙ্গছি। এই যুদ্ধ সংঘাত রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় ইতিহাস কোন ভবিষ্যতের পানে পাড়ি দিচ্ছে? কে জানে!"১০ … ভারত আমাদের সহায়তা করেছে এজন্য এত হা-পিত্যেশ কেন? বলা হচ্ছে, "এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম?" কেন, কোনো দেশ কি তার মুক্তির সংগ্রামে অন্য দেশের সহায়তা নেয় না? "আমরা পাকিস্তান ভাঙ্গছি" বলে হাহাকার কেন? ভারতের প্রতি ছফা সাহেবের এত বিরূপতা কেন?
পরিশেষে বলি, "ঠিক কোন কারণে বাংলাদেশের সেক্যুলারিজমকে (ধরি সেক্যুলারিজমের বাংলা ‘ধর্ম-স্বাধীনতা’) বাদ দিয়ে ধর্মের লেবাসে নিজেকে ঢেকে ফেলার দরকার হলো- এই ইতিহাস জানা খুব জরুরি।" ---শুভাশীষ, তোমার এই কথা খুব জরুরি। খুবই জরুরি।
এ কথা কী করে বলতে পারলেন ছফা? সকলেরই জানার কথা, সে সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পাকিস্তান সরকারের প্রবল বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়েছিল এবং সে সংগ্রামই পরে রূপ নেয় স্বাধীনতাযুদ্ধে, মুক্তিযুদ্ধে। এই বৈষম্য যে কত বেশি ছিল তা নিয়েও অনেক লেখা হয়েছে। আমিও বিদেশী সাংবাদিকের লেখা উদ্ধৃত করে লিখেছিলাম আমার প্রথম আলো-র নিয়মিত লেখাটিতে। শুভশীষ, তুমি সেটি পড়ে থাকবে। হিন্দুমুসলিম নির্বিশেষে সকল দেশপ্রেমিক আন্দোলনে জড়িয়েছিল এ অঞ্চলকে বৈষম্যমুক্ত করতে, পরে যা রূপ নেয় স্বাধীনতাযুদ্ধে। স্বাধীনতার পর প্রগতিশীল নেতৃবৃন্দ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে যোগ করেন। মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্যও ছিল তাই।
ধর্মনিরপেক্ষতা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু এ আকাঙ্ক্ষায় স্বাধিকার আন্দোলন হয়েছে বলা সত্যের অপলাপ এবং বিভ্রান্তিকর। অআরও অআছে।
"পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ক্র্যাক ডাউনের প্রাথমিক পর্যায়ে বেছে বেছে হিন্দুদের বাড়িঘর মহল্লা এবং গ্রামে আগুন লাগিয়ে হিন্দু নর-নারীদের অবলীলায় খুন করে যাচ্ছিলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রাথমিক যে রোষ তা হিন্দু সম্প্রদায়কেই সর্বাপেক্ষা অধিক সহ্য করতে হয়েছে।"৯ …
বলা হলো, "প্রাথমিক পর্যায়ে বেছে বেছে হিন্দুদের......প্রাথমিক যে রোষ তা হিন্দু সম্প্রদায়কেই..."
এখানে 'প্রাথমিক' বলাটা ভুল, বড়ো রকমের ভুল। দখলদারির সারা সময়টা জুড়ে তারা হিন্দুনিধনে তৎপর থেকেছে, তাঁদের বাড়িঘর ধ্বংস করেছে, নারী, শিশু কাউকে রেহাই দেয়নি। এসব নিয়ে অনেক বই আছে, দলিলাদি আছে, যা আমার কথার সাক্ষ্য দেবে। আমিও এসব প্রত্যক্ষ করেছি।
"এই যুদ্ধে হয়তো ভারত জয়লাভ করবে এবং ভারতের সহায়তায় আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হবো। আমাদের জাতীয় সংগ্রামের এই পরিণতি। এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম? কি জানি, ইতিহাস কোন দিকে মোড় নিচ্ছে? আমাদের বাবারা পাকিস্তান তৈরি করতে চেয়েছিলেন, আর আমরা পাকিস্তান ভাঙ্গছি। এই যুদ্ধ সংঘাত রক্তপাতের মধ্য দিয়ে আমাদের জাতীয় ইতিহাস কোন ভবিষ্যতের পানে পাড়ি দিচ্ছে? কে জানে!"১০ … ভারত আমাদের সহায়তা করেছে এজন্য এত হা-পিত্যেশ কেন? বলা হচ্ছে, "এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম?" কেন, কোনো দেশ কি তার মুক্তির সংগ্রামে অন্য দেশের সহায়তা নেয় না? "আমরা পাকিস্তান ভাঙ্গছি" বলে হাহাকার কেন? ভারতের প্রতি ছফা সাহেবের এত বিরূপতা কেন?
পরিশেষে বলি, "ঠিক কোন কারণে বাংলাদেশের সেক্যুলারিজমকে (ধরি সেক্যুলারিজমের বাংলা ‘ধর্ম-স্বাধীনতা’) বাদ দিয়ে ধর্মের লেবাসে নিজেকে ঢেকে ফেলার দরকার হলো- এই ইতিহাস জানা খুব জরুরি।" ---শুভাশীষ, তোমার এই কথা খুব জরুরি। খুবই জরুরি।
৩৩
প্রথমে আপনাকে ধন্যবাদ জানাই সুচিন্তিত মন্তব্যের জন্য। স্বাধিকার আন্দোলনের অনেক কারণের মধ্যে ধর্মতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতি অস্বীকৃতি একটা অগ্রগণ্য কারণ ছিল। তবে একমাত্র বা মুখ্য এটা বলা যাবে না। ছফা এই প্রবন্ধে হিন্দুদের স্বাধিকার আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটা বোঝাতে গিয়ে হয়তো এই কথা পেড়েছেন। ছফার এই বিষয়ে আরো অনেক লেখা আছে। পরের কিস্তিগুলোতে কথাগুলো আসবে।
প্রাথমিকভাবে কথাটার ওপর ছফা জোর দিয়েছেন। ইয়াহিয়ার প্ল্যান অনুসারে শুরুতে বাংলাদেশের হিন্দুরা এই রোষের কবলে পড়ে। তবে এটা ঠিক, যুদ্ধের সারাটা সময় ধরে হিন্দুদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চলেছিল। পাকিস্তানিরা মনে করতো- এই হিন্দুগুলোই যতো নষ্টের মূল। পরে অবশ্য হিন্দু মুসলমান বাছবিচার করে নি হানাদার বাহিনী। বাংলাদেশের সব মানুষকেই তারা পিষে মেরে ফেলতে চেয়েছিল।
ছফার ভারত বিদ্বেষকে আমি একটু অন্যভাবে দেখি। এটা বলা যেতে পারে পশ্চিমবাংলার বাংলা সাহিত্যে দাদাগিরির প্রতি বিদ্বেষ। একটু বড় আঙ্গিকে ভারতের দাদাগিরির প্রতি বিদ্বেষ। কারো ওপর দাদাগিরি ফলালে বেশীক্ষণ সহ্য করা মুশকিল। ছফার মতো ইনটিগ্রিটি সম্পন্ন লোকের কাছে সেটা একদম অসহ্য। দাদাগিরির একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। আনন্দবাজার পত্রিকা একবার বাংলা একাডেমীকে 'আনন্দ পুরষ্কার'- য়ে ভূষিত ঘোষণা করে। এক ধরণের মারাত্মক ঔদ্ধত্য। যাই হোক বাংলা একাডেমী অপারগতা প্রদর্শন করে। যদ্দূর মনে পড়ে সেই বছর আনন্দ পুরষ্কার জোটে তসলিমা নাসরীনের।
উদ্ধৃতি
ভারত আমাদের সহায়তা করেছে এজন্য এত হা-পিত্যেশ কেন? বলা হচ্ছে, "এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম?" কেন, কোনো দেশ কি তার মুক্তির সংগ্রামে অন্য দেশের সহায়তা নেয় না? "আমরা পাকিস্তান ভাঙ্গছি" বলে হাহাকার কেন?
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই প্রশ্নগুলোর জন্য। 'অলাতচক্র' উপন্যাসে কিছু উত্তর মিলতে পারে। আর পরের কিস্তিগুলোতে এসব প্রসঙ্গ আরো বিশদে আসবে।
একটু অন্য প্রসঙ্গ , এই পোস্টটা পড়তে পারেন, মন্তব্য সহ।
ভালো থাকবেন।
প্রাথমিকভাবে কথাটার ওপর ছফা জোর দিয়েছেন। ইয়াহিয়ার প্ল্যান অনুসারে শুরুতে বাংলাদেশের হিন্দুরা এই রোষের কবলে পড়ে। তবে এটা ঠিক, যুদ্ধের সারাটা সময় ধরে হিন্দুদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন চলেছিল। পাকিস্তানিরা মনে করতো- এই হিন্দুগুলোই যতো নষ্টের মূল। পরে অবশ্য হিন্দু মুসলমান বাছবিচার করে নি হানাদার বাহিনী। বাংলাদেশের সব মানুষকেই তারা পিষে মেরে ফেলতে চেয়েছিল।
ছফার ভারত বিদ্বেষকে আমি একটু অন্যভাবে দেখি। এটা বলা যেতে পারে পশ্চিমবাংলার বাংলা সাহিত্যে দাদাগিরির প্রতি বিদ্বেষ। একটু বড় আঙ্গিকে ভারতের দাদাগিরির প্রতি বিদ্বেষ। কারো ওপর দাদাগিরি ফলালে বেশীক্ষণ সহ্য করা মুশকিল। ছফার মতো ইনটিগ্রিটি সম্পন্ন লোকের কাছে সেটা একদম অসহ্য। দাদাগিরির একটা ছোট্ট উদাহরণ দেই। আনন্দবাজার পত্রিকা একবার বাংলা একাডেমীকে 'আনন্দ পুরষ্কার'- য়ে ভূষিত ঘোষণা করে। এক ধরণের মারাত্মক ঔদ্ধত্য। যাই হোক বাংলা একাডেমী অপারগতা প্রদর্শন করে। যদ্দূর মনে পড়ে সেই বছর আনন্দ পুরষ্কার জোটে তসলিমা নাসরীনের।
উদ্ধৃতি
ভারত আমাদের সহায়তা করেছে এজন্য এত হা-পিত্যেশ কেন? বলা হচ্ছে, "এটাই কি আমরা চেয়েছিলাম?" কেন, কোনো দেশ কি তার মুক্তির সংগ্রামে অন্য দেশের সহায়তা নেয় না? "আমরা পাকিস্তান ভাঙ্গছি" বলে হাহাকার কেন?
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ এই প্রশ্নগুলোর জন্য। 'অলাতচক্র' উপন্যাসে কিছু উত্তর মিলতে পারে। আর পরের কিস্তিগুলোতে এসব প্রসঙ্গ আরো বিশদে আসবে।
একটু অন্য প্রসঙ্গ , এই পোস্টটা পড়তে পারেন, মন্তব্য সহ।
ভালো থাকবেন।
৩৪
আপনার ছফাদর্শন ভালো লাগলো। আলোচনা-সমালোচনা পড়ে ক্ষুদ্র জ্ঞানে যা বুঝলাম তা হল, ছফার গুরুর মুসলিম লীগ প্রীতি,ছফার সাম্প্রদায়িকতা(?), প্রতিক্রিয়াশীলতা(!!) নিয়ে অনেকেই বিব্রত। আমাদের একটা মৌলিক সমস্যা হলো টাইম ফ্রেমের বিভিন্নতায় নিজের মতকে পূর্ণাঙ্গ ধরে নিয়ে সবকিছুর বিবেচনা করা। ছফার সাহস ছিলো, তাই তিনি অবহেলায় তা উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন।
দ্বিজাতিতত্ত্বের পটভূমিকে ৪৭ এর আরো অনেক আগে থেকে বিবেচনা করতে পারলে ভালো হয়। বাঙালি মুসলিমদের অবাঙালি মুসলিমরা কখনোই গ্রাহ্যের মধ্যে আনেনি। তাদের পুরো স্বার্থই ছিলো উত্তর ভারতীয় মুসলিমদের নিয়ে(দেখুন http://www.defencejournal.com/2002/dec/demons.htm)। ভারতভাগের জন্য যে কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী মানসিকতাই প্রধান প্রভাবক ছিলো তা ছফা স্পষ্টাকারে দ্যাখিয়ে দ্যান বঙ্কিমকে নিয়ে রচিত প্রবন্ধে। অধুনা কট্টর বিজেপি নেতা যশোবন্ত সিংএর আত্মজীবনীও তার প্রতিদ্ধনি করে। দ্বিজাতিতত্ত্ব সঠিক ছিলোনা তা অবশ্যই মানছি, কিন্তু সময়ের দাবীতে তার আর কোনো বিকল্প ছিলো কি? জিন্নাহ কিন্তু প্রথমে কংগ্রেসেই ছিলেন, মানসিকতায় মেলেনি। এমনকি সুভাষচন্দ্র বসুও তার পথ আলাদা করে নেন কংগ্রেস থেকে। যেহেতু বাঙালিদের ৪৭এর বিভাগের সময় কেউ গোনার মধ্যেই রাখেনি,[বেঙ্গল প্যাক্টকেতো স্রেফ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।] ফলাফলে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে তারাই একমাত্র জাতিগোষ্ঠি যাদের নিজস্ব একটি দেশ আছে।
অবশ্য আহমদ ছফা যে সর্বাংশে সঠিক তাও বলা যায়না। বৌদ্ধ ধর্ম থেকে মাস কনভার্সনের যে রূপরেখা তিনি দেখিয়েছেন অধুনা ঐতিহাসিকদের [ব্রাইটন, মোহর আলী] গবেষণায় তা অনেকাংশেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে(দেখুন- http://www.escholarship.org/editions/view?docId=ft067n99v9&chunk.id=ack)।
তবে বাঙালিদের চরিত্র বিশ্লেষণে তিনি অনন্য। তার 'আলি কেনান' যুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর মানসিকতার দালিলিক চরিত্র, 'গাভী বিত্তান্ত' বুদ্ধিজীবিদের অন্তঃসারশূন্য আত্মরতির নির্মম স্যাটায়ার, 'অলাতচক্রে' শরণার্থী শিবিরের সত্যিকারের দৃশ্য, 'তসলীমা নাসরীন'এর বিজেপিভোগ্যা হবার তীব্র প্রতিবাদ, গণকন্ঠের জ্বালাময়ী সব কলাম, কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যতোষামোদের তীব্র বিরোধী- এগুলোর মাঝেই টিকে থাকবেন তিনি।
তিনি নিজেকে বাঙালি মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতেন, এর কারণ কখনোই আমার কাছে সাম্প্রদায়িক বলে মনে হয়নি। শতশত বছরের শোষিত, বঞ্চিত এক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবেই হয়তো তার এই স্বেচ্ছা অভিধা।
সবশেষে একটা কথা বলি, আমরা যতই সেকুলারিজমের আবরণে নিজেদের ভুলে থাকার চেষ্টা করিনা কেন, এ জাতির রন্ধ্রে, রন্ধ্রে বিষাক্ত ক্লেদের মত যে ধর্মানুভুতি ঢুকে আছে সেটাই একেবারে খুলে খুলে সবাইকে দেখিয়েছেন আহমদ ছফা। সেকুলারিজমের এইতো ১ম ধাপ। একাজের জন্য তিনি যদি সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল হন তবে এরকম সাম্প্রদায়িক,প্রতিক্রিয়াশীলদেরই আমাদের বড্ড দরকার।
ধন্যবাদ।
দ্বিজাতিতত্ত্বের পটভূমিকে ৪৭ এর আরো অনেক আগে থেকে বিবেচনা করতে পারলে ভালো হয়। বাঙালি মুসলিমদের অবাঙালি মুসলিমরা কখনোই গ্রাহ্যের মধ্যে আনেনি। তাদের পুরো স্বার্থই ছিলো উত্তর ভারতীয় মুসলিমদের নিয়ে(দেখুন http://www.defencejournal.com/2002/dec/demons.htm)। ভারতভাগের জন্য যে কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী মানসিকতাই প্রধান প্রভাবক ছিলো তা ছফা স্পষ্টাকারে দ্যাখিয়ে দ্যান বঙ্কিমকে নিয়ে রচিত প্রবন্ধে। অধুনা কট্টর বিজেপি নেতা যশোবন্ত সিংএর আত্মজীবনীও তার প্রতিদ্ধনি করে। দ্বিজাতিতত্ত্ব সঠিক ছিলোনা তা অবশ্যই মানছি, কিন্তু সময়ের দাবীতে তার আর কোনো বিকল্প ছিলো কি? জিন্নাহ কিন্তু প্রথমে কংগ্রেসেই ছিলেন, মানসিকতায় মেলেনি। এমনকি সুভাষচন্দ্র বসুও তার পথ আলাদা করে নেন কংগ্রেস থেকে। যেহেতু বাঙালিদের ৪৭এর বিভাগের সময় কেউ গোনার মধ্যেই রাখেনি,[বেঙ্গল প্যাক্টকেতো স্রেফ উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।] ফলাফলে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে তারাই একমাত্র জাতিগোষ্ঠি যাদের নিজস্ব একটি দেশ আছে।
অবশ্য আহমদ ছফা যে সর্বাংশে সঠিক তাও বলা যায়না। বৌদ্ধ ধর্ম থেকে মাস কনভার্সনের যে রূপরেখা তিনি দেখিয়েছেন অধুনা ঐতিহাসিকদের [ব্রাইটন, মোহর আলী] গবেষণায় তা অনেকাংশেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে(দেখুন- http://www.escholarship.org/editions/view?docId=ft067n99v9&chunk.id=ack)।
তবে বাঙালিদের চরিত্র বিশ্লেষণে তিনি অনন্য। তার 'আলি কেনান' যুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর মানসিকতার দালিলিক চরিত্র, 'গাভী বিত্তান্ত' বুদ্ধিজীবিদের অন্তঃসারশূন্য আত্মরতির নির্মম স্যাটায়ার, 'অলাতচক্রে' শরণার্থী শিবিরের সত্যিকারের দৃশ্য, 'তসলীমা নাসরীন'এর বিজেপিভোগ্যা হবার তীব্র প্রতিবাদ, গণকন্ঠের জ্বালাময়ী সব কলাম, কলকাতাকেন্দ্রিক সাহিত্যতোষামোদের তীব্র বিরোধী- এগুলোর মাঝেই টিকে থাকবেন তিনি।
তিনি নিজেকে বাঙালি মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতেন, এর কারণ কখনোই আমার কাছে সাম্প্রদায়িক বলে মনে হয়নি। শতশত বছরের শোষিত, বঞ্চিত এক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবেই হয়তো তার এই স্বেচ্ছা অভিধা।
সবশেষে একটা কথা বলি, আমরা যতই সেকুলারিজমের আবরণে নিজেদের ভুলে থাকার চেষ্টা করিনা কেন, এ জাতির রন্ধ্রে, রন্ধ্রে বিষাক্ত ক্লেদের মত যে ধর্মানুভুতি ঢুকে আছে সেটাই একেবারে খুলে খুলে সবাইকে দেখিয়েছেন আহমদ ছফা। সেকুলারিজমের এইতো ১ম ধাপ। একাজের জন্য তিনি যদি সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল হন তবে এরকম সাম্প্রদায়িক,প্রতিক্রিয়াশীলদেরই আমাদের বড্ড দরকার।
ধন্যবাদ।
৩৫
সুচিন্তিত এবং অসম্ভব ভালো মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। উদ্ধৃতি
বৌদ্ধ ধর্ম থেকে মাস কনভার্সনের যে রূপরেখা তিনি দেখিয়েছেন অধুনা ঐতিহাসিকদের [ব্রাইটন, মোহর আলী] গবেষণায় তা অনেকাংশেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিষয়টা নিয়ে আমি কিছুটা পড়াশোনা করে তারপর প্রতিমন্তব্য করবো। আপনার লিংকগুলোর জন্য থ্যাংকস। ব্লগ একটা মিথস্ক্রিয়া। আপনার দীর্ঘ মন্তব্যে আমি অনেক জোর পেলাম।
আহমদ ছফা বাংলাদেশকে একটা সাবালক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। তাঁর লেখালেখি, গালাগালি, দর্শন সবকিছুর পেছনে এটাই ছিল মূল কারণ।
বৌদ্ধ ধর্ম থেকে মাস কনভার্সনের যে রূপরেখা তিনি দেখিয়েছেন অধুনা ঐতিহাসিকদের [ব্রাইটন, মোহর আলী] গবেষণায় তা অনেকাংশেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
বিষয়টা নিয়ে আমি কিছুটা পড়াশোনা করে তারপর প্রতিমন্তব্য করবো। আপনার লিংকগুলোর জন্য থ্যাংকস। ব্লগ একটা মিথস্ক্রিয়া। আপনার দীর্ঘ মন্তব্যে আমি অনেক জোর পেলাম।
আহমদ ছফা বাংলাদেশকে একটা সাবালক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। তাঁর লেখালেখি, গালাগালি, দর্শন সবকিছুর পেছনে এটাই ছিল মূল কারণ।
৩৮
উদ্ধৃতি
তাই? ধরেন আমার মতো প্রান্তিকজন যাদের সৌভাগ্য হয়নি রাজ্জাক সাহেবের ব্যক্তিত্বের ঋজুতা দেখার তারা কি করে জানবে যে তিনি ডাইহার্ড মুসলিম লীগিয় বিশ্বাস থেকে সরে এসেছিলেন?পশ্চিম পাকিস্তানের ফ্যাসিস্ট আচরণ দেখে রাজ্জাক সাহেব তাঁর বিশ্বাস থেকে সরে এসেছিলেন এটা প্রমাণ করার জন্য কোন প্রামাণ্যচিত্রের প্রয়োজন পড়ে না। প্রফেসর রাজ্জাকের মতোন ব্যক্তিত্ব তাঁর ঋজুতা দিয়ে এই ব্যাখ্যা সারেন।
পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙ্গালীদের অনেকেই ছিলেন যারা পরবর্তীতে বাংলাদেশ আন্দোলনে নিজেদের সম্পৃক্ততা দিয়ে প্রমান করেছেন যে তারা তাদের মুসলিম লীগিয় বিশ্বাস থেকে সরে এসেছেন।
বাংলাদেশ আন্দোলনে রাজ্জাক সাহেবের ভূমিকা কি, জানতে চাইছিলাম।
-------------------------------------
জীবনযাপনে আজ যতো ক্লান্তি থাক,
বেঁচে থাকা শ্লাঘনীয় তবু ।।
Subscribe to:
Posts (Atom)